মাগুরা-২ আসনের জীবন্ত কিংবদন্তি অ্যাড. নিতাই রায় চৌধুরী: এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন
- আপডেট: ১১:২৩:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
- / ০

শালিখা (মাগুরা) প্রতিনিধি:লক্ষণ কুমার মন্ডল।।।
মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ও জীবন্ত কিংবদন্তির নাম অ্যাড. নিতাই রায় চৌধুরী। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে আজ অবধি এই জনপদ থেকে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দুই দফায় রাষ্ট্রের পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা লাভ করেছেন। তৃণমূল থেকে জাতীয় রাজনীতির শিখরে পৌঁছানো তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা যেন এক নিরলস সংগ্রাম ও সফলতার মহাকাব্য।
জন্ম ও শৈশব:
১৯৪৯ সালের ৭ জানুয়ারি মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার বাবুখালী ইউনিয়নের হাটবাড়িয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন অ্যাড. নিতাই রায় চৌধুরী। গ্রামবাংলার মেঠো পথেই তাঁর শৈশব ও কৈশোরের বেড়ে ওঠা।
শিক্ষাজীবন:
তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু মাগুরার স্থানীয় বিদ্যাপীঠে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে এলএলবি (L.L.B) ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন সময়েই তাঁর প্রখর মেধা ও নেতৃত্বের গুণাবলি সবার নজর কাড়ে।
রাজনীতির হাতেখড়ি ও রাজপথের সংগ্রাম:
ষাটের দশকের উত্তাল সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তৎকালীন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র ইউনিয়ন’-এর মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক অভিযাত্রা শুরু। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই ছাত্র রাজনীতিই তাঁর ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের মজবুত ভিত গড়ে দেয়।
পেশাজীবন: আইন অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র
শিক্ষা শেষে তিনি আইন পেশাকে বেছে নেন এবং অল্প সময়েই বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনি অধিকার আদায়ে তাঁর বলিষ্ঠ অবস্থান তাঁকে উচ্চ আদালতের এক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধিত্ব:
জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের পাশাপাশি মাগুরার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়ও তিনি নিজেকে অপরিহার্য করে তোলেন। আশির দশকে তিনি মাগুরা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় জেলার অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
সংসদ সদস্য ও প্রথম মন্ত্রিত্ব:
১৯৮৮ সালে তিনি মাগুরা-২ আসন থেকে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালে তিনি সরকারের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। মহম্মদপুরের ইতিহাসে সেটিই ছিল কোনো নেতার প্রথম মন্ত্রিত্ব লাভ, যা পুরো উপজেলাবাসীর জন্য ছিল এক বিশাল গৌরব।
জাতীয় নেতৃত্ব ও উত্তরসূরি:
পরবর্তীতে অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি দলটির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর সুযোগ্য কন্যা অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী এবং পুত্র অ্যাডভোকেট মিথুন রায় চৌধুরীও বাবার উত্তরসূরি হিসেবে রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: দ্বিতীয়বার মন্ত্রিত্ব (২০২৬)
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাগুরা-২ আসন থেকে তিনি পুনরায় বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি গঠিত বর্তমান মন্ত্রিসভায় তিনি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও মূল্যায়ন:
১৯৪৭ সাল থেকে ২০২৬—গত ৭৯ বছরের ইতিহাসে মহম্মদপুর উপজেলা থেকে তিনিই প্রথম এবং একমাত্র ব্যক্তি যিনি দুই দফায় পূর্ণ মন্ত্রীর অনন্য গৌরব অর্জন করেছেন। মহম্মদপুরের আর কোনো রাজনীতিক আজ অবধি এই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেননি।
হাটবাড়িয়া গ্রামের সেই মেঠো পথ থেকে সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর—অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীর এই দীর্ঘ যাত্রা প্রমাণ করে যে সততা, মেধা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে একজন মানুষ প্রকৃত অর্থেই কিংবদন্তিতে পরিণত হন। মহম্মদপুরবাসীর কাছে তিনি এক আলোকবর্তিকা, যার নাম ইতিহাসের পাতায় চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


























