খাগড়াছড়িতে পাড়াবন পরিদর্শন: জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত
- আপডেট: ১১:০২:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ৮০

খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক;
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি।।পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদে প্রকৃতি শুধু একটা শব্দ নয়, বরং মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত এক গভীর সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের ধারক—পাড়াবন বা ভিলেজ কমন ফরেস্ট (ভিসিএফ)। বহু যুগ ধরে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব রীতি ও নিয়মে সংরক্ষিত এই বন আজ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং সুপেয় পানির উৎস ধরে রাখার ক্ষেত্রে অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
এই প্রেক্ষাপটে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার কমলছড়ি ইউনিয়নের ভূয়াছড়ি মৌজা ও ইটছড়ি মৌজার বিস্তীর্ণ পাড়াবন পরিদর্শন করেছেন পার্বত্য জেলা পরিষদের ভিসিএফ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প প্রতিনিধিরা—যা পুরো অঞ্চলে পরিবেশ সংরক্ষণ উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। ৩৮৭ একর পাহাড়ি বন-প্রকৃতির উদার ভান্ডার
ইটছড়ি মৌজার ১৭০ একর বনভূমি আর ভূয়াছড়ি মৌজার ২১৭ একর-মোট ৩৮৭ একর জমিজুড়ে সবুজের যে সমারোহ, তা পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের এক অনুপম উদাহরণ।
এখানে রয়েছে,ঝিরি-ঝর্ণা,কয়েকটি ছড়া,মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির প্রাচুর্য,সাপসহ বিভিন্ন সরীসৃপ,বহু প্রজাতির পাখির বাসস্থান,বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান গাছপালা,ছোট-বড় বন্যপ্রাণীর বিচরণ।
দুই মৌজায় মোট ৫৯০ পরিবারের বসবাস-যাদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে এই বন ও উৎসগুলো গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বনের ছড়া থেকে পানির সংগ্রহ, বনজ পণ্যের ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরতা এখানে প্রতিদিনের বাস্তবতা।
স্থানীয়দের সচেতনতা-বন রক্ষার মূল ভিত্তি,এই পাড়াবন কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের সরাসরি ব্যবস্থাপনায় নয়; বরং বহুদিন ধরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রথাগত নিয়মের মধ্য দিয়ে সংরক্ষিত।
কমলছড়ি ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড সদস্য বলেন,“পাড়াবন শুধু বন নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব। আমরা নিজেরাই দীর্ঘদিন ধরে এটি রক্ষা করছি। ভবিষ্যতেও সবাইকে নিয়ে এই কাজ করে যাব। প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা দরকার।”
স্থানীয়দের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই ভিলেজ কমন ফরেস্টকে পাহাড়ি অঞ্চলে পরিবেশ সংরক্ষণের টেকসই মডেল হিসেবে পরিচিত করেছে।
বায়োডাইভারসিটি এন্ড এনভায়রনমেন্ট প্রকল্পের বাস্তবায়নে কানাডা সরকারের সহযোগিতায় পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্প:এ বন সংরক্ষণে বর্তমানে কাজ করছে পার্বত্য জেলা পরিষদের বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট প্রজেক্ট, যেটি পরিচালিত হচ্ছে কানাডা সরকারের আর্থিক সহায়তায়।
এর মূল উদ্দেশ্য-জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বন ও ছড়া-ঝর্ণা রক্ষা,জলবায়ু ঝুঁকি কমানো
জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানো:সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়নজে,লার প্রকল্প কর্মকর্তা সুকেতন চাকমা জানান,খাগড়াছড়ি জেলার ৫০টি সাইটে আমরা কাজ করছি। প্রতিটি সাইটে ৩টি করে মোট ১৫০টি পাড়া নিয়ে প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বন সংরক্ষণ ও কমিউনিটি এনগেজমেন্ট আমাদের শীর্ষ লক্ষ্য।”“দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ছে,”ভিসিএফ সভাপতির মন্তব্য:
ইটছড়ি ভিসিএফের সভাপতি বলেন,“বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় পাড়াবন অত্যন্ত সহায়ক। বন থাকলে ঝড়-ঝঞ্ঝায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়, ছড়ার পানি টিকে থাকে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায়। এই প্রকল্প আমাদের সক্ষমতা আরও বাড়াবে।”
পরিদর্শনের সময় পাহাড়ি ঝর্ণার কলকল ধ্বনি, পাখির কিচিরমিচির আর ছড়ার স্রোত বনের সৌন্দর্যকে আরও জীবন্ত করে তোলে। উপস্থিত কর্মকর্তারা এ দৃশ্য দেখে অভিভূত হন।
বনবিভাগ: “সামাজিক বনায়নের এখনই উপযুক্ত সময়”-বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা বলেন, “পার্বত্য তিন জেলায় সামাজিক বনায়ন বা বন সংরক্ষণ কার্যক্রম তেমন নেই। তবে স্থানীয় জনগণ আগ্রহী হলে আমরা সামাজিক বনায়ন শুরু করতে প্রস্তুত। সময় এখন খুবই উপযোগী।”
তিনি আরও বলেন,“ভিসিএফগুলো স্থানীয় জনগণ রক্ষণাবেক্ষণ করে। এগুলোতে সরকারি সম্পৃক্ততা না থাকলেও আমরা মোটিভেশনাল প্রোগ্রামের মাধ্যমে বন রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াচ্ছি।”
“বন বাঁচলে মানুষ বাঁচবে..”পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন বলেন,“পাহাড়ে গাছপালা নিধন বেড়ে যাচ্ছে, আর জলধারা শুকিয়ে যাচ্ছে। বনের ছড়া-ঝর্ণা টিকিয়ে রাখতে হলে প্রাকৃতিক বনগুলো রক্ষা করা ছাড়া বিকল্প নেই। আমরা জেলা পরিষদ থেকে সব ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছি এবং ইউএনডিপিও সহযোগিতা করছে।”
তিনি আরও বলেন,“বনায়ন বাড়ানো এবং বন রিজার্ভ করে রাখলে পাহাড়ি মানুষ সুপেয় পানি পাবে। এটাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টিকে থাকার নিশ্চয়তা।”
সমন্বিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠছে প্রকৃতির সুরক্ষাবলয়;ভিসিএফ, ভিসিজি কমিটি, জেলা পরিষদ, বনবিভাগ ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে সবুজ পাহাড়ের নিরাপত্তা বেষ্টনী। প্রকৃতিকে রক্ষার এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকলে পার্বত্য অঞ্চল আবারও হয়ে উঠবে আরও সমৃদ্ধ, সবুজ ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর।
পাড়াবন পরিদর্শনে অংশ নেন,”জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন,বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট প্রকল্পের মহালছড়ি উপজেলা ফ্যাসিলিটেটর নকুল ত্রিপুরা,পানছড়ি উপজেলা ফ্যাসিলিটেটর ইতা চাকমা,প্রকল্পের অন্যান্য কর্মকর্তা ও সদস্যরা।
পরিবেশ রক্ষার এই মানবিক উদ্যোগ শুধু পাহাড় নয়—সারা দেশের মানুষের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সবুজ প্রকৃতি বাঁচুক, পাহাড় বাঁচুক, মানুষ বাঁচুক।





















