রূপসার আলাইপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবু সাঈদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ
- আপডেট: ০৬:০৭:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২১

খুলনা ব্যুরো: খুলনার রূপসা উপজেলার আলাইপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবু সাঈদ খানের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম, অডিটের নামে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, সরকারি নির্দেশনা অমান্য এবং কলেজের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মসহ নানা অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং রূপসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
১৯৯৪ সালের ২০ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত আলাইপুর ডিগ্রি কলেজটি রূপসা উপজেলার একটি পুরোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে কলেজের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমে নানা অনিয়ম চলে আসছে। এসব বিষয়ে কলেজের গভর্নিং বডির অভিভাবক সদস্য পুটিমারী এলাকার বাসিন্দা মো. আঃ হালিম শেখ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে অধ্যক্ষ আবু সাঈদ খানের বিরুদ্ধে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেন থেকে শুরু করে কলেজের বিভিন্ন আর্থিক খাত পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, কলেজের বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক অধ্যক্ষ, নাইট গার্ড ও দুই ল্যাব সহকারীসহ চারজন কর্মচারী নিয়োগে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ২২ আগস্ট উপাধ্যক্ষ ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী/এমএলএসএস পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই যথাক্রমে ১৭ লাখ ও ৮ লাখ টাকার কথিত চুক্তি হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
অধ্যক্ষ আবু সাঈদ খানের পদোন্নতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তৎকালীন কলেজ পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশ করে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি প্রথমে উপাধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পান। পরে ২০২৩ সালে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া উপাধ্যক্ষ পদে থাকা অবস্থায় পদটি যথাযথভাবে শূন্য না করেই নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং একই সময়ে বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
কলেজের অডিট নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষক-কর্মচারীদের একাংশ। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে মন্ত্রণালয়ের অডিট রিপোর্ট পাওয়ার কথা বলে কলেজের শিক্ষক ও কর্মচারীদের কাছ থেকে এক মাসের বেতনের অর্ধেক সমপরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়। পরে ওই অর্থ অডিটের কাজে ব্যয় করা হয়নি বলে তারা জানতে পারেন। টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হলেও তা এখনও ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
কলেজের ব্যাংক হিসাব পরিচালনার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গভর্নিং বডির বাইরে থাকা তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম হাবিবকে ব্যাংকের যৌথ হিসাব পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এরপর কয়েক বছর ধরে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, টিউশন ফি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ব্যাংক হিসাব, ভাউচার, আয়-ব্যয়ের বিবরণী ও সংশ্লিষ্ট অনুমোদন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এদিকে ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মসূচি পালন না করার অভিযোগও উঠেছে কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই দিন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্ধারিত কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা থাকলেও আলাইপুর ডিগ্রি কলেজে কোনো কর্মসূচি পালন করা হয়নি। বরং প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ও তালাবদ্ধ রাখা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাশাপাশি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সুধাংশু গাইনের বিরুদ্ধেও দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি বছরের বিভিন্ন সময়ে দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থান করেও নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করেন এবং দেশে ফিরে আগের তারিখে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হাজিরা খাতা, ছুটির নথি, বিদেশযাত্রার তথ্য এবং বেতন-ভাতার রেকর্ড পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারী মো. আঃ হালিম শেখ বলেন, কলেজের স্বার্থেই তিনি এসব অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে এবং কলেজের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।
স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসীর কয়েকজনও অভিযোগগুলোর তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে এ ধরনের অভিযোগ ওঠা উদ্বেগজনক। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আলাইপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবু সাঈদ খান সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এতে তাঁর কোনো সমস্যা নেই।






















