১২:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

বাঘারপাড়ায় ভিজিএফ কর্মসূচির চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১১:০৫:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
  • /

সাঈদ ইবনে হানিফ : বাঘারপাড়ায় ভিজিএফ কর্মসূচির চাল বিতরণ নিয়ে চলছে রাজনীতি। বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে যেভাবে এসব হতদরিদ্রদের সহযোগিতা করা নিয়ে রাজনীতির উদ্দেশ্য হাসিল করা হত আবাও সেই একই রাজনীতি চলছে উপকার ভোগীদের সহযোগিতা করার নামে।

খোজ নিয়ে দেখা গেছে, সারা বছর জুড়ে যারা এই কর্মসূচীর উপকার ভোগীর তালিকায় রয়েছে আবার তারাই ঈদের ১০ কেজি চালের তালিকায় রয়েছে। সাধারণ কোন ব্যাক্তির নাম নতুন এই উপকার ভোগীর তালিকায় পাওয়া যায়নি।

বাঘারপাড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সূত্রে জানাগেছে, পবিত্র ঈদ উল ফিতর ২০২৬ উদ্যাপন উপলক্ষে ভিজিএফ কর্মসূচীর আওতায় অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মধ্যে ১০ কেজি হারে চাল বিনামূল্যে বিতরণের জন্য নয়টি ইউনিয়নে মোট ১৬ হাজার ৩ শত ৬৮ জনের নাম তালিকাবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে জহুরপুর ইউনিয়নে পনেরশত ত্রিশটি, বন্দবীলায় তেইশশত পয়তাল্লিশটি, রায়পুরে দুইহাজার আশি, নারিকেল বাড়িয়ায় উনিশশত আশি, ধলগ্রামে চৌদ্দশত পঞ্চাশ, দোহাকুলায় আঠারশত তিরানব্বই, দরাজহাটে চৌদ্দশত পঞ্চাশ, বাসুয়াড়ীতে আঠারশত দশ ও জামদিয়ায় আঠারশত ত্রিশ জনের নামে তালিকা ভুক্ত করা হয়েছে।

বাঘারপাড়া পৌরসভায় নয়টি ওয়ার্ডে মোট তালিকা হয়েছে পনেরশত উনপঞ্চাশটি। পৌরসভার জনসংখ্যা অনুয়ায়ি কার্ডের পরিমাণ বেশি হওয়ায় রাজনৈতিক নেতাদের এখানে তেমন কোন প্রতিযোগিতা নেই।

বাসুয়াড়ি ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান সরদার জানিয়েছেন, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতিকে পাঁচশত পঞ্চাশ, জামায়াতের প্রতিনিধিকে পাঁচশত চল্লিশ ও এনসিপি’র নেতাকে দেওয়া হয়েছে একশত পঞ্চাশটি কার্ড। পরিষদের বারজন সদস্যের প্রতিজনকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ত্রিশটি করে। এ নিয়ে ইউপি সদস্যদের নানা ক্ষোভ রয়েছে। তার পরেও করার কিছুই নেই। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে বিএনপি। আর স্থানীয় সংসদ সদস্য হয়েছেন জামায়াতের। এনসিপি নেতাদের দাপটে আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছি। ফলে কোন পক্ষের সাথেই প্রতিবাদ করার উপায় নেই।

তবে সরেজমিনে এ ইউনিয়নের আয়াপুর গ্রামের শিকারি পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, হত দরিদ্র ইকবাল সরদার, আব্দুল লতিফ, রিপন বিশ্বাস ও অন্ত বিশ্বাস দিন মজুরের কাজ করেন। তাদের কারোর নাম তালিকায় নেই। ৫,৬, ৭,নং ওয়ার্ডের অনেকে আক্ষেপ করে বলেন, এসব সহযোগীতা যারা নিয়মিত পায় তারাই পাচ্ছে, অনেকেই আছে যারা পাওয়ার উপযোগী কিন্তু পাচ্ছে না। ইকবাল সরদার জানিয়েছেন, তিনি দীর্ঘদিন শয্যশায়ী। সংসার চালাতে তার স্ত্রীর অন্যাত্র হাত পাতা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। অথচ ঈদ উপলক্ষে সরকারের দেয়া ১০ কেজি চাল থেকে সে বঞ্চিত হয়েছেন।

নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবলু কুমার সাহা জানিয়েছেন, তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতিকে চারশত, সাধারণ সম্পাদককে চারশত, জামায়াত প্রতিনিধিকে পাঁচশত ও এনসিপি নেতাকে দিয়েছেন দুইশত কার্ড। এর পরেও বিএনপির একপক্ষ কার্ড ফেরত দিয়েছে। তারা দাবি করেছে এক হাজার কার্ডের। এতে রাজি না হওয়ায় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নাজমুল লস্কর গত বুধবার উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট লিখিতভাবে অনিয়মের অভিযোগ করেছেন।

বৃহস্পতিবারে চাল বিতরণের কথা ছিলো। এ দিন ভোর সকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোবাইল বার্তায় আমাকে চাল বিতরণ বন্ধ রাখতে বলেন। ফলে এদিন আর চাল বিতরণ করা হয়নি। কয়েকশত মানুষ এদিন চাল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফেরত গিয়েছেন। বাবলু সাহা এ বিষয়ে আরো বলেন, শুনেছি উপজেলা নির্বাহী অফিসার বৃহস্পতিবার বেলা বারটার মধ্যে অনিয়মের তথ্য চেয়ে নাজমুল লস্করকে চিঠি দিয়েছে। তালিকা না থাকায় তিনি তা দিতে পারেননি। পরে তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট থেকে তালিকা নিয়েছেন। তালিকা নিয়ে বিএনপির এ পক্ষ মাঠ পর্যায়ে অনিয়ম বের করার চেষ্টা করছেন। যদি তারা অনিয়ম খুঁজে পান সেগুলোর সমাধানের পর হয়তো আগামী সোমবার চাল বিতরণ হতে পারে।

এ বিষয়ে নাজমুল লস্কর জানিয়েছেন, কয়েকটি ওয়ার্ড যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ আওয়ামীলীগের ভোটার ও বিত্তশালী। সরকারি চাকরি করে এমন লোকেরও নাম রয়েছে। এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাবলু কুমার সাহা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি। ফলে তালিকায় তার দলীয় লোকজনের নাম বেশি। গত কয়েক বছর ধরে চেয়ারম্যানের লোকজনই সুবিধা ভোগ করছেন। বিগত দিনে যারা সুবিধা পেয়েছে এখনও তারাই সুবিধা পাচ্ছেন। দ্রত তালিকার অনিয়ম চিহ্নিত করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানানো হবে।

জামদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান তিব্বত জানিয়েছেন, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে চারশত ও জামায়াত প্রতিনিধিকে তিনশত পচিশটি কার্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি কার্ড অংশহারে সদস্যদের মধ্যে বন্টন করা হয়েছে। ধলগ্রাম ইউনিয়নের একটি সূত্র জানিয়েছে, বরভাগ গ্রামের তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম রয়েছে। তালিকার বেশিরভাগ লোকই বিত্তশালী। সরকারি চাকরিজীবি, স্কুল ও মাদ্রাসা শিক্ষকের নাম রয়েছে তালিকায়। বরভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্কুল শিক্ষক ফজলুল হক বুলু এলাকায় বিত্তশালী হিসাবে পরিচিত। তার কলেজ পড়–য়া ছেলে হিমেলের নাম রয়েছে তালিকায়। ফজলুল হক বুলুর আরেক ভাই বজলুর রহমান। তিনি ভিটাবল্যা আলীম মাদ্রাসার শিক্ষক। তার ছেলের নামও রয়েছে তালিকায়। আরেক ভাই মৃত মাজেদ মাষ্টারের দুই ছেলের একজন পুলিশের এসআই ও অপরজন উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা। অথচ তাদের মায়ের নাম রয়েছে তালিকায়। ফজলুল হক বুলুর আরেক ভাইয়ের নাম আনছার মোল্যা। তার দুই ছেলে আছর আলী ও আব্দুল লতিফ বিদেশ থাকেন। তাদের দুইজনেরই নাম রয়েছে তালিকায়। দোহাকুলা ইউপি চেয়ারম্যান আবু মোতালেব তরফদার জানিয়েছেন, তিনি কোন ভাগাভাগি করেননি।

গত ঈদে যে তালিকা করা হয়েছিলো, সেই তালিকা অনুযায়ি এবারও বিতরণ হবে। কারণ হিসাবে বলেন, দরিদ্র মানুষ যেমন প্রতি বছর পরিবর্তন হয়না। তেমনি বিত্তশালীরাও এক বছরের ব্যবধানে দরিদ্র হয়না। কেউ মারা গেলে সেই নামটা পরিবর্তন করা হয়। জামায়াত, বিএনপির প্রশ্নে তিনি বলেন, গত তালিকাও ঐ দুই দলের সমন্বয়ে করা হয়েছিলো।

বন্দবীলা ইউপি চেয়ারম্যান সব্দুল হোসেন খাঁন জানিয়েছেন, তিনি কোন রাজনৈতিক দলের নেতাদের কার্ড দেননি। রাজনৈতিক নেতাদের তালিকা দেখতে বলেছেন। তালিকায় কোন অনিয়ম থাকলে তাদের দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য ফোন দিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে এক হাজার কার্ডের দাবি করেছিলেন। তিনি তাতে সম্মত হননি।
দরাজহাট ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন জানান, তিনি ওমরা পালনে সৌদি আরবে ছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে ভাগাভাগি হয়েছে। বিএনপি সাড়ে চারশত ও জামায়াত সাড়ে তিনশত কার্ড নিয়েছে। ভাগাভাগির সময় পরিষদের সচিবের সাথে অসৌজন্য আচারণও করেছেন তারা।

পৌরসভার আট নং ওয়ার্ডে কামারের কাজ করেন মিঠু বিশ্বাস। তিনি চাল পাননি। অশোক বিশ্বাস কাজ করেন দিন মজুরের। অমল ও রাজ কুমার জীবিকা নিবৃাহ করেন মাছ ধরে। তার কেউই চাল পাননি। অথচ এ ওয়ার্ডের কলেজ শিক্ষক অনুপ রায়ের পরিবারের নাম রয়েছে ভিজিএফ এর তালিকায়।
বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার ভুপালী সরকার জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার রায়পুর, বাসুয়াড়ি, জামদিয়া ও পৌর সভায় ভিজিএফ কর্মসূচীর চাল বিতরণ করা হয়েছে। আগামী রোববার বাকি ইউনিয়ন গুলোতে বিতরণ হবে। তবে নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নে একটি অভিযোগের ভিত্তিতে বিতরণ বন্ধ রয়েছে। এ ইউনিয়নে বৃহস্পতিবার বিতরণের দিন ধার্য ছিলো। বৃহস্পতিবার পৌরসভাসহ বাকি তিন ইউনিয়নে চাল বিতরণ পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে বাসুয়াড়ি ইউনিয়নে গিয়ে দেখি দশ কেজির বদলে নয় কেজি করে চাল দিচ্ছে। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে বেশি বেশি দেওয়া শুরু করে। একজনের চাল ওজন করে দেখি দশ কেজি তিনশ গ্রাম হয়েছে। পৌরসভায় ৫০ কেজি চালের একটি বস্তা ওজন করে দেখা যায় তাতে এক কেজি কম। আর একটি বস্তা ওজন করে তাতে পাওয়া যায় ৪৬ কেজি। এ কারণে ১০ কেজি চাল বিতরণ সম্ভব হয়না। রায়পুরে বেশ কিছু অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। তাৎক্ষণিক কিছু সমাধান দেওয়া হয়।

তালিকায় অনিয়মের প্রশ্নে ভুপালী সরকার বলেন, প্রায় আঠারো হাজার নামের তালিকা যাচাই-বাছাই করা উপজেলা প্রশাসনের জন্য দুরুহ কাজ। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তার সমাধান দেওয়া সম্ভব। নারিকেলবাড়িয়ার প্রশ্নে বলেন, সঠিক সময়ে চাল বিতরণ করতে না পারলে সে দায় কারো না কারোর উপর বর্তাবে। তবে আশা করি সোমবার বিতরণ করা যেতে পারে।#

Please Share This Post in Your Social Media

বাঘারপাড়ায় ভিজিএফ কর্মসূচির চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ

আপডেট: ১১:০৫:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬

সাঈদ ইবনে হানিফ : বাঘারপাড়ায় ভিজিএফ কর্মসূচির চাল বিতরণ নিয়ে চলছে রাজনীতি। বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে যেভাবে এসব হতদরিদ্রদের সহযোগিতা করা নিয়ে রাজনীতির উদ্দেশ্য হাসিল করা হত আবাও সেই একই রাজনীতি চলছে উপকার ভোগীদের সহযোগিতা করার নামে।

খোজ নিয়ে দেখা গেছে, সারা বছর জুড়ে যারা এই কর্মসূচীর উপকার ভোগীর তালিকায় রয়েছে আবার তারাই ঈদের ১০ কেজি চালের তালিকায় রয়েছে। সাধারণ কোন ব্যাক্তির নাম নতুন এই উপকার ভোগীর তালিকায় পাওয়া যায়নি।

বাঘারপাড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সূত্রে জানাগেছে, পবিত্র ঈদ উল ফিতর ২০২৬ উদ্যাপন উপলক্ষে ভিজিএফ কর্মসূচীর আওতায় অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মধ্যে ১০ কেজি হারে চাল বিনামূল্যে বিতরণের জন্য নয়টি ইউনিয়নে মোট ১৬ হাজার ৩ শত ৬৮ জনের নাম তালিকাবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে জহুরপুর ইউনিয়নে পনেরশত ত্রিশটি, বন্দবীলায় তেইশশত পয়তাল্লিশটি, রায়পুরে দুইহাজার আশি, নারিকেল বাড়িয়ায় উনিশশত আশি, ধলগ্রামে চৌদ্দশত পঞ্চাশ, দোহাকুলায় আঠারশত তিরানব্বই, দরাজহাটে চৌদ্দশত পঞ্চাশ, বাসুয়াড়ীতে আঠারশত দশ ও জামদিয়ায় আঠারশত ত্রিশ জনের নামে তালিকা ভুক্ত করা হয়েছে।

বাঘারপাড়া পৌরসভায় নয়টি ওয়ার্ডে মোট তালিকা হয়েছে পনেরশত উনপঞ্চাশটি। পৌরসভার জনসংখ্যা অনুয়ায়ি কার্ডের পরিমাণ বেশি হওয়ায় রাজনৈতিক নেতাদের এখানে তেমন কোন প্রতিযোগিতা নেই।

বাসুয়াড়ি ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান সরদার জানিয়েছেন, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতিকে পাঁচশত পঞ্চাশ, জামায়াতের প্রতিনিধিকে পাঁচশত চল্লিশ ও এনসিপি’র নেতাকে দেওয়া হয়েছে একশত পঞ্চাশটি কার্ড। পরিষদের বারজন সদস্যের প্রতিজনকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ত্রিশটি করে। এ নিয়ে ইউপি সদস্যদের নানা ক্ষোভ রয়েছে। তার পরেও করার কিছুই নেই। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে বিএনপি। আর স্থানীয় সংসদ সদস্য হয়েছেন জামায়াতের। এনসিপি নেতাদের দাপটে আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছি। ফলে কোন পক্ষের সাথেই প্রতিবাদ করার উপায় নেই।

তবে সরেজমিনে এ ইউনিয়নের আয়াপুর গ্রামের শিকারি পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, হত দরিদ্র ইকবাল সরদার, আব্দুল লতিফ, রিপন বিশ্বাস ও অন্ত বিশ্বাস দিন মজুরের কাজ করেন। তাদের কারোর নাম তালিকায় নেই। ৫,৬, ৭,নং ওয়ার্ডের অনেকে আক্ষেপ করে বলেন, এসব সহযোগীতা যারা নিয়মিত পায় তারাই পাচ্ছে, অনেকেই আছে যারা পাওয়ার উপযোগী কিন্তু পাচ্ছে না। ইকবাল সরদার জানিয়েছেন, তিনি দীর্ঘদিন শয্যশায়ী। সংসার চালাতে তার স্ত্রীর অন্যাত্র হাত পাতা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। অথচ ঈদ উপলক্ষে সরকারের দেয়া ১০ কেজি চাল থেকে সে বঞ্চিত হয়েছেন।

নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবলু কুমার সাহা জানিয়েছেন, তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতিকে চারশত, সাধারণ সম্পাদককে চারশত, জামায়াত প্রতিনিধিকে পাঁচশত ও এনসিপি নেতাকে দিয়েছেন দুইশত কার্ড। এর পরেও বিএনপির একপক্ষ কার্ড ফেরত দিয়েছে। তারা দাবি করেছে এক হাজার কার্ডের। এতে রাজি না হওয়ায় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নাজমুল লস্কর গত বুধবার উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট লিখিতভাবে অনিয়মের অভিযোগ করেছেন।

বৃহস্পতিবারে চাল বিতরণের কথা ছিলো। এ দিন ভোর সকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোবাইল বার্তায় আমাকে চাল বিতরণ বন্ধ রাখতে বলেন। ফলে এদিন আর চাল বিতরণ করা হয়নি। কয়েকশত মানুষ এদিন চাল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফেরত গিয়েছেন। বাবলু সাহা এ বিষয়ে আরো বলেন, শুনেছি উপজেলা নির্বাহী অফিসার বৃহস্পতিবার বেলা বারটার মধ্যে অনিয়মের তথ্য চেয়ে নাজমুল লস্করকে চিঠি দিয়েছে। তালিকা না থাকায় তিনি তা দিতে পারেননি। পরে তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট থেকে তালিকা নিয়েছেন। তালিকা নিয়ে বিএনপির এ পক্ষ মাঠ পর্যায়ে অনিয়ম বের করার চেষ্টা করছেন। যদি তারা অনিয়ম খুঁজে পান সেগুলোর সমাধানের পর হয়তো আগামী সোমবার চাল বিতরণ হতে পারে।

এ বিষয়ে নাজমুল লস্কর জানিয়েছেন, কয়েকটি ওয়ার্ড যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ আওয়ামীলীগের ভোটার ও বিত্তশালী। সরকারি চাকরি করে এমন লোকেরও নাম রয়েছে। এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাবলু কুমার সাহা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি। ফলে তালিকায় তার দলীয় লোকজনের নাম বেশি। গত কয়েক বছর ধরে চেয়ারম্যানের লোকজনই সুবিধা ভোগ করছেন। বিগত দিনে যারা সুবিধা পেয়েছে এখনও তারাই সুবিধা পাচ্ছেন। দ্রত তালিকার অনিয়ম চিহ্নিত করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানানো হবে।

জামদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান তিব্বত জানিয়েছেন, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে চারশত ও জামায়াত প্রতিনিধিকে তিনশত পচিশটি কার্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি কার্ড অংশহারে সদস্যদের মধ্যে বন্টন করা হয়েছে। ধলগ্রাম ইউনিয়নের একটি সূত্র জানিয়েছে, বরভাগ গ্রামের তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম রয়েছে। তালিকার বেশিরভাগ লোকই বিত্তশালী। সরকারি চাকরিজীবি, স্কুল ও মাদ্রাসা শিক্ষকের নাম রয়েছে তালিকায়। বরভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্কুল শিক্ষক ফজলুল হক বুলু এলাকায় বিত্তশালী হিসাবে পরিচিত। তার কলেজ পড়–য়া ছেলে হিমেলের নাম রয়েছে তালিকায়। ফজলুল হক বুলুর আরেক ভাই বজলুর রহমান। তিনি ভিটাবল্যা আলীম মাদ্রাসার শিক্ষক। তার ছেলের নামও রয়েছে তালিকায়। আরেক ভাই মৃত মাজেদ মাষ্টারের দুই ছেলের একজন পুলিশের এসআই ও অপরজন উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা। অথচ তাদের মায়ের নাম রয়েছে তালিকায়। ফজলুল হক বুলুর আরেক ভাইয়ের নাম আনছার মোল্যা। তার দুই ছেলে আছর আলী ও আব্দুল লতিফ বিদেশ থাকেন। তাদের দুইজনেরই নাম রয়েছে তালিকায়। দোহাকুলা ইউপি চেয়ারম্যান আবু মোতালেব তরফদার জানিয়েছেন, তিনি কোন ভাগাভাগি করেননি।

গত ঈদে যে তালিকা করা হয়েছিলো, সেই তালিকা অনুযায়ি এবারও বিতরণ হবে। কারণ হিসাবে বলেন, দরিদ্র মানুষ যেমন প্রতি বছর পরিবর্তন হয়না। তেমনি বিত্তশালীরাও এক বছরের ব্যবধানে দরিদ্র হয়না। কেউ মারা গেলে সেই নামটা পরিবর্তন করা হয়। জামায়াত, বিএনপির প্রশ্নে তিনি বলেন, গত তালিকাও ঐ দুই দলের সমন্বয়ে করা হয়েছিলো।

বন্দবীলা ইউপি চেয়ারম্যান সব্দুল হোসেন খাঁন জানিয়েছেন, তিনি কোন রাজনৈতিক দলের নেতাদের কার্ড দেননি। রাজনৈতিক নেতাদের তালিকা দেখতে বলেছেন। তালিকায় কোন অনিয়ম থাকলে তাদের দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য ফোন দিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে এক হাজার কার্ডের দাবি করেছিলেন। তিনি তাতে সম্মত হননি।
দরাজহাট ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন জানান, তিনি ওমরা পালনে সৌদি আরবে ছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে ভাগাভাগি হয়েছে। বিএনপি সাড়ে চারশত ও জামায়াত সাড়ে তিনশত কার্ড নিয়েছে। ভাগাভাগির সময় পরিষদের সচিবের সাথে অসৌজন্য আচারণও করেছেন তারা।

পৌরসভার আট নং ওয়ার্ডে কামারের কাজ করেন মিঠু বিশ্বাস। তিনি চাল পাননি। অশোক বিশ্বাস কাজ করেন দিন মজুরের। অমল ও রাজ কুমার জীবিকা নিবৃাহ করেন মাছ ধরে। তার কেউই চাল পাননি। অথচ এ ওয়ার্ডের কলেজ শিক্ষক অনুপ রায়ের পরিবারের নাম রয়েছে ভিজিএফ এর তালিকায়।
বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার ভুপালী সরকার জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার রায়পুর, বাসুয়াড়ি, জামদিয়া ও পৌর সভায় ভিজিএফ কর্মসূচীর চাল বিতরণ করা হয়েছে। আগামী রোববার বাকি ইউনিয়ন গুলোতে বিতরণ হবে। তবে নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নে একটি অভিযোগের ভিত্তিতে বিতরণ বন্ধ রয়েছে। এ ইউনিয়নে বৃহস্পতিবার বিতরণের দিন ধার্য ছিলো। বৃহস্পতিবার পৌরসভাসহ বাকি তিন ইউনিয়নে চাল বিতরণ পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে বাসুয়াড়ি ইউনিয়নে গিয়ে দেখি দশ কেজির বদলে নয় কেজি করে চাল দিচ্ছে। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে বেশি বেশি দেওয়া শুরু করে। একজনের চাল ওজন করে দেখি দশ কেজি তিনশ গ্রাম হয়েছে। পৌরসভায় ৫০ কেজি চালের একটি বস্তা ওজন করে দেখা যায় তাতে এক কেজি কম। আর একটি বস্তা ওজন করে তাতে পাওয়া যায় ৪৬ কেজি। এ কারণে ১০ কেজি চাল বিতরণ সম্ভব হয়না। রায়পুরে বেশ কিছু অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। তাৎক্ষণিক কিছু সমাধান দেওয়া হয়।

তালিকায় অনিয়মের প্রশ্নে ভুপালী সরকার বলেন, প্রায় আঠারো হাজার নামের তালিকা যাচাই-বাছাই করা উপজেলা প্রশাসনের জন্য দুরুহ কাজ। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তার সমাধান দেওয়া সম্ভব। নারিকেলবাড়িয়ার প্রশ্নে বলেন, সঠিক সময়ে চাল বিতরণ করতে না পারলে সে দায় কারো না কারোর উপর বর্তাবে। তবে আশা করি সোমবার বিতরণ করা যেতে পারে।#