“বই আছে, শিক্ষক নেই!” খাগড়াছড়িতে মাতৃভাষা শিক্ষায় থমকে আছে পাহাড়ি শিশুদের স্বপ্ন
- আপডেট: ০৮:২৭:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ২

খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি ॥
মায়ের ভাষায় প্রথম অক্ষর শেখার আনন্দ,এই স্বপ্ন নিয়েই ২০১৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে শুরু হয়েছিল মাতৃভাষায় শিক্ষার নতুন অধ্যায়। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ছাপিয়েছিল বই। সরকারের উদ্যোগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সপ্তাহে দুই দিন,বুধবার ও বৃহস্পতিবার-স্ব-স্ব মাতৃভাষায় পাঠদানও চালু হয়।
কিন্তু নয় বছর পর বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। বই পৌঁছেছে, কিন্তু পৌঁছায়নি প্রশিক্ষিত শিক্ষক। আলাদা শ্রেণিকক্ষ নেই, নেই পর্যাপ্ত মাস্টার ট্রেইনার। ফলে ব্যাহত হচ্ছে মাতৃভাষায় পাঠদান, আর ধীরে ধীরে কমছে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ।
৩২ হাজার বই, কিন্তু শেখাবে কে?
খাগড়াছড়ি জেলার ৯টি উপজেলায় রয়েছে ৫৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী এসব বিদ্যালয়ে মোট ৩২ হাজার মাতৃভাষার বই বিতরণ করা হয়েছে।
প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে দেওয়া হয়েছে ‘আমার বই’ ও ‘এসো লিখতে শিখি’। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মাতৃভাষায় রচিত বাংলা, গণিত ও ইংরেজি বই। তৃতীয় শ্রেণিতে রয়েছে মাতৃভাষায় রচিত বাংলা বই।
তবে যাঁরা বই উন্নয়ন করেছেন তাঁরা মাতৃভাষায় দক্ষ হলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই ভাষাগুলোতে প্রশিক্ষিত নন। ফলে বই থাকলেও কার্যকর পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না।
শ্রেণিকক্ষ সংকটেও বাধা:
খাগড়াছড়ি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিলু আরা বেগম বলেন, “আমার স্কুলে ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমাসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী রয়েছে। মাতৃভাষায় পাঠদান শুরু হয়েছে-এটা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু আলাদা রুম ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক না থাকায় আমরা বিপাকে পড়ছি। তিন সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা আলাদা শিক্ষক ও কক্ষ প্রয়োজন।”
অনেক বিদ্যালয়ে একই কক্ষে একাধিক শ্রেণির পাঠদান চলছে। সেখানে আবার মাতৃভাষাভিত্তিক পৃথক ক্লাস নেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
আগ্রহ কমছে শিক্ষার্থীদের:
শিক্ষকদের অভাবের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো—মাতৃভাষা বিষয়ে পরীক্ষায় মূল্যায়নের সুযোগ নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই বিষয়ে আগ্রহ তেমন তৈরি হচ্ছে না।
অভিভাবকরাও বলছেন, পরীক্ষায় গুরুত্ব না থাকলে শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব দেয় না। এতে মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের মূল লক্ষ্যই ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষা বিভাগের স্বীকারোক্তি:
খাগড়াছড়ি জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম বলেন,“বই দেওয়া হয়েছে শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী। কিন্তু শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। মাস্টার ট্রেইনার তৈরি করে অন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা বিষয়টি জেলা পরিষদকে জানিয়েছি, কারণ প্রাথমিক শিক্ষা জেলা পরিষদের হস্তান্তরিত বিভাগ।”
জেলা পরিষদের আশ্বাস:
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন,“মাতৃভাষা শিক্ষা আমাদের অগ্রাধিকারের বিষয়। যেখানে শিক্ষক নেই সেখানে নিয়োগের চেষ্টা চলছে। প্রশিক্ষণ প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।”
দীর্ঘদিনের দাবি, অপূর্ণ বাস্তবতা:
পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বহু ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বসবাস। এর মধ্যে আটটি জাতির নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। দীর্ঘদিনের দাবির পর ২০১৭ সালে মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করা এবং তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ করা। কিন্তু শিক্ষক সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতায় সেই মহৎ উদ্যোগ আজ বাস্তবায়নের পথে হোঁচট খাচ্ছে।
এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ:
বিশেষজ্ঞদের মতে,জরুরি ভিত্তিতে মাতৃভাষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ মাস্টার ট্রেইনার তৈরি করে পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণ আলাদা শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিতকরণ পরীক্ষায় মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু স্থানীয় সম্প্রদায়ের ভাষাবিদদের সম্পৃক্তকরণ এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে মাতৃভাষা শিক্ষা প্রকৃত অর্থেই ফলপ্রসূ হবে।
মায়ের ভাষা শুধু শিক্ষার মাধ্যম নয়-এটি একটি জাতিসত্তার আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের প্রতীক। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি শিশুদের হাতে বই পৌঁছেছে, এখন প্রয়োজন সেই বইয়ের ভাষা বুঝিয়ে দেওয়ার মতো দক্ষ শিক্ষক।
মাতৃভাষা শিক্ষার এই উদ্যোগ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হয়, তবে হারিয়ে যেতে পারে একটি প্রজন্মের ভাষাগত আত্মপরিচয়ের স্বপ্ন।




















