০৬:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

শিক্ষার্থীহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: শিক্ষা ব্যবস্থার নীরব সংকেত

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০১:২৬:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
  • /

.. স্বপন বিশ্বাস
এক সময় গ্রামের একটি বিদ্যালয় ছিল পুরো জনপদের প্রাণকেন্দ্র। সকাল বেলার ঘণ্টাধ্বনি, শিশুদের কোলাহল, খেলার মাঠের উচ্ছ্বাস আর অভিভাবকদের স্বপ্নে মুখর থাকত চারপাশ।

আজ সেই একই বিদ্যালয়ের অনেকগুলো শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা। বেঞ্চ আছে, ব্ল্যাকবোর্ড আছে, শিক্ষকও আছেন-কিন্তু নেই পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী। কোথাও একটি শ্রেণিতে তিনজন, কোথাও পাঁচজন, আবার কোথাও পুরো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শিক্ষকের সংখ্যার চেয়েও কম। এই দৃশ্য কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি ধীরে ধীরে বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীহীন বা শিক্ষার্থী-সংকটে ভোগা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন জাতীয়ভাবে ভাবনার বিষয়।

শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, বাংলাদেশের জনসংখ্যার কাঠামো বদলাচ্ছে। জন্মহার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মতো শিশুর সংখ্যাও কমছে। দ্বিতীয়ত, গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্থানান্তর বেড়েছে। উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের আশায় অসংখ্য পরিবার শহরমুখী হচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো অভিভাবকদের মানসম্মত শিক্ষার প্রত্যাশা। অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কিংবা সহশিক্ষা কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা থাকায় অভিভাবকেরা সন্তানকে দূরের নামী বিদ্যালয় বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাচ্ছেন। ফলে নিজ এলাকার বিদ্যালয় ক্রমেই শিক্ষার্থী হারাচ্ছে।

কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাতেও দূরদর্শিতার অভাব ছিল। একই এলাকায় জনসংখ্যার তুলনায় বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, কিন্তু পরবর্তীতে জনসংখ্যার পরিবর্তন ও বাস্তব চাহিদা বিবেচনা করে পুনর্বিন্যাস করা হয়নি। ফলে কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে গেলেও অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যয় বহাল রয়েছে।

এই সংকটের আরেকটি সামাজিক দিকও রয়েছে। একটি বিদ্যালয় শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়; এটি একটি গ্রামের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিচয়ের অংশ। বিদ্যালয় প্রাণহীন হয়ে পড়লে এলাকার মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়। শিশুদের কোলাহল হারিয়ে গেলে একটি জনপদের ভবিষ্যৎও যেন নীরব হয়ে যায়।

অন্যদিকে, শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে শিক্ষক বা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন কমে গেছে। বরং এখন দরকার বাস্তবতাভিত্তিক পরিকল্পনা। কোথায় নতুন বিদ্যালয় প্রয়োজন, কোথায় একীভূতকরণ দরকার, কোথায় পরিবহন সুবিধা দিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি মানসম্মত বিদ্যালয়ে আনা সম্ভব-এসব বিষয় নিয়ে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোই উন্নয়নের একমাত্র সূচক নয়; মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোকে আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। বিদ্যালয়কে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে, যেখানে অভিভাবকেরা আস্থা নিয়ে সন্তানকে পাঠাতে চান। একই সঙ্গে গ্রামে কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মান উন্নত না হলে শহরমুখী মানুষের স্রোতও থামবে না, আর তার প্রভাব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পড়তেই থাকবে।

শিক্ষার্থীহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জনসংখ্যার পরিবর্তন, অর্থনীতি, আঞ্চলিক বৈষম্য, শিক্ষার মান এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি বিষয়। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ভবন নির্মাণ নয়, মানুষ গড়া। তাই কোথায় কতটি বিদ্যালয় আছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ-কতজন শিক্ষার্থী সেখানে মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে। আজ যদি আমরা শিক্ষার্থীহীন বিদ্যালয়ের কারণগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তবে আগামী দিনের শিক্ষা ব্যবস্থা আরও কার্যকর, টেকসই এবং যুগোপযোগী হবে।

খালি শ্রেণিকক্ষ আমাদের কাছে একটি সতর্কবার্তা। সেই বার্তাকে উপেক্ষা না করে, সময়োপযোগী নীতি, মানসম্মত শিক্ষা এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও প্রাণবন্ত করে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

Please Share This Post in Your Social Media

শিক্ষার্থীহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: শিক্ষা ব্যবস্থার নীরব সংকেত

আপডেট: ০১:২৬:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

.. স্বপন বিশ্বাস
এক সময় গ্রামের একটি বিদ্যালয় ছিল পুরো জনপদের প্রাণকেন্দ্র। সকাল বেলার ঘণ্টাধ্বনি, শিশুদের কোলাহল, খেলার মাঠের উচ্ছ্বাস আর অভিভাবকদের স্বপ্নে মুখর থাকত চারপাশ।

আজ সেই একই বিদ্যালয়ের অনেকগুলো শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা। বেঞ্চ আছে, ব্ল্যাকবোর্ড আছে, শিক্ষকও আছেন-কিন্তু নেই পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী। কোথাও একটি শ্রেণিতে তিনজন, কোথাও পাঁচজন, আবার কোথাও পুরো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শিক্ষকের সংখ্যার চেয়েও কম। এই দৃশ্য কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি ধীরে ধীরে বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীহীন বা শিক্ষার্থী-সংকটে ভোগা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন জাতীয়ভাবে ভাবনার বিষয়।

শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, বাংলাদেশের জনসংখ্যার কাঠামো বদলাচ্ছে। জন্মহার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মতো শিশুর সংখ্যাও কমছে। দ্বিতীয়ত, গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্থানান্তর বেড়েছে। উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের আশায় অসংখ্য পরিবার শহরমুখী হচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো অভিভাবকদের মানসম্মত শিক্ষার প্রত্যাশা। অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কিংবা সহশিক্ষা কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা থাকায় অভিভাবকেরা সন্তানকে দূরের নামী বিদ্যালয় বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাচ্ছেন। ফলে নিজ এলাকার বিদ্যালয় ক্রমেই শিক্ষার্থী হারাচ্ছে।

কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাতেও দূরদর্শিতার অভাব ছিল। একই এলাকায় জনসংখ্যার তুলনায় বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, কিন্তু পরবর্তীতে জনসংখ্যার পরিবর্তন ও বাস্তব চাহিদা বিবেচনা করে পুনর্বিন্যাস করা হয়নি। ফলে কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে গেলেও অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যয় বহাল রয়েছে।

এই সংকটের আরেকটি সামাজিক দিকও রয়েছে। একটি বিদ্যালয় শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়; এটি একটি গ্রামের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিচয়ের অংশ। বিদ্যালয় প্রাণহীন হয়ে পড়লে এলাকার মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়। শিশুদের কোলাহল হারিয়ে গেলে একটি জনপদের ভবিষ্যৎও যেন নীরব হয়ে যায়।

অন্যদিকে, শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে শিক্ষক বা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন কমে গেছে। বরং এখন দরকার বাস্তবতাভিত্তিক পরিকল্পনা। কোথায় নতুন বিদ্যালয় প্রয়োজন, কোথায় একীভূতকরণ দরকার, কোথায় পরিবহন সুবিধা দিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি মানসম্মত বিদ্যালয়ে আনা সম্ভব-এসব বিষয় নিয়ে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোই উন্নয়নের একমাত্র সূচক নয়; মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোকে আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। বিদ্যালয়কে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে, যেখানে অভিভাবকেরা আস্থা নিয়ে সন্তানকে পাঠাতে চান। একই সঙ্গে গ্রামে কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মান উন্নত না হলে শহরমুখী মানুষের স্রোতও থামবে না, আর তার প্রভাব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পড়তেই থাকবে।

শিক্ষার্থীহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জনসংখ্যার পরিবর্তন, অর্থনীতি, আঞ্চলিক বৈষম্য, শিক্ষার মান এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি বিষয়। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ভবন নির্মাণ নয়, মানুষ গড়া। তাই কোথায় কতটি বিদ্যালয় আছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ-কতজন শিক্ষার্থী সেখানে মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে। আজ যদি আমরা শিক্ষার্থীহীন বিদ্যালয়ের কারণগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তবে আগামী দিনের শিক্ষা ব্যবস্থা আরও কার্যকর, টেকসই এবং যুগোপযোগী হবে।

খালি শ্রেণিকক্ষ আমাদের কাছে একটি সতর্কবার্তা। সেই বার্তাকে উপেক্ষা না করে, সময়োপযোগী নীতি, মানসম্মত শিক্ষা এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও প্রাণবন্ত করে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।