বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে রমজানের রোজা: শরীর ও মনের জন্য বিশেষ উপকারিতা
- আপডেট: ১০:২৭:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ২০

মাওলানা মোঃ আবুল হাসান : পবিত্র মাহে রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে রোজা রাখা মুসলমানদের উপর ফরজ। পৃথিবীজুড়ে প্রায় ১৬০ কোটি মুসলমান রোজার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার কাছে নিজেদের নিবেদন করেন। এ আত্মনিবেদনের পেছনে কোনো ইহলৌকিক স্বার্থ থাকে না; শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টিই চাওয়া হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য, কিন্তু রোজা কেবল আমারই জন্য, আমিই নিজেই এর প্রতিদান দেবো” (বোখারি)। নবীজি (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, আল্লাহ তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেন” (বুখারি ও মুসলিম)। এছাড়া, রোজাদারদের জন্য জান্নাতে বিশেষ একটি দরজা—‘রাইয়ান’—নির্ধারিত রয়েছে, যেদরজা কেবল রোজাদারদের জন্য খোলা থাকবে।
রমজানে রোজার গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় নয়; এটি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যেও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “রোজা রাখো, তোমরা সুস্থ থাকবে” (মুসনাদে আহমাদ)। আধুনিক গবেষণা বলছে, রোজা মানবদেহের খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমিয়ে দেয়, এবং ভালো কোলেস্টেরল (এইচডিএল) বৃদ্ধি করে, যা হার্টকে কার্ডিওভাসকুলার রোগ থেকে রক্ষা করে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোজার বৈজ্ঞানিক উপকারিতা
হৃদরোগ ও ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণ: রোজা হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ও প্রদাহ কমাতে সহায়ক।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: রোজা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করে। এটি কোষের স্বাস্থ্য রক্ষা করে এবং নানা রোগের ঝুঁকি কমায়।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ও মেটাবলিজম উন্নয়ন: রমজানে ত্রিশ দিনের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার গ্রহণ ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং-এর মতো কাজ করে। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে, কোলেস্টেরল কমে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।
মস্তিষ্কের বয়স ও স্মৃতিশক্তি রক্ষা: ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিং-এর গবেষক ড. মার্ক ম্যাটসন ও সহকর্মীরা বলছেন, নিয়মিত ফাস্টিং ব্রেনের এজিং প্রক্রিয়া দেরি করে, স্মৃতিশক্তি ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতা রক্ষা করে, ফলে আলঝেইমারস, ডিমেনশিয়া, হান্টিংটন ও পারকিনসনের মতো রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
রক্ত পরিশোধন: রোজা শরীরের রক্ত থেকে ক্ষতিকর পদার্থ দূর করে। এটি শরীরকে বিশুদ্ধ রাখে এবং টক্সিন কমায়।
কোষ পরিশোধন: রোজা কোষের ভিতরের মৃত বা ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো সরিয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়া ১২-১৬ ঘণ্টার ফাস্টিংয়ে কার্যকরভাবে কাজ করে। অটোফেজি বার্ধক্য, ক্যানসার ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমায়।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ: টাইপ টু ডায়াবেটিসের প্রধান কারণ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। সপ্তাহে তিন দিন ২৪ ঘণ্টার ফাস্টিং টাইপ টু ডায়াবেটিস রিভার্স করতে সহায়ক। একই সঙ্গে স্থূলতাও কমানো সম্ভব।
দীর্ঘায়ু ও সুস্থ জীবন: মাঝে মাঝে রোজা রাখা আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করে, শরীরকে দীর্ঘজীবী ও সুস্থ রাখে।
বিশেষ সতর্কতা
অসুস্থ বা চিকিৎসাধীন ব্যক্তিরা: যারা হাইপারটেনশন, অ্যাজমা, পেপটিক আলসার বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখছেন, তারা সঠিক চিকিৎসা ও পরামর্শ অনুসরণ করে সহজেই রোজা রাখতে পারেন।
সুষম খাবার ও পর্যাপ্ত পানীয় গ্রহণ: রোজার সময় সুষম ও পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করলে শরীর সুস্থ থাকে।
রমজান মাসে রোজা রাখা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমই নয়, বরং এটি শারীরিক, মানসিক ও প্রাকৃতিক স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান রোজাকে স্বাস্থ্যের জন্য এক শক্তিশালী উপায় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সুতরাং, স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী রোজা রাখা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য উপকারী।


























