পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে সামান্তা শারমিনের তোপ:এনসিপির রাজনীতি নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য
- আপডেট: ০৮:৪৪:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / ৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও বিশিষ্ট নেত্রী সামান্তা শারমিন। গত ২৩ অক্টোবর ঘোষিত নতুন কমিটিতে পদাবনতির গুঞ্জনের মধ্যেই বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এক দীর্ঘ ফেসবুক বিবৃতির মাধ্যমে তিনি দল ছাড়ার ঘোষণা দেন। তার এই পদত্যাগ কেবল একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নয়, বরং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি, আদর্শিক দ্বন্দ্ব এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সম্ভাবনার সামনে এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
সামান্তা শারমিনের পদত্যাগের মূল পটভূমি ও কারণসমূহ
সামান্তা শারমিনের ফেসবুক পোস্ট এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক পর্যালোচনায় এনসিপির বিরুদ্ধে মূলত তিনটি মৌলিক অভিযোগ ও আদর্শিক বিচ্যুতির কথা উঠে এসেছে:
১. জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট এবং সংস্কারের আদর্শিক বিচ্যুতি
সামান্তা শারমিনের পদত্যাগের সবচেয়ে বড় ভিত্তি ছিল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির কৌশলগত ও আদর্শিক সখ্য। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, সাংবিধানিক, আইনি এবং রাজনৈতিক সংস্কারের কোনো প্রকৃত এজেন্ডা জামায়াতের রাষ্ট্রপ্রকল্পে নেই।
গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের দ্বান্দ্বিক রূপ: তার মতে, জামায়াত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক অভিপ্রায় পোষণ করে। একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাওয়ার বিষয়টি জামায়াতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল প্রতিবন্ধক।
রাজনীতি হারানো: এনসিপি যখন জামায়াতকে সংস্কারের পথে বন্ধু মনে করেছে, তখন সাধারণ মানুষ এনসিপির প্রকৃত রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। দলের নিজস্ব লাইন স্পষ্ট না থাকায় এনসিপি ধীরে ধীরে জামায়াতের লেজুড় বা সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়েছে বলে তার অভিযোগ।
২. ২৬-এর নির্বাচন ও রাজনৈতিক কৌশলের বিপর্যয়
আসন্ন ২৬-এর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এনসিপির নির্বাচনী কৌশল নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সামান্তা শারমিন।
ক্ষমতা বদল বনাম রাজনৈতিক পরিবর্তন: এই নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতার পালাবদল না ভেবে একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত ছিল। কিন্তু এনসিপি ইতিহাসের শিক্ষা উপেক্ষা করে তথাকথিত ‘বড়’ দলের জোটে অংশ নিয়ে নিজেদের নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করেছে।
নিরাপত্তাহীনতার ভুল ব্যাখ্যা: শহীদ ওসমান হাদীর সাহসিকতা ও একা লড়াই করার আদর্শকে পাশ কাটিয়ে ‘বড় দলের সঙ্গে জোট’ বাঁধার কারণ হিসেবে তার মৃত্যুকে ব্যবহার করাকে তিনি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন।
৩. অভ্যুত্থানে নারীর মালিকানা ও কোণঠাসা করার রাজনীতি
সামান্তা শারমিনের বিবৃতির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও জোরালো অংশ জুড়ে রয়েছে গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অধিকার এবং পরবর্তীতে তাদের প্রান্তিক করার বিষয়টি।
ব্যবহারের রাজনীতি বনাম প্রকৃত অংশীদারিত্ব: আন্দোলনে নারীরা সম্মুখসারির যোদ্ধা ও রক্ষাকর্তা হলেও, বিজয়ের পর পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক দলগুলোর মতো এনসিপিও নারীদের কোণঠাসা করেছে এবং পুরুষতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বজায় রেখেছে।
ইতিবাচক বৈষম্যের অনুপস্থিতি: জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি অংশ হওয়া সত্ত্বেও নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর ক্ষমতা ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান না দেওয়ার মাধ্যমে এনসিপি ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের মারাত্মক অবনমন ঘটিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
এনসিপির ভবিষ্যৎ ও রাজনৈতিক প্রভাব
সামান্তা শারমিনের এই পদত্যাগ এনসিপির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। দীর্ঘ ১১ মাস ধরে দলের অভ্যন্তরে মতাদর্শিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পর তার এই প্রস্থান প্রমাণ করে যে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় আদর্শিক ও কৌশলগত ফাটল ধরা পড়েছে।
বিশেষ করে, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নারী প্রতিনিধিত্বের মতো মৌলিক ইস্যুতে এনসিপির বর্তমান নেতৃত্ব কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে, তার ওপর দলটির দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদত্যাগ বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ও তার গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রে একটি বড় শিক্ষা ও আত্মমূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে।



























