মাঠের খেলা থেকে বাংলাদেশ বেতারের মাইক্রোফোনে: শম্ভু মৈত্রের ধারাভাষ্যকার হয়ে ওঠার গল্প
- আপডেট: ১০:১৫:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১০

শালিখা (মাগুরা) প্রতিনিধি লক্ষণ কুমার মন্ডল :
খেলার মাঠে উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত, দর্শকদের উচ্ছ্বাস আর খেলোয়াড়দের সাফল্য—সবকিছুকে শব্দের জাদুতে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য শিল্পের নাম ধারাভাষ্য। আর এই শিল্পের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত মাগুরার সন্তান শম্ভু মৈত্র। ২০১২ সাল থেকে তিনি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ বেতারের ক্রীড়া ধারাভাষ্যকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
তবে তাঁর এই পথচলার শুরু কোনো স্টুডিও বা সম্প্রচারকেন্দ্র থেকে নয়; বরং গ্রামের পরিচিত খেলার মাঠ থেকেই। কুচিয়ামোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কুচিয়ামোড়া মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের যৌথ খেলার মাঠে খেলাধুলার সঙ্গে তাঁর যে পরিচয় ও ভালোবাসার সূচনা, পরবর্তীতে সেটিই রূপ নেয় ক্রীড়া ধারাভাষ্যের প্রতি গভীর অনুরাগে।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
শম্ভু মৈত্রের জন্ম ৫ আগস্ট ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে। মাগুরা জেলার কুচিয়ামোড়া গ্রামের এক পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। পিতা শিশির কুমার মৈত্র এবং মাতা মীরা রাণী মৈত্র। তাঁদের গ্রামের ঠিকানা কুচিয়ামোড়া, ডাকঘর আমুড়িয়া, উপজেলা ও জেলা মাগুরা।
ছয় ভাই-বোনের মধ্যে শম্ভু মৈত্র চতুর্থ। তাঁদের পরিবারে রয়েছেন চার বোন ও দুই ভাই। তাঁর ছোট ভাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সদস্য—যা পরিবারের জন্য গর্বের বিষয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শম্ভু মৈত্র তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন কুচিয়ামোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। এরপর কুল্লিয়া কুচিয়ামোড়া সৈয়দ আতর আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৬ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মানবিক বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।
১৯৯৮ সালে বুনাগাতী ডিগ্রি কলেজ থেকে যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায়ও প্রথম বিভাগ অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষায় তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বেছে নেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর থেকে ২০০১ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএসএস (অনার্স) এবং ২০০২ সালে একই বিষয়ে এমএসএস সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে শিক্ষাবিজ্ঞানে পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে ২০১০ সালে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, যশোর থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনের সূচনা
শিক্ষাজীবন শেষে শম্ভু মৈত্র কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ২০০৪ সাল থেকে অদ্যাবধি তিনি পেশাগত জীবনে সক্রিয় রয়েছেন। দীর্ঘ এই কর্মজীবনের পাশাপাশি ক্রীড়া ও ধারাভাষ্যের প্রতি তাঁর আগ্রহ ক্রমেই গভীর হতে থাকে।
খেলার মাঠে প্রতিটি মুহূর্তকে ভাষায় তুলে ধরার দক্ষতা, খেলাটিকে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা এবং শ্রোতাদের কাছে মাঠের আবহ পৌঁছে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে ধীরে ধীরে ধারাভাষ্যের জগতে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশ বেতারে ধারাভাষ্যের পথচলা
শম্ভু মৈত্রের পেশাগত জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় শুরু হয় ২০১২ সালে, যখন তিনি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ বেতারের ক্রীড়া ধারাভাষ্যকার হিসেবে পথচলা শুরু করেন। এরপর থেকে অদ্যাবধি তিনি ক্রীড়া ধারাভাষ্যের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
রেডিওর শ্রোতাদের জন্য মাঠে উপস্থিত না থেকেও একটি ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তকে জীবন্ত করে তোলা সহজ কাজ নয়। বলের গতি, খেলোয়াড়ের কৌশল, ম্যাচের পরিস্থিতি এবং দর্শকদের আবেগ—সবকিছুকে তাৎক্ষণিকভাবে শব্দের মাধ্যমে তুলে ধরতে হয় একজন ধারাভাষ্যকারকে।
শম্ভু মৈত্র দীর্ঘদিন ধরে সেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
তাঁর ধারাভাষ্যকার হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণাগুলোর একটি ছিল স্থানীয় খেলার মাঠ। যে মাঠে একসময় খেলাধুলার সঙ্গে তাঁর পরিচয়, সেই মাঠই যেন পরবর্তীতে তাঁকে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মাইক্রোফোন পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
মফস্বলের মাঠ থেকে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম
শম্ভু মৈত্রের জীবনকাহিনির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—তাঁর পথচলার শুরু হয়েছিল একেবারে স্থানীয় পর্যায়ের মাঠ থেকে। কুচিয়ামোড়ার সেই পরিচিত মাঠের অভিজ্ঞতা, শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা এবং ক্রীড়ার প্রতি ভালোবাসা একসময় তাঁকে নিয়ে যায় বাংলাদেশ বেতারের ক্রীড়া সম্প্রচারের জগতে।
একজন ধারাভাষ্যকারের কাজ শুধু খেলার বিবরণ দেওয়া নয়; বরং শ্রোতার কল্পনায় পুরো মাঠের একটি ছবি তৈরি করা। খেলায় উত্তেজনা তৈরি হলে কণ্ঠে তার প্রতিফলন ঘটানো, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে যথাযথভাবে তুলে ধরা এবং একই সঙ্গে তথ্য ও বিশ্লেষণের ভারসাম্য বজায় রাখা—এসবই একজন দক্ষ ধারাভাষ্যকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় শম্ভু মৈত্রও এই ধারাভাষ্যশিল্পকে নিজের কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছেন।
নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প
শম্ভু মৈত্রের শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং ধারাভাষ্যকার হিসেবে দীর্ঘ পথচলা দেখায়—একটি স্বপ্নের যাত্রা অনেক সময় শুরু হতে পারে খুব ছোট একটি জায়গা থেকে। গ্রামের একটি খেলার মাঠ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ক্রীড়া সম্প্রচারে দায়িত্ব পালন—এই দীর্ঘ যাত্রায় শিক্ষা, অধ্যবসায় ও ক্রীড়ার প্রতি ভালোবাসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মাগুরার কুচিয়ামোড়ার সন্তান শম্ভু মৈত্র তাই শুধু একজন ক্রীড়া ধারাভাষ্যকারের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নন; তাঁর জীবন স্থানীয় পর্যায় থেকে উঠে এসে বৃহত্তর পরিসরে নিজের জায়গা তৈরি করার একটি ধারাবাহিক গল্পও।
কুচিয়ামোড়ার মাঠে যার কণ্ঠের প্রথম অনুশীলন, আজ সেই কণ্ঠই বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে পৌঁছে যায় অসংখ্য ক্রীড়াপ্রেমীর কাছে—এটাই শম্ভু মৈত্রের পথচলার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।





















