০১:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

শেখ হাসিনার শ্বশুরবাড়ি দখলে বিএনপি-জামায়াতের নজর

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৬:১৩:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / ১৭৬

বিশেষ প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির (জাপা) ঘাঁটি রংপুর। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বাড়ি। কোনো স্বাভাবিক সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে নিরাশ করেনি রংপুর। এই জেলারই এক উপজেলা পীরগঞ্জ। পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্বশুরবাড়ি। পীরগঞ্জ নিয়ে জাতীয় সংসদের আসন রংপুর-৬। বলা যায় ভিভিআইপি আসন। এখান থেকে নির্বাচন করেছেন এরশাদ ও শেখ হাসিনা, পরে যোগ দিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। একাধারে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের আসন এটি।

বিগত সরকার বদলেও আলোচিত পীরগঞ্জ। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের জন্মভূমি এটি। কোটা সংস্কার আন্দোলনে আওয়ামী সরকার পতনের টার্নিং পয়েন্ট ছিল পুলিশের গুলিতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যু। এ ঘটনা বিপুল আলোচিত হয় দেশ ও বিদেশে।

জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বদলে যায় এ এলাকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। একসময় দাপট দেখিয়ে বেড়ানো স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা গা ঢাকা দেন। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করেছে সরকার। আর কোণঠাসা হয়ে আছে জাতীয় পার্টি। এতেই খোশমেজাজে বিএনপি ও জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল।

সভা-সমাবেশ, ঘরোয়া বৈঠক ও শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টার সাঁটানোসহ বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করেছেন বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। এর মধ্যে বিএনপির মনোনয়ন প্রার্থী তিনজন। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম, মহানগর যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম মিজু এবং জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতা আশফাকুল ইসলাম সরকার। তবে মনোনয়ন দৌড়ে অন্য দুজনের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে আছেন সাইফুল ইসলাম। সভা-সমাবেশ করছেন, তুলে ধরছেন তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা।

এই আসনে সবার আগে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। তাদের প্রার্থী মাওলানা নুরুল আমিন। তিনি বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসারীনের জেনারেল সেক্রেটারি ও রংপুর জেলা জামায়াতের শুরা সদস্য।

অন্যদিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও খেলাফতে মজলিস। অবশ্য এ আসনে এনসিপির মনোনয়ন আশা করছেন গত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেয়া তাকিয়া জাহান চৌধুরী।

জাতীয় রাজনীতিতে এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে এসব দলের জোট গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তেমনটি হলে শেষ পর্যন্ত এই জোটের প্রার্থী হিসাবে থেকে যেতে পারেন জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা নুরুল আমিন।

তবে এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ভোট খুবই কম। ১৯৯১ সালে এখানে বিএনপি পেয়েছিল মাত্র তিন শতাংশ ভোট। জামায়াতের ভোট ছিল ১১ শতাংশ। ২০০৮ সালে এই দুই দলের সম্মিলিত ভোট ছিল ১৮ শতাংশ। প্রতিটি দলের আলাদা নির্বাচনে বরাবরই এখানে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ।

এই আসনের অতীত নির্বাচনী ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। ১৯৯১ সালে জাতীয় পার্টির এরশাদ এই আসনসহ পাঁচ আসনে জয়লাভ করেন। পরে রংপুর-৬ আসন ছেড়ে দিলে এখান থেকে উপনির্বাচনে জয়ী হন তারই দলের শাহ মোয়াজ্জম হোসেন। অনেক পরে শাহ মোয়াজ্জেম জাতীয় পার্টি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন।

এই আসনে সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনার জন্ম দেন নূর মোহাম্মদ মণ্ডল। ১৯৯১ সালে তিনি ছিলেন বিএনপির প্রার্থী। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। সেবার এরশাদ জয়ী হওয়ার পর আসনটি ছেড়ে দিলে নূর মোহাম্মদ মণ্ডল জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে উপনির্বাচনে জয়ী হন। ২০০১ সালে তিনি জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পান। সেবার এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হন এলাকার পুত্রবধূ সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে নূর মোহাম্মদ মণ্ডলের কাছে শেখ হাসিনা হেরে যান, যা ছিল টক অব দ্য কান্ট্রি।

নূর মোহাম্মদ মণ্ডল অবশ্য সেখানেই চমক শেষ করেননি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে তিনি আবার বিএনপিতে ফিরে যান। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টির মহাজোটের প্রার্থী ছিলেন শেখ হাসিনা। বিএনপির নূর মোহাম্মদ মণ্ডলের বিরুদ্ধে এবার সহজেই জয় পান সাবেক প্রধানমন্ত্রী।

পরে ২০১৪ সালে বিএনপি থেকে উপজেলা নির্বাচনে জয়লাভ করেন নূর মোহাম্মদ মণ্ডল। তবে পরে আবার দল বদল করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ২০১৯ ও ২০২৪ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান হন তিনি।

২০০৮ সালের পর ২০১৪ সালেও এই আসনে নির্বাচন করেন শেখ হাসিনা। সেবার জয়লাভের পর আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ ও ২০২৪ সালের ‘ডামি প্রার্থী’ নির্বাচনেও সংসদ সদস্য হন তিনি।

জাতীয় পার্টি আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারলে রংপুর-৬ আসনের নির্বাচনী চিত্র হবে একরকম। আর আওয়ামী লীগের মতো তারাও যদি নির্বাচনের বাইরে থাকে, তাহলে আসনটি প্রথমবারের মতো নিজেদের কব্জায় নিতে লড়াই করবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।

সুত্র : ঢাকা টাইমস।

Please Share This Post in Your Social Media

শেখ হাসিনার শ্বশুরবাড়ি দখলে বিএনপি-জামায়াতের নজর

আপডেট: ০৬:১৩:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫

বিশেষ প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির (জাপা) ঘাঁটি রংপুর। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বাড়ি। কোনো স্বাভাবিক সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে নিরাশ করেনি রংপুর। এই জেলারই এক উপজেলা পীরগঞ্জ। পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্বশুরবাড়ি। পীরগঞ্জ নিয়ে জাতীয় সংসদের আসন রংপুর-৬। বলা যায় ভিভিআইপি আসন। এখান থেকে নির্বাচন করেছেন এরশাদ ও শেখ হাসিনা, পরে যোগ দিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। একাধারে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের আসন এটি।

বিগত সরকার বদলেও আলোচিত পীরগঞ্জ। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের জন্মভূমি এটি। কোটা সংস্কার আন্দোলনে আওয়ামী সরকার পতনের টার্নিং পয়েন্ট ছিল পুলিশের গুলিতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যু। এ ঘটনা বিপুল আলোচিত হয় দেশ ও বিদেশে।

জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বদলে যায় এ এলাকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। একসময় দাপট দেখিয়ে বেড়ানো স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা গা ঢাকা দেন। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করেছে সরকার। আর কোণঠাসা হয়ে আছে জাতীয় পার্টি। এতেই খোশমেজাজে বিএনপি ও জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল।

সভা-সমাবেশ, ঘরোয়া বৈঠক ও শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টার সাঁটানোসহ বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করেছেন বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। এর মধ্যে বিএনপির মনোনয়ন প্রার্থী তিনজন। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম, মহানগর যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম মিজু এবং জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতা আশফাকুল ইসলাম সরকার। তবে মনোনয়ন দৌড়ে অন্য দুজনের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে আছেন সাইফুল ইসলাম। সভা-সমাবেশ করছেন, তুলে ধরছেন তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা।

এই আসনে সবার আগে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। তাদের প্রার্থী মাওলানা নুরুল আমিন। তিনি বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসারীনের জেনারেল সেক্রেটারি ও রংপুর জেলা জামায়াতের শুরা সদস্য।

অন্যদিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও খেলাফতে মজলিস। অবশ্য এ আসনে এনসিপির মনোনয়ন আশা করছেন গত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেয়া তাকিয়া জাহান চৌধুরী।

জাতীয় রাজনীতিতে এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে এসব দলের জোট গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তেমনটি হলে শেষ পর্যন্ত এই জোটের প্রার্থী হিসাবে থেকে যেতে পারেন জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা নুরুল আমিন।

তবে এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ভোট খুবই কম। ১৯৯১ সালে এখানে বিএনপি পেয়েছিল মাত্র তিন শতাংশ ভোট। জামায়াতের ভোট ছিল ১১ শতাংশ। ২০০৮ সালে এই দুই দলের সম্মিলিত ভোট ছিল ১৮ শতাংশ। প্রতিটি দলের আলাদা নির্বাচনে বরাবরই এখানে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ।

এই আসনের অতীত নির্বাচনী ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। ১৯৯১ সালে জাতীয় পার্টির এরশাদ এই আসনসহ পাঁচ আসনে জয়লাভ করেন। পরে রংপুর-৬ আসন ছেড়ে দিলে এখান থেকে উপনির্বাচনে জয়ী হন তারই দলের শাহ মোয়াজ্জম হোসেন। অনেক পরে শাহ মোয়াজ্জেম জাতীয় পার্টি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন।

এই আসনে সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনার জন্ম দেন নূর মোহাম্মদ মণ্ডল। ১৯৯১ সালে তিনি ছিলেন বিএনপির প্রার্থী। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। সেবার এরশাদ জয়ী হওয়ার পর আসনটি ছেড়ে দিলে নূর মোহাম্মদ মণ্ডল জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে উপনির্বাচনে জয়ী হন। ২০০১ সালে তিনি জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পান। সেবার এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হন এলাকার পুত্রবধূ সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে নূর মোহাম্মদ মণ্ডলের কাছে শেখ হাসিনা হেরে যান, যা ছিল টক অব দ্য কান্ট্রি।

নূর মোহাম্মদ মণ্ডল অবশ্য সেখানেই চমক শেষ করেননি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে তিনি আবার বিএনপিতে ফিরে যান। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টির মহাজোটের প্রার্থী ছিলেন শেখ হাসিনা। বিএনপির নূর মোহাম্মদ মণ্ডলের বিরুদ্ধে এবার সহজেই জয় পান সাবেক প্রধানমন্ত্রী।

পরে ২০১৪ সালে বিএনপি থেকে উপজেলা নির্বাচনে জয়লাভ করেন নূর মোহাম্মদ মণ্ডল। তবে পরে আবার দল বদল করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ২০১৯ ও ২০২৪ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান হন তিনি।

২০০৮ সালের পর ২০১৪ সালেও এই আসনে নির্বাচন করেন শেখ হাসিনা। সেবার জয়লাভের পর আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ ও ২০২৪ সালের ‘ডামি প্রার্থী’ নির্বাচনেও সংসদ সদস্য হন তিনি।

জাতীয় পার্টি আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারলে রংপুর-৬ আসনের নির্বাচনী চিত্র হবে একরকম। আর আওয়ামী লীগের মতো তারাও যদি নির্বাচনের বাইরে থাকে, তাহলে আসনটি প্রথমবারের মতো নিজেদের কব্জায় নিতে লড়াই করবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।

সুত্র : ঢাকা টাইমস।