শিক্ষকদের শহরমুখীতায় পিছিয়ে পড়ছে গ্রামের শিক্ষার্থীরা
- আপডেট: ০৮:১০:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
- / ১৪

।। স্বপন বিশ্বাস।।
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি শিক্ষা। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার উপর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের শিক্ষা খাতে এখনো শহর ও গ্রামের মধ্যে একটি বড় বৈষম্য বিদ্যমান।
এই বৈষম্যের একটা অন্যতম কারণ শিক্ষকদের শহরমুখীতা। যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের অধিকাংশই শহরের বিদ্যালয়, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকতে আগ্রহী।
ফলে গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে শিক্ষক সংকট, মানসম্পন্ন শিক্ষার অভাব এবং শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়ার প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামের স্কুলগুলো একসময় সমাজ গঠনের প্রধান কেন্দ্র ছিল। সেখান থেকেই উঠে এসেছেন দেশের বহু খ্যাতিমান ব্যক্তি, শিক্ষক, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদ। কিন্তু বর্তমানে গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই হতাশাজনক।
অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। আবার যারা আছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না কিংবা সুযোগ পেলেই শহরমুখী হওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
শহরমুখী হওয়ার পেছনে শিক্ষকদের কিছু যৌক্তিক কারণও রয়েছে। শহরে উন্নত চিকিৎসা, সন্তানের ভালো শিক্ষা, নিরাপদ আবাসন, সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সামাজিক সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক বেশি। একজন শিক্ষকও একজন মানুষ; তারও পরিবার আছে, সন্তান আছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা আছে। তাই অনেকেই গ্রামে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকতে চান না। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও জাতীয় দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের উপর।
গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটের কারণে একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয়ে পাঠদান করতে হয়। কখনো কখনো বিজ্ঞান শিক্ষক বাংলা পড়ান, আবার বাংলা শিক্ষক গণিত ক্লাস নেন। এতে শিক্ষার গুণগত মান স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে শহরের অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শিক্ষক থাকলেও গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতে পদ দীর্ঘদিন খালি পড়ে থাকে। ফলে শহর ও গ্রামের শিক্ষার ব্যবধান আরও বাড়তে থাকে।
বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। শহরের শিক্ষার্থীরা স্মার্ট ক্লাসরুম, কম্পিউটার ল্যাব, ইন্টারনেট এবং বিভিন্ন কোচিং সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী এখনো এসব সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
এর সঙ্গে যদি দক্ষ শিক্ষকের অভাব যুক্ত হয়, তাহলে তারা প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে পিছিয়ে পড়বে—এটাই স্বাভাবিক। ফলাফল বিশ্লেষণ করলেও দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে শহরের শিক্ষার্থীরা গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় ভালো অবস্থানে থাকে। এর অন্যতম কারণ শিক্ষার পরিবেশ ও মানের পার্থক্য।
শিক্ষকদের শহরমুখীতার আরেকটি নেতিবাচক দিক হলো মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণার অভাব। একজন দক্ষ শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন নির্মাণ করেন, নৈতিকতা শেখান এবং জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করেন। যখন কোনো গ্রামীণ বিদ্যালয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক থাকেন না, তখন শিক্ষার্থীরা সেই দিকনির্দেশনা থেকেও বঞ্চিত হয়। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী অকালেই ঝরে পড়ে কিংবা নিজের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার সুযোগ পায় না।
এই সমস্যা সমাধানে সরকারের পাশাপাশি সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। প্রথমত, গ্রামীণ এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা, উন্নত আবাসন সুবিধা এবং চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে একটি সুষম নীতি প্রণয়ন প্রয়োজন, যাতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দক্ষ শিক্ষকের সমান বণ্টন নিশ্চিত হয়। তৃতীয়ত, গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। এতে শিক্ষকরা গ্রামে কর্মরত থাকতে আরও উৎসাহিত হবেন।
এছাড়া শিক্ষক নিয়োগের সময় স্থানীয় যোগ্য প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। স্থানীয় শিক্ষকরা সাধারণত নিজ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী হন। একই সঙ্গে অনলাইন শিক্ষা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে শহর ও গ্রামের শিক্ষার ব্যবধান কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। একজন গ্রামের শিশুর শিক্ষার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শহরের শিশুরও। রাষ্ট্র যদি শিক্ষার সমতা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে উন্নয়নের সুফল কখনোই সবার কাছে পৌঁছাবে না। একটি জাতির অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন শহর ও গ্রামের প্রতিটি শিশুই সমান সুযোগ পায়।
শিক্ষকদের শহরমুখীতা কেবল একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। আজ যারা গ্রামের বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তারাই আগামী দিনের নাগরিক। তাদের পিছিয়ে পড়া মানে দেশের একটি বড় অংশের সম্ভাবনাকে পিছিয়ে দেওয়া। তাই এখনই প্রয়োজন কার্যকর নীতি, আন্তরিক উদ্যোগ এবং শিক্ষার সমবণ্টন নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয়। কারণ গ্রাম পিছিয়ে থাকলে দেশ এগোতে পারে না; আর গ্রামের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়লে জাতির ভবিষ্যৎও কখনো আলোকিত হতে পারে না।



























