০৯:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

*নতুন বছরে নতুন শপথের ডাক*  পহেলা বৈশাখ ॥ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ*

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৯:২০:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
  • /

লক্ষণ কুমার মন্ডলঃ
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়- নব আনন্দে জাগো আজি নব রবি কিরণে/শুভ্র সুন্দর প্রীতি-উজ্জ্বল নির্মল জীবনে…। একই আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে নজরুল লিখেছেন- তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর…। এমনই আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে সবারই মুখে মুখে একই সম্ভাষণ শুভ বাংলা নববর্ষ; শুভ বাংলা নববর্ষ। যে নববর্ষ শুরু হয় বৈশাখ মাসে আর শেষ হয় চৈত্রে।

চৈত্রের খরতাপ শেষে বৈশাখ আসে নতুনের বার্তা নিয়ে। কৃষকের গোলাভরার হিসাব, ব্যবসায়ীর হালখাতা, শিশুর নতুন জামা, আর বাঙালির প্রাণের উৎসব, সব মিলে পহেলা বৈশাখ। আজ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। নতুন প্রভাতের নতুন আলোয় বাঙালির নব উদ্যমে নতুন শপথ নেয়ার দিন-‘কাৎ হয়ে থাকা সমাজটাকে সমান্তরালে ফেরাব। ঘৃণা নয়, প্রশ্ন নয়, মানুষকে ভালোবাসব। কারণ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’।’
#বৈশাখ_মানে_শুধু_উৎসব_নয়

মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সনের প্রবর্তন। ফসল ওঠার পর খাজনা দেওয়ার রীতি থেকেই ‘হালখাতা’র জন্ম। ব্যবসায়ীরা পুরোনো হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা খুলতেন, ক্রেতাকে মিষ্টিমুখ করাতেন। সেই ঐতিহ্য আজও টিকে আছে।

কিন্তু বৈশাখ কেবল হিসাবের খাতা নয়। এটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার সবচেয়ে বড় প্রকাশ। ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি ভুলে রাস্তায় নামে মানুষ। পান্তা-ইলিশ, মুখোশ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, আনন্দ শোভাযাত্রা, বৈশাখি শোভাযাত্রা, গান, কবিতা, সব মিলে আমরা একটাই পরিচয়ে ফিরে যাই : আমরা বাঙালি।

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে সবচেয়ে নিবিড় সম্পর্ক কৃষির। এ সম্পর্কের সূত্রেই বাংলা সাল প্রবর্তন করেন সম্রাট আকবর। বাংলা সাল তার আমলেই প্রবর্তন হয়। এখন তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত। বঙ্গাব্দের মাস হিসেবে বৈশাখের প্রথম স্থান অধিকার করার ইতিহাসটি বেশি দিনের না হলেও আদি সাহিত্যে বৈশাখের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। দক্ষের ২৭ কন্যার মধ্যে অনন্য সুন্দরী অথচ খরতাপময় মেজাজসম্পন্ন একজনের নাম বিশাখা। এই বিশাখা নক্ষত্রের নামানুসারেই বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখের নামকরণ। বৈদিক যুগে সৌর মতে, বৎসর গণনার পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। সেখানেও সন্ধান মেলে বৈশাখের।
পহেলা বৈশাখ বাংলা ও বাঙালির সার্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসবের দিন। এ উৎসবের সাথে মিশে আছে আবহমান বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। মোগল আমলে ১৪-১৫ শতাব্দী থেকে শুরু হয় এ উৎসব। শুরু করেন তৃতীয় মোঘল সম্রাট মুহাম্মদ আকবর (১৫৫৬-১৬০৫ খ্রি.)।

‘মোঘল আমলে কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব হিসেবে আদায় করা হতো এক তৃতীয়াংশ ফসল। কিন্তু ঐ পরিমাণ খাজনা দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না কৃষকদের। তাই খাজনা আদায় নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য সমগ্র রাজ্যে ফরমান জারি করা হয় যে, রাজ্যের সব জমি জরিপ করতে হবে। বেঁধে দেওয়া হয় খাজনা পরিশোধের নির্দিষ্ট সময়সীমা। দরবারে বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতদের নিয়ে তৈরি করা হয় একটি অব্দ। রাজ্যের কৃষকরা নতুন অব্দের প্রথম মাস বৈশাখে জমিতে বাংলার প্রধান খাবার ধান বপন করতো। ঘরে-ঘরে রান্নার আয়োজন চলতো। সারা পাড়ায় আনন্দের ধুম পড়ে যেত। অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্তরা নতুন বছরের প্রথম দিনে খুলতেন হালখাতা। পুরোনো হিসাব-খাতা বাদ দিয়ে নতুন হালখাতা খুলতেন। চলতো গান ও নাচের আসর। সম্রাট পরিবর্তন, উন্নত শৃঙ্খলায় বাংলায় দৃঢ় কর সংগ্রহে সহজ করার জন্য এ নিয়ম বা বাংলা ক্যালেন্ডার চালু করেন। ১৫৮৪ সালে তিনি বাংলা ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন। তবে ক্যালেন্ডার বছর শুরু হয় ১৫৮৫ সাল থেকে। আর কার্যকর হয় ১৫৮৬ সাল থেকে।’

গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে বছরের ১৪ বা ১৫ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। কিন্তু আমাদের দেশে প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল এ উৎসব পালিত হয়ে আসছে। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে দিনটি নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বাংলা দিনপঞ্জির সঙ্গে হিজরি ও খ্রিষ্টীয় সনের মৌলিক পার্থক্য আছে। হিজরি সন চলে চাঁদের হিসেবে এবং খ্রিষ্টীয় সন চলে ঘড়ির হিসেবে। হিজরিতে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনে। ইংরেজি দিন শুরু হয় মধ্যরাতে। পহেলা বৈশাখ রাত ১২টা থেকে শুরু না হয়ে সূর্যোদয় থেকে শুরু। এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে ঐতিহ্যগতভাবে সূর্যোদয় থেকে বাংলা দিন গণনার নিয়ম আছে।

কিন্তু ১৪০২ সনের পহেলা বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমি এ নিয়ম বাতিল করে রাত ১২টা থেকে করে। আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এ নিয়ম চালু করা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর উৎসবের আমেজে দিনটি পালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও বাংলা নববর্ষকে বরণের জন্য সর্বস্তরের লোকজন দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রস্তুতি নিয়েছে। সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী আয়োজন করেছে গান-আবৃত্তির আসর। বিভিন্নস্থানে বসেছে বৈশাখি মেলা।

এদিন সারা বিশ্বের বাঙালিরা শোভাযাত্রার আয়োজনে মেতে উঠে। যে শোভাযাত্রা শুরু হয়েছিল যশোর থেকেই। বাংলা নববর্ষে উৎসব প্রকাশের অন্যতম অনুষঙ্গ যশোরের মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন বিশ্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্যের অংশ। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আবেদনে ২০১৬-এর ৩০ নভেম্বর জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কো বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে তাদের ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে এই শোভাযাত্রা এখন কেবল বর্ষবরণ উৎসবের অনুষঙ্গই নয়, এর মধ্য দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতিকে মেলে ধরার পাশাপাশি সমাজে অবক্ষয় থেকে মুক্তি, পেছনের দিকে হাঁটা প্রতিরোধের আহ্বানও জানানো হয়।

*১৪৩২ পেরিয়ে ১৪৩৩ : কী পেলাম, কী হারালাম?*
বিদায়ি ১৪৩২ ছিল ঘটনাবহুল। অর্থনীতির টানাপড়েন, দ্রব্যমূল্যের চাপ, আবার পদ্মা সেতুতে স্বপ্নের রেল, মেট্রোরেলের নতুন রুট, তরুণদের ফ্রিল্যান্সিংয়ে বিশ্বজয়, সবই ছিল। আমরা হারিয়েছি অনেক গুণীজনকে, আবার পেয়েছি নতুন প্রতিভা।

সংস্কৃতির মাঠে অসহিষ্ণুতা দেখেছি, আবার দেখেছি প্রতিরোধও। কুষ্টিয়ায় বাউল হত্যার কালো ছায়া যেমন আছে, তেমনি আছে লালনের গানের নতুন শ্রোতা। সমাজ এখনো কাৎ হয়ে আছে, কিন্তু তরুণরা প্রশ্ন করছে। এই প্রশ্নটাই আশার আলো।

*১৪৩৩- এর কাছে প্রত্যাশা*
নতুন বছর মানে নতুন শপথ। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে আমাদের চাওয়া স্পষ্ট :
১. সহনশীলতা : ভিন্নমত যেন ভয় না হয়। বাউল, কবি, নাস্তিক, আস্তিক, সবাই যেন নির্ভয়ে কথা বলতে পারে।
২. ন্যায় : মব নয়, আদালত যেন কথা বলে। অপরাধের দ্রুত বিচার হোক।
৩. সংস্কৃতির স্রোত : নববর্ষ মানে শুধু একদিনের পান্তা নয়। সারা বছর যেন লালন, হাসন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বেঁচে থাকে পাঠ্যবইয়ে, চায়ের আড্ডায়, ইউটিউবের প্লে-লিস্টে।
৪. অর্থনৈতিক মুক্তি : হালখাতা শুধু ব্যবসায়ীর না হোক। প্রতিটি পরিবার যেন পুরোনো দেনা চুকিয়ে নতুন খাতায় লাভের হিসাব লিখতে পারে।
৫. প্রকৃতির কাছে ফেরা : বৈশাখ মানে কালবৈশাখি। জলবায়ু বদলাচ্ছে। নদী বাঁচলে, গাছ বাঁচলে, আমরাও বাঁচব। ১৪৩৩ হোক সবুজের বছর।

*শেষ কথা : মঙ্গল শোভাযাত্রার মানে*
ইউনেস্কো স্বীকৃত ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ আমাদের বলে, অশুভকে তাড়াতে হবে। প্যাঁচা অন্ধকার দূর করে, বাঘ সাহস জোগায়, মাছ সচলতার প্রতীক। এই প্রতীকগুলো শুধু মুখোশে নয়, মনে ধারণ করতে হবে।
শুভ নববর্ষ ১৪৩৩। নতুন বছর সবার জীবনে আনুক শান্তি, সমৃদ্ধি আর সাহস।

লক্ষণ কুমার মন্ডল
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামালিষ্ট।

Please Share This Post in Your Social Media

*নতুন বছরে নতুন শপথের ডাক*  পহেলা বৈশাখ ॥ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ*

আপডেট: ০৯:২০:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

লক্ষণ কুমার মন্ডলঃ
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়- নব আনন্দে জাগো আজি নব রবি কিরণে/শুভ্র সুন্দর প্রীতি-উজ্জ্বল নির্মল জীবনে…। একই আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে নজরুল লিখেছেন- তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর…। এমনই আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে সবারই মুখে মুখে একই সম্ভাষণ শুভ বাংলা নববর্ষ; শুভ বাংলা নববর্ষ। যে নববর্ষ শুরু হয় বৈশাখ মাসে আর শেষ হয় চৈত্রে।

চৈত্রের খরতাপ শেষে বৈশাখ আসে নতুনের বার্তা নিয়ে। কৃষকের গোলাভরার হিসাব, ব্যবসায়ীর হালখাতা, শিশুর নতুন জামা, আর বাঙালির প্রাণের উৎসব, সব মিলে পহেলা বৈশাখ। আজ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। নতুন প্রভাতের নতুন আলোয় বাঙালির নব উদ্যমে নতুন শপথ নেয়ার দিন-‘কাৎ হয়ে থাকা সমাজটাকে সমান্তরালে ফেরাব। ঘৃণা নয়, প্রশ্ন নয়, মানুষকে ভালোবাসব। কারণ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’।’
#বৈশাখ_মানে_শুধু_উৎসব_নয়

মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সনের প্রবর্তন। ফসল ওঠার পর খাজনা দেওয়ার রীতি থেকেই ‘হালখাতা’র জন্ম। ব্যবসায়ীরা পুরোনো হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা খুলতেন, ক্রেতাকে মিষ্টিমুখ করাতেন। সেই ঐতিহ্য আজও টিকে আছে।

কিন্তু বৈশাখ কেবল হিসাবের খাতা নয়। এটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার সবচেয়ে বড় প্রকাশ। ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি ভুলে রাস্তায় নামে মানুষ। পান্তা-ইলিশ, মুখোশ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, আনন্দ শোভাযাত্রা, বৈশাখি শোভাযাত্রা, গান, কবিতা, সব মিলে আমরা একটাই পরিচয়ে ফিরে যাই : আমরা বাঙালি।

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে সবচেয়ে নিবিড় সম্পর্ক কৃষির। এ সম্পর্কের সূত্রেই বাংলা সাল প্রবর্তন করেন সম্রাট আকবর। বাংলা সাল তার আমলেই প্রবর্তন হয়। এখন তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত। বঙ্গাব্দের মাস হিসেবে বৈশাখের প্রথম স্থান অধিকার করার ইতিহাসটি বেশি দিনের না হলেও আদি সাহিত্যে বৈশাখের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। দক্ষের ২৭ কন্যার মধ্যে অনন্য সুন্দরী অথচ খরতাপময় মেজাজসম্পন্ন একজনের নাম বিশাখা। এই বিশাখা নক্ষত্রের নামানুসারেই বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখের নামকরণ। বৈদিক যুগে সৌর মতে, বৎসর গণনার পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। সেখানেও সন্ধান মেলে বৈশাখের।
পহেলা বৈশাখ বাংলা ও বাঙালির সার্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসবের দিন। এ উৎসবের সাথে মিশে আছে আবহমান বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। মোগল আমলে ১৪-১৫ শতাব্দী থেকে শুরু হয় এ উৎসব। শুরু করেন তৃতীয় মোঘল সম্রাট মুহাম্মদ আকবর (১৫৫৬-১৬০৫ খ্রি.)।

‘মোঘল আমলে কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব হিসেবে আদায় করা হতো এক তৃতীয়াংশ ফসল। কিন্তু ঐ পরিমাণ খাজনা দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না কৃষকদের। তাই খাজনা আদায় নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য সমগ্র রাজ্যে ফরমান জারি করা হয় যে, রাজ্যের সব জমি জরিপ করতে হবে। বেঁধে দেওয়া হয় খাজনা পরিশোধের নির্দিষ্ট সময়সীমা। দরবারে বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতদের নিয়ে তৈরি করা হয় একটি অব্দ। রাজ্যের কৃষকরা নতুন অব্দের প্রথম মাস বৈশাখে জমিতে বাংলার প্রধান খাবার ধান বপন করতো। ঘরে-ঘরে রান্নার আয়োজন চলতো। সারা পাড়ায় আনন্দের ধুম পড়ে যেত। অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্তরা নতুন বছরের প্রথম দিনে খুলতেন হালখাতা। পুরোনো হিসাব-খাতা বাদ দিয়ে নতুন হালখাতা খুলতেন। চলতো গান ও নাচের আসর। সম্রাট পরিবর্তন, উন্নত শৃঙ্খলায় বাংলায় দৃঢ় কর সংগ্রহে সহজ করার জন্য এ নিয়ম বা বাংলা ক্যালেন্ডার চালু করেন। ১৫৮৪ সালে তিনি বাংলা ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন। তবে ক্যালেন্ডার বছর শুরু হয় ১৫৮৫ সাল থেকে। আর কার্যকর হয় ১৫৮৬ সাল থেকে।’

গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে বছরের ১৪ বা ১৫ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। কিন্তু আমাদের দেশে প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল এ উৎসব পালিত হয়ে আসছে। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে দিনটি নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বাংলা দিনপঞ্জির সঙ্গে হিজরি ও খ্রিষ্টীয় সনের মৌলিক পার্থক্য আছে। হিজরি সন চলে চাঁদের হিসেবে এবং খ্রিষ্টীয় সন চলে ঘড়ির হিসেবে। হিজরিতে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনে। ইংরেজি দিন শুরু হয় মধ্যরাতে। পহেলা বৈশাখ রাত ১২টা থেকে শুরু না হয়ে সূর্যোদয় থেকে শুরু। এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে ঐতিহ্যগতভাবে সূর্যোদয় থেকে বাংলা দিন গণনার নিয়ম আছে।

কিন্তু ১৪০২ সনের পহেলা বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমি এ নিয়ম বাতিল করে রাত ১২টা থেকে করে। আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এ নিয়ম চালু করা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর উৎসবের আমেজে দিনটি পালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও বাংলা নববর্ষকে বরণের জন্য সর্বস্তরের লোকজন দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রস্তুতি নিয়েছে। সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী আয়োজন করেছে গান-আবৃত্তির আসর। বিভিন্নস্থানে বসেছে বৈশাখি মেলা।

এদিন সারা বিশ্বের বাঙালিরা শোভাযাত্রার আয়োজনে মেতে উঠে। যে শোভাযাত্রা শুরু হয়েছিল যশোর থেকেই। বাংলা নববর্ষে উৎসব প্রকাশের অন্যতম অনুষঙ্গ যশোরের মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন বিশ্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্যের অংশ। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আবেদনে ২০১৬-এর ৩০ নভেম্বর জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কো বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে তাদের ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে এই শোভাযাত্রা এখন কেবল বর্ষবরণ উৎসবের অনুষঙ্গই নয়, এর মধ্য দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতিকে মেলে ধরার পাশাপাশি সমাজে অবক্ষয় থেকে মুক্তি, পেছনের দিকে হাঁটা প্রতিরোধের আহ্বানও জানানো হয়।

*১৪৩২ পেরিয়ে ১৪৩৩ : কী পেলাম, কী হারালাম?*
বিদায়ি ১৪৩২ ছিল ঘটনাবহুল। অর্থনীতির টানাপড়েন, দ্রব্যমূল্যের চাপ, আবার পদ্মা সেতুতে স্বপ্নের রেল, মেট্রোরেলের নতুন রুট, তরুণদের ফ্রিল্যান্সিংয়ে বিশ্বজয়, সবই ছিল। আমরা হারিয়েছি অনেক গুণীজনকে, আবার পেয়েছি নতুন প্রতিভা।

সংস্কৃতির মাঠে অসহিষ্ণুতা দেখেছি, আবার দেখেছি প্রতিরোধও। কুষ্টিয়ায় বাউল হত্যার কালো ছায়া যেমন আছে, তেমনি আছে লালনের গানের নতুন শ্রোতা। সমাজ এখনো কাৎ হয়ে আছে, কিন্তু তরুণরা প্রশ্ন করছে। এই প্রশ্নটাই আশার আলো।

*১৪৩৩- এর কাছে প্রত্যাশা*
নতুন বছর মানে নতুন শপথ। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে আমাদের চাওয়া স্পষ্ট :
১. সহনশীলতা : ভিন্নমত যেন ভয় না হয়। বাউল, কবি, নাস্তিক, আস্তিক, সবাই যেন নির্ভয়ে কথা বলতে পারে।
২. ন্যায় : মব নয়, আদালত যেন কথা বলে। অপরাধের দ্রুত বিচার হোক।
৩. সংস্কৃতির স্রোত : নববর্ষ মানে শুধু একদিনের পান্তা নয়। সারা বছর যেন লালন, হাসন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বেঁচে থাকে পাঠ্যবইয়ে, চায়ের আড্ডায়, ইউটিউবের প্লে-লিস্টে।
৪. অর্থনৈতিক মুক্তি : হালখাতা শুধু ব্যবসায়ীর না হোক। প্রতিটি পরিবার যেন পুরোনো দেনা চুকিয়ে নতুন খাতায় লাভের হিসাব লিখতে পারে।
৫. প্রকৃতির কাছে ফেরা : বৈশাখ মানে কালবৈশাখি। জলবায়ু বদলাচ্ছে। নদী বাঁচলে, গাছ বাঁচলে, আমরাও বাঁচব। ১৪৩৩ হোক সবুজের বছর।

*শেষ কথা : মঙ্গল শোভাযাত্রার মানে*
ইউনেস্কো স্বীকৃত ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ আমাদের বলে, অশুভকে তাড়াতে হবে। প্যাঁচা অন্ধকার দূর করে, বাঘ সাহস জোগায়, মাছ সচলতার প্রতীক। এই প্রতীকগুলো শুধু মুখোশে নয়, মনে ধারণ করতে হবে।
শুভ নববর্ষ ১৪৩৩। নতুন বছর সবার জীবনে আনুক শান্তি, সমৃদ্ধি আর সাহস।

লক্ষণ কুমার মন্ডল
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামালিষ্ট।