জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সফর শেষে নিউইয়র্ক ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী
- আপডেট: ০৩:২২:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৯

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে পাঁচ দিনের নিউইয়র্ক সফর শেষে দেশে ফেরার উদ্দেশে নিউইয়র্ক ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী এমিরেটসের একটি ফ্লাইট স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুবাই হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও সফরসঙ্গীরা।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী এ তথ্য জানিয়েছেন।
ফ্লাইটটি ২৬ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় দুবাই পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখান থেকে রাত ২টায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলায় ভাষণ দেন। ২৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া ভাষণে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, মানবিক সংকট, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেন তিনি।
ভাষণে বৈশ্বিক মানবতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। সংঘাত নিরসনে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে জনগণের ক্ষমতায়ন এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে সরকারের ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন’ বা ‘থ্রি-আর’ কৌশলের কথা তুলে ধরেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে, মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন মোহাম্মদ লতিফ, হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ে ফিলস-এম, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফ এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
এসব বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন তারেক রহমান। এতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের ভূমিকা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান, জলবায়ু সহনশীলতা ও বহুপক্ষীয় কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহর সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা জোরদার এবং অংশীদারত্বের নতুন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
২৩ সেপ্টেম্বর গেটস ফাউন্ডেশন, ভিসা ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি ও রোটারি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেন তিনি। সেখানে মানবিক চ্যালেঞ্জ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব নিয়ে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক সুজম্যানের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এতে জনস্বাস্থ্য, শিশুসেবা, টিকাদান, সাশ্রয়ী মূল্যের টিকা, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে আলোচনা হয়।
সফরের শেষ দিনে ম্যানহাটনে জেপি মর্গানের সদর দপ্তরে ওয়াল স্ট্রিটের ব্যবসায়ী নেতা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরে বিনিয়োগকারীদের দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সম্মিলিত বৈশ্বিক পদক্ষেপ, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পূর্বানুমেয় জলবায়ু অর্থায়নের আহ্বান জানান তিনি।
২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বের হুমকি নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানো, অভিযোজন অর্থায়ন, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাংলাদেশ-সুইডেন-ইউএনএফপিএ আয়োজিত ধাত্রীবিদ্যা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানেও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ‘সুস্থ বাংলাদেশ’ গড়ার পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে রাখার কথা জানান।
সরকার আরও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে বলেও জানান তিনি। এর মধ্যে ৮০ হাজার নারী এবং ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ বা ধাত্রী থাকার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে বোয়িংয়ের সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে দেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণ ও নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের সম্মানে দেওয়া স্বাগত প্রাতরাশে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রী অংশ নেন। পরে তাঁরা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশগ্রহণকারী নেতাদের সম্মানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আয়োজিত সংবর্ধনায় যোগ দেন।
পাঁচ দিনের নিউইয়র্ক সফরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পাশাপাশি একাধিক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।


























