পাহাড়ের খামারে কোরবানীর প্রস্তুতি তুঙ্গে:খাগড়াছড়ির ২৮ বাজারে ১৮ হাজারের অধিক গরু মজুদ
- আপডেট: ১০:৫৯:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
- / ৬

খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি॥
কোরবানী ঈদকে সামনে রেখে খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদজুড়ে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারিরা। জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা, গ্রাম ও বাজারকেন্দ্রিক খামারগুলোতে চলছে গরুর পরিচর্যা, খাবার সরবরাহ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং বাজারজাতকরণের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর জেলার ২৮টি পশুর বাজারে ১৮ হাজারের অধিক কোরবানীর গরু মজুদ রয়েছে। ফলে জেলায় কোরবানীর পশুর কোনো সংকট হবে না বলেই আশাবাদ সংশ্লিষ্টদের।
জেলা সদরের উত্তর গঞ্জপাড়া, ইসলামপুরসহ বিভিন্ন এলাকা,মাটিরাঙ্গা, দীঘিনালা, পানছড়ি ও মহালছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য পারিবারিক ও বাণিজ্যিক খামার। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত খামারিদের ব্যস্ততা এখন শুধুই গরুকে ঘিরে। কেউ ঘাস কাটছেন, কেউ গোসল করাচ্ছেন, কেউ আবার পশুর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করছেন। পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা এসব গরুর প্রতি স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি সমতলের ব্যবসায়ীদেরও আগ্রহ বাড়ছে।
খামারিরা জানান, পাহাড়ের গরুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও অর্গানিক পদ্ধতিতে লালন-পালন। এখানে গরুকে মোটাতাজাকরণের জন্য কোনো ধরনের ক্ষতিকর ওষুধ, স্টেরয়েড কিংবা ফরমালিন ব্যবহার করা হয় না। পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঘাস, লতাপাতা, খড়, ভুসি ও দেশীয় খাদ্যের মাধ্যমেই গরুগুলো বড় করা হয়। ফলে এসব গরুর মাংস তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুস্বাদু বলে মনে করেন ক্রেতারা।
জেলা সদরের উত্তর গঞ্জপাড়ার গরু খামারি মো. সুচন বলেন,“আমরা বছরজুড়ে কষ্ট করে গরু লালন-পালন করি। পাহাড়ের গরু সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে বড় হয়। কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু খাবার, ওষুধ ও শ্রমিক খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সেই তুলনায় লাভের অংশ খুব বেশি থাকে না। তারপরও আমরা আশা করছি এ বছর ভালো দাম পাবো।”
ইসলামপুর এলাকার খামারি আব্দুর রহমান জানান,
“সমতলের গরুর চেয়ে পাহাড়ের গরুর চাহিদা এখন অনেক বেড়েছে। মানুষ এখন স্বাস্থ্য সচেতন। তাই অর্গানিকভাবে লালন-পালন করা গরুর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।”
খামার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ি অঞ্চলে গরু পালনে বাড়তি পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়। দুর্গম এলাকা থেকে খাদ্য সংগ্রহ, পরিবহন ব্যয় এবং পশুচিকিৎসা সুবিধা সীমিত থাকায় উৎপাদন খরচও বেশি পড়ে। তবুও স্থানীয় খামারিরা নিজেদের ঐতিহ্য ও স্বনির্ভরতার জায়গা থেকে পশুপালন চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেক পরিবার এখন গরু পালনকে বিকল্প আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছে।
খাগড়াছড়ির বিভিন্ন খামার ঘুরে দেখা যায়, কোরবানীর বাজার ধরতে ছোট, মাঝারি ও বড় আকৃতির গরু প্রস্তুত করা হয়েছে। কিছু খামারে দেশীয় জাতের পাশাপাশি উন্নত জাতের সংকর গরুও রয়েছে। খামারিরা গরুর স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখছেন এবং পশুচিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী পরিচর্যা করছেন।
এদিকে কোরবানীর পশুর বাজারকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও প্রশাসন।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডা. মো. আলী আজম বলেন,
“খাগড়াছড়িতে ১৮ হাজারের অধিক কোরবানীর গরু মজুদ রয়েছে। কোরবানীর পশুর কোনো সংকটের সম্ভাবনা নেই। আমাদের খামারিদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। খামারি সচেতনতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান,“জেলায় মোট ২৮টি পশুর বাজার রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি বাজারে মেডিকেল টিম কাজ করবে। পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অসুস্থ পশু শনাক্ত এবং ক্রেতাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হবে। এছাড়া জাল নোট শনাক্তের জন্য ব্যাংকের প্রতিনিধিরা কাজ করবেন। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে পশু পরিবহন, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ নজরদারির কথাও জানানো হয়েছে। বাজারে যাতে কোনো ধরনের প্রতারণা, জাল নোট বা অসুস্থ পশু বিক্রি না হয়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
খাগড়াছড়ির পাহাড়ি খামারগুলো এখন যেন ঈদ অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে প্রাকৃতিক উপায়ে পশু লালন-পালনের যে সংস্কৃতি পাহাড়ে গড়ে উঠেছে, তা এখন ক্রেতাদের আস্থার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কোরবানীর ঈদকে সামনে রেখে পাহাড়ি গরুর বাজার ঘিরে আশাবাদী খামারিরা।





















