পঞ্চগড়ের ডিসি হলেন যশোরের সাবেক জনবান্ধব এডিসি কাজী সায়েমুজ্জামান
- আপডেট: ০৫:২৩:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ নভেম্বর ২০২৫
- / ১৬০

নিজস্ব প্রতিবেদক: একসময় মাঠ চষে বেড়ানো এক তুখোড় সাংবাদিক, আজ তিনি জেলার প্রশাসনের সর্বোচ্চ দায়িত্বে। সাহস, সততা আর কর্মনিষ্ঠার মিশেলে গড়া এক বিরল কর্মজীবনের নাম— কাজী মো. সায়েমুজ্জামান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান আর সেবাধর্মী মানসিকতা তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। গেল রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তাকে পঞ্চগড় জেলার জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর দ্বিতীয় দফায় বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসনে যোগ দেন তিনি। এর আগে প্রায় এক দশক ধরে সাংবাদিকতা করেছেন দেশের শীর্ষ দৈনিকগুলোতে।
দৈনিক মানবজমিনে কর্মজীবন শুরু করে পরে ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এ সিনিয়র প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেন তিনি। মাঠ সাংবাদিকতার সময় একের পর এক আলোচিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করে ঢাকার সংবাদপাড়ায় পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন সায়েমুজ্জামান।
সাংবাদিকতা ছাড়ার পর প্রশাসনে যোগ দিয়েও বদলায়নি তার সাহসী চরিত্র। পটুয়াখালীর গলাচিপায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রভাবশালী মহলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বালু মহাল বন্ধসহ দুর্নীতিবিরোধী নানা পদক্ষেপ নেন। সেই সাহসী অবস্থানেই তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন।
পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আরও বড় আলোচনার জন্ম দেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে অভিযান চালিয়ে কর্মকর্তাদের গোপন সম্পদের তথ্য প্রকাশ্যে এনে আলোড়ন তোলেন। এই অভিযানের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে লুকানো বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও সোনা।
তবে এই পদক্ষেপই হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য ‘কাল’। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ পাঠানো হয়। পরে উচ্চমহলের চাপে তাকে দুদক থেকে সরিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে ব্যাপক জনসমর্থন গড়ে ওঠে।
বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা কাজী সায়েমুজ্জামান ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার কিউং হি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ট্রেড পলিসি’-তে মাস্টার্স করা কয়েকজন তরুণ প্রশাসকের একজন। জন্ম চট্টগ্রামের দামপাড়ায়, পূর্বপুরুষ বাউফলের ঐতিহ্যবাহী জমিদার কাজী পরিবার।
এর আগে যশোরে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মামলাজট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে ব্যাপক প্রশংসা পান তিনি। আদালতের মামলার নিষ্পত্তির হারে নতুন রেকর্ড গড়েন। এছাড়া তিনি জাতিসংঘের ইউএনডিপি, এটুআই প্রোগ্রামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাহিত্যপ্রেমী এই প্রশাসক কবিতার ক্ষেত্রেও সমান দক্ষ। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তোমাকে দেখার পর’ একুশে বইমেলায় প্রকাশের পর পাঠকমহলে বিপুল সাড়া ফেলে। দুই বছরে বইটির দুটি সংস্করণ শেষ হয়ে যায়। বাংলা ছাড়াও ইংরেজি, আরবি, উর্দু ও হিন্দি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন তিনি।
দৈনিক মানবজমিনের নগর সম্পাদক ও প্রধান প্রতিবেদক লুৎফর রহমান তার সহকর্মী ও রুমমেট ছিলেন। তিনি বলেন, “সায়েমুজ্জামান যেখানেই দায়িত্ব পেয়েছেন, সেখানেই কিছু না কিছু নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি আপাদমস্তক সৎ, নির্লোভ এবং দেশপ্রেমে উজ্জীবিত একজন কর্মকর্তা।”
নিজ প্রতিক্রিয়ায় কাজী সায়েমুজ্জামান বলেন, “সাংবাদিক কিংবা সরকারি কর্মকর্তা— যেখানেই থেকেছি, দায়িত্বকে দেখেছি দেশ ও মানুষের সেবার অংশ হিসেবে। নতুন দায়িত্বটি চ্যালেঞ্জিং হলেও আমি সবসময় চ্যালেঞ্জকে উপভোগ করি। ইনশাআল্লাহ, পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক হিসেবে আমানতদারিত্বের জায়গা থেকে সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করব।”



























