গাছ লাগিয়ে দায়িত্ব শেষ নয়, পরিচর্যা করে বড় করতে পারলেই পুরস্কার: শেফালিকা ত্রিপুরা
- আপডেট: ০৯:২৬:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬
- / ১০

খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:
“গাছ লাগিয়ে দায়িত্ব শেষ নয়; প্রতিটি চারাকে সন্তানসম যত্নে লালন করে বড় করে তুলতে হবে।
যে উপকারভোগী কমিটি সবচেয়ে আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে রোপণ করা গাছগুলোর পরিচর্যা করবে এবং সেগুলোকে সফলভাবে বড় করে তুলবে, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হবে। একটি পরিণত গাছ শুধু পাহাড়কে সবুজে আচ্ছাদিত করে না, এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, ভূমিক্ষয় কমায়, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে এবং পাহাড়ের সৌন্দর্য বহুগুণ বৃদ্ধি করে। তাই আজকের প্রতিটি চারা আগামী দিনের নিরাপদ, সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার।”
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং পাহাড়ি পরিবেশ সংরক্ষণে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব তুলে ধরে কথাগুলো বলেছেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ঘোষিত পাঁচ বছরে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রবিবার খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের ‘করলিয়া’ প্রকল্পের উদ্যোগে এবং ইআরআরডি-সিএইচটি ও ইউএনডিপি-এর সহযোগিতায় মাটিরাঙ্গা-রামগড় সীমান্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে একযোগে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
সকাল থেকে দিনব্যাপী আয়োজিত এ কর্মসূচিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নারী জলবায়ু সহনশীল কমিটির সদস্য, উপকারভোগী কমিটি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সীমান্তঘেঁষা সড়কজুড়ে সৃষ্টি হয় এক ব্যতিক্রমী সবুজায়নের আবহ।
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন শেষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, বৃক্ষরোপণের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করে গাছের পরিচর্যার ওপর। একটি চারা রোপণের পর নিয়মিত পরিচর্যা, আগাছা পরিষ্কার, প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ এবং সার্বক্ষণিক তদারকি নিশ্চিত করা গেলে সেটিই একদিন বড় বৃক্ষে পরিণত হয়ে পাহাড়কে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম হবে। তাই প্রতিটি রোপিত গাছকে বাঁচিয়ে রাখা এবং বড় করে তোলার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সবার।
তিনি আরও বলেন, যেসব উপকারভোগী কমিটি আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে রোপণ করা গাছগুলোর পরিচর্যা করবে এবং সফলভাবে বড় করে তুলবে, জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের বিশেষভাবে মূল্যায়ন ও পুরস্কৃত করা হবে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ সংরক্ষণে মানুষের আগ্রহ বাড়বে, অন্যদিকে পাহাড়জুড়ে একটি টেকসই সবুজায়ন আন্দোলন গড়ে উঠবে।
এই কর্মসূচিটি ‘করলিয়া’ প্রকল্পের জেলা কর্মকর্তা নবলেশ্বর দেওয়ানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। এ সময় বক্তব্য দেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ধনেশ্বর ত্রিপুরা, মাটিরাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম এবং মাটিরাঙ্গার ধনিরাম পাড়ার কার্বারী ধরনী ত্রিপুরা।
বক্তারা বলেন, পাহাড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। নির্বিচারে বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে দীর্ঘমেয়াদি সবুজায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও পরিবেশ রক্ষার এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন করলিয়া প্রকল্পের টেকনিক্যাল অফিসার পরিচিতা খীসা, উপজেলা ক্লাইমেট ফ্যাসিলিটেটর তনয়া চাকমা, নারী জলবায়ু সহনশীল কমিটির নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উপকারভোগী কমিটির সদস্য এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
আয়োজকরা জানান, খাগড়াছড়ি জেলায় করলিয়া প্রকল্পের আওতায় চলতি বছরে ২১ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষের চারা রোপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে রবিবার মাটিরাঙ্গা-রামগড় সীমান্ত সড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এক হাজারের বেশি চারা রোপণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলার বিভিন্ন এলাকায় এ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে, যাতে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, পাহাড়ের মাটি ক্ষয়রোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় একটি কার্যকর সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ে বৃক্ষরোপণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সবুজ ও জলবায়ু-সহনশীল পাহাড় গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নিয়মিত পরিচর্যা এবং দায়িত্বশীল তদারকি নিশ্চিত করা গেলে আজকের রোপণ করা চারাগুলোই একদিন খাগড়াছড়ির পাহাড়কে আরও সবুজ, সমৃদ্ধ ও প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত করে তুলবে।






















