০৫:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা প্রথম অগ্রাধিকার: টাইম ম্যাগাজিনকে তারেক রহমান

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১২:০৩:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ৩২

নিজস্ব প্রতিবেদক : ভেতর ও বাইরে নানা চাপের মধ্যে থাকা বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ক্ষমতায় এলে তাঁর সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, যাতে মানুষ রাস্তায় নিরাপদ বোধ করে। একই সঙ্গে তিনি আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, অর্থনৈতিক সংকট, মব সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।

প্রভাবশালী মার্কিন ম্যাগাজিন টাইমকে দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান কথা বলেন ধীরস্বরে, সংযত ভঙ্গিতে ও শান্ত কণ্ঠে।

তিনি বলেন, “খুব ঠান্ডা শীতে এখনো পিঠে ব্যথা হয়। কারাগারে নির্যাতনের ফল। তবে আমি এটাকে বোঝা মনে করি না। বরং এটি আমাকে মানুষের প্রতি আমার দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।”

২০০৭–০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ১৮ মাস কারাবন্দী ছিলেন তারেক রহমান। সেই সময় তাঁর ওপর চালানো শারীরিক নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, মেরুদণ্ডের জটিলতা আজও তাঁকে ভোগাচ্ছে। চিকিৎসার প্রয়োজনেই মূলত তিনি যুক্তরাজ্যে যান। সেই নির্বাসনই পরে দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনে রূপ নেয়।

তারেক রহমানের সাক্ষাৎকারের আলোকে টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ফেরার পরপরই তাঁর সামনে এসেছে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন বিএনপিকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপে দলটির সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেই অভ্যুত্থানে প্রাণ গেছে প্রায় দেড় হাজার মানুষের।

সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান নিজেকে এক ধরনের সেতুবন্ধন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন—একদিকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, অন্যদিকে জেন–জেড প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা। তিনি বলেন, “আমি এখানে এসেছি শুধু বাবা–মায়ের সন্তান পরিচয়ে নয়; দলের কর্মী–সমর্থকেরাই আমাকে এখানে এনেছেন।”

অতীত শাসনামল, বিশেষ করে ২০০১–০৬ মেয়াদে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বিএনপির দুর্বলতার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, “তারা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।”

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল মুদ্রা ও কমতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চাপে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও যুব বেকারত্ব ১৩ শতাংশের বেশি। তারেক রহমান দাবি করেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি পরিকল্পনাভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী।

তিনি ১২ হাজার মাইল খাল খনন, বছরে ৫ কোটি গাছ রোপণ, ঢাকায় নতুন সবুজ এলাকা সৃষ্টি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি শিক্ষার সংস্কার এবং বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারত্বে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, “আমার পরিকল্পনার ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলেই মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।”

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূরাজনৈতিক আগ্রহ এবং ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক, সবই আগামী সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলেন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি সতর্ক হলেও বাস্তববাদী অবস্থান তুলে ধরেন।

এরই মধ্যে দেশে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মব সহিংসতা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা। ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামীর উত্থান ও তরুণদের মধ্যে তাদের প্রভাব নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। তারেক রহমান বলেন, “আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা—যাতে মানুষ রাস্তায় নিরাপদ থাকে।”

তারেক রহমানের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে টাইমের পর্যবেক্ষণ—তিনি অন্তর্মুখী। লন্ডনে তাঁর সময় কাটত রিচমন্ড পার্কে হাঁটাহাঁটি আর ইতিহাসের বই পড়ে। তাঁর প্রিয় সিনেমা ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’; সিনেমাটি আটবার দেখেছেন বলেও হাসতে হাসতে জানান তিনি। দেশে ফিরে তাঁর জীবনে স্বাধীনতা কমেছে, চারদিকে কাঁটাতারের নিরাপত্তা, চলাচলে বিধিনিষেধ। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতাটাই সবচেয়ে বেশি মিস করি।’

Please Share This Post in Your Social Media

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা প্রথম অগ্রাধিকার: টাইম ম্যাগাজিনকে তারেক রহমান

আপডেট: ১২:০৩:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : ভেতর ও বাইরে নানা চাপের মধ্যে থাকা বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ক্ষমতায় এলে তাঁর সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, যাতে মানুষ রাস্তায় নিরাপদ বোধ করে। একই সঙ্গে তিনি আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, অর্থনৈতিক সংকট, মব সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।

প্রভাবশালী মার্কিন ম্যাগাজিন টাইমকে দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান কথা বলেন ধীরস্বরে, সংযত ভঙ্গিতে ও শান্ত কণ্ঠে।

তিনি বলেন, “খুব ঠান্ডা শীতে এখনো পিঠে ব্যথা হয়। কারাগারে নির্যাতনের ফল। তবে আমি এটাকে বোঝা মনে করি না। বরং এটি আমাকে মানুষের প্রতি আমার দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।”

২০০৭–০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ১৮ মাস কারাবন্দী ছিলেন তারেক রহমান। সেই সময় তাঁর ওপর চালানো শারীরিক নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, মেরুদণ্ডের জটিলতা আজও তাঁকে ভোগাচ্ছে। চিকিৎসার প্রয়োজনেই মূলত তিনি যুক্তরাজ্যে যান। সেই নির্বাসনই পরে দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনে রূপ নেয়।

তারেক রহমানের সাক্ষাৎকারের আলোকে টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ফেরার পরপরই তাঁর সামনে এসেছে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন বিএনপিকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপে দলটির সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেই অভ্যুত্থানে প্রাণ গেছে প্রায় দেড় হাজার মানুষের।

সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান নিজেকে এক ধরনের সেতুবন্ধন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন—একদিকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, অন্যদিকে জেন–জেড প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা। তিনি বলেন, “আমি এখানে এসেছি শুধু বাবা–মায়ের সন্তান পরিচয়ে নয়; দলের কর্মী–সমর্থকেরাই আমাকে এখানে এনেছেন।”

অতীত শাসনামল, বিশেষ করে ২০০১–০৬ মেয়াদে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বিএনপির দুর্বলতার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, “তারা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।”

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল মুদ্রা ও কমতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চাপে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও যুব বেকারত্ব ১৩ শতাংশের বেশি। তারেক রহমান দাবি করেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি পরিকল্পনাভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী।

তিনি ১২ হাজার মাইল খাল খনন, বছরে ৫ কোটি গাছ রোপণ, ঢাকায় নতুন সবুজ এলাকা সৃষ্টি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি শিক্ষার সংস্কার এবং বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারত্বে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, “আমার পরিকল্পনার ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলেই মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।”

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূরাজনৈতিক আগ্রহ এবং ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক, সবই আগামী সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলেন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি সতর্ক হলেও বাস্তববাদী অবস্থান তুলে ধরেন।

এরই মধ্যে দেশে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মব সহিংসতা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা। ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামীর উত্থান ও তরুণদের মধ্যে তাদের প্রভাব নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। তারেক রহমান বলেন, “আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা—যাতে মানুষ রাস্তায় নিরাপদ থাকে।”

তারেক রহমানের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে টাইমের পর্যবেক্ষণ—তিনি অন্তর্মুখী। লন্ডনে তাঁর সময় কাটত রিচমন্ড পার্কে হাঁটাহাঁটি আর ইতিহাসের বই পড়ে। তাঁর প্রিয় সিনেমা ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’; সিনেমাটি আটবার দেখেছেন বলেও হাসতে হাসতে জানান তিনি। দেশে ফিরে তাঁর জীবনে স্বাধীনতা কমেছে, চারদিকে কাঁটাতারের নিরাপত্তা, চলাচলে বিধিনিষেধ। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতাটাই সবচেয়ে বেশি মিস করি।’