‘রংধনু জাতি গড়তে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে চাই’:সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া খাগড়াছড়িতে পাঁচ গুণীজনকে ‘স্পৃহা সম্মাননা’
- আপডেট: ১০:১৯:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৪

খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক,খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি।।।
“কোনো সম্প্রদায়কে ছোট করে, বঞ্চিত করে কিংবা অধিকারহারা করে এই পাহাড়কে এগিয়ে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। বিশেষ করে পাহাড়ি ভাই-বোনদের বাদ দিয়ে এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
রংধনু যেমন একটি রঙে পূর্ণতা পায় না, তেমনি পাহাড়ের সব জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া একটি বৈচিত্র্যময় ও সম্প্রীতিপূর্ণ জাতি গঠন সম্ভব নয়।”
খাগড়াছড়িতে ‘স্পৃহা সম্মাননা অনুষ্ঠান’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনের সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া।
শান্তি, অধিকার, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও মানবতাবাদী কর্মকাণ্ডের প্রতি সংহতির বার্তা নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মানবিক ও সামাজিক সংগঠন স্পৃহা আয়োজিত অনুষ্ঠানে চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা, প্রথাগত নেতৃত্ব, ক্রীড়া, প্রযুক্তি ও সংগীতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পাঁচ গুণীজনের হাতে ‘স্পৃহা সম্মাননা’ তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে স্পৃহা’র সভাপতি প্রফেসর বোধি সত্ত্ব দেওয়ানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া। এ সময় খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ম্রাসাথোয়াই মারমা, মং সার্কেল চীফ সাচিংপ্রু চৌধুরী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. কামরুল ইসলামসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, “শুধু আমাকে ভোট দিয়ে এমপি বানিয়ে দিলেই হবে না; আমি একা সবকিছু করতে পারব না। আপনাদের মতো গুণী ও অভিজ্ঞ মানুষের পরামর্শ, সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা আমার প্রয়োজন। পাহাড়ের মানুষের উন্নয়ন, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।”
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের দেওয়া সমর্থনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “একজন বাঙালি হয়েও আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা, আস্থা ও সমর্থন দিয়েছেন, তার প্রতিদান হিসেবে আমিও আপনাদের সেই সম্মান ও মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে চাই। আপনারা আমাকে যে সম্মান দিয়েছেন, আমি তার মর্যাদা রক্ষা করতে চাই। এ জন্য আপনাদের দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছি।”
শিক্ষকসহ জেলা পরিষদের বিভিন্ন নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “শিক্ষক নিয়োগসহ কোনো চাকরির ক্ষেত্রে অতীতের মতো ঘুষ-বাণিজ্য আর হতে দেওয়া যাবে না। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। টাকা দিয়ে যদি অযোগ্য কাউকে শিক্ষক বানানো হয়, তাহলে তিনি আমাদের সন্তানদের কী শিক্ষা দেবেন? এর মাধ্যমে একটি প্রজন্মের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
তিনি আরও বলেন, “অনেক এলাকায় দেখা যায়, বিদ্যালয়ের নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়মিত কর্মস্থলে থাকেন না। সেখানে স্থানীয় কাউকে সামান্য টাকা দিয়ে হাজিরা দেওয়ানোর মতো অনিয়মের চর্চা রয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা বন্ধ করে শিক্ষার পরিবেশ ও মান নিশ্চিত করতে হবে।”
‘রংধনু জাতি’র ধারণা তুলে ধরে ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, “রংধনু কখনো একটি রঙে হয় না; বিভিন্ন রঙের সমন্বয়েই রংধনু পূর্ণতা পায়। তেমনি মান্দি, চাকমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রোসহ পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া একটি বৈচিত্র্যময়, সম্প্রীতিপূর্ণ ও সমঅধিকারভিত্তিক জাতি গঠন সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রংধনু জাতির ধারণা বাস্তবায়নে সবাইকে সঙ্গে নিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে চাই।”
জেলা পরিষদের নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ ও অনিয়মের কথা মানুষের মুখে শোনা গেছে। অতীতে চাকরি পেতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। আমরা সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মেধা, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে চাই।”
গুণীজনদের সম্মাননা প্রসঙ্গে ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, “একটি সমাজের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার গুণী ও কৃতী মানুষ। তাঁদের সম্মান জানানো মানে জ্ঞান, মেধা, সাফল্য ও অবদানকে সম্মান জানানো। আজকের এই সংবর্ধনা শুধু সম্মান জানানোর আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে এবং সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করতে অনুপ্রেরণা জোগাবে। আপনাদের অর্জন ও অবদান খাগড়াছড়ির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।”
নিয়োগে অর্থ নয়, মেধার প্রতিশ্রুতি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ম্রাসাথোয়াই মারমা বলেন, “আমি আজ আপনাদের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আগামীতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের কোনো নিয়োগে টাকার বিনিময়ে চাকরি হবে না। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই চাকরি দেওয়া হবে। এ বিষয়ে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই।”
তিনি বলেন, “এই কাজ আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু আমার সদিচ্ছা থাকলেই সবকিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। এ জন্য আপনাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। নিয়োগের ক্ষেত্রে যেমন আপনাদের সহযোগিতা চাই, তেমনি জেলা পরিষদের প্রতিটি উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও আপনাদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রতিটি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত হোক। জনগণের আস্থা, প্রত্যাশা ও অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি জনবান্ধব জেলা পরিষদ গড়ে তুলতে আমরা কাজ করতে চাই।”
পাঁচ গুণীজন পেলেন ‘স্পৃহা সম্মাননা’ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অনুষ্ঠানে পাঁচ গুণীজনের হাতে ‘স্পৃহা সম্মাননা’ তুলে দেওয়া হয়।
চিকিৎসাসেবায় মানবিক অবদানের জন্য ডা. শহীদ তালুকদার, শিক্ষা, গবেষণা ও প্রথাগত নেতৃত্বে অবদানের জন্য মং রাণী উখেংচিং মারমা, খাগড়াছড়ির ফুটবল বিকাশে অবদানের জন্য কোচ ও ক্রীড়াবিদ জ্যোতিষ বসু ত্রিপুরা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে অবদানের জন্য জয়তু খীসা এবং সংগীত জগতে অসামান্য অবদানের জন্য মো. আবুল কাশেমকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।
সম্মাননা প্রদান পর্বের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে ছিল মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও আলোচনা সভা। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা, প্রথাগত নেতৃত্ব, ক্রীড়া, প্রযুক্তি ও সংগীতের মতো ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা ব্যক্তিদের একই মঞ্চে সম্মান জানানোর মধ্য দিয়ে মানবিক, সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের প্রতি সমাজের দায়বদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে আসে।






















