পাকিস্তানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক: অংশ নিচ্ছেন কারা, কী থাকছে আলোচনায়
- আপডেট: ০৫:১৫:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
- / ১০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইসলামাবাদ, পাকিস্তান— ফুটপাতগুলো নতুন করে রং করা হয়েছে, আগেই শক্তিশালী থাকা নিরাপত্তা আরো জোরদার করা হয়েছে; আর এক ধরনের প্রত্যাশা ও উদ্বেগ পাকিস্তানের রাজধানীকে ঘিরে ধরেছে। কারণ এই এখানে এমন কিছু বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে, যেগুলোর দিকে পুরো বিশ্বের নজর রয়েছে।
মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করে। সেই হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধে কয়েকটি দেশ মিলে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ বন্ধ হয়ে গেছে এবং জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে শনিবার (১১ এপ্রিল) ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
এই বৈঠক এমন এক সময় হচ্ছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরান পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে কিন্তু সেই যুদ্ধবিরতি এরইমধ্যে চাপে রয়েছে। কারণ উভয় পক্ষ তার শর্ত ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। একই সঙ্গে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা আরো বেড়েছে।
যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলের পাশাপাশি উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও হামলা চালিয়েছে ইরান, যার ফলে বিশ্বে সবচেয়ে বড় জ্বালানি রপ্তানি কেন্দ্র এবং বাণিজ্য, পর্যটন ও উদ্ভাবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র অস্থির হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পরপরই তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ইরানের সঙ্গে চুক্তি থাকা দেশগুলো বাদে আর কেউ ওই প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের মধ্যে জাহাজ পার করতে পারেনি। এতে বিশ্ববাজার কেঁপে ওঠে এবং জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে।
যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ পক্ষগুলোর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদে একত্রিত হচ্ছেন।
একনজরে দেখে নেওয়া যাক, ইসলামাবাদের বৈঠকে কারা অংশ নিচ্ছেন, কী বিষয়ে আলোচনা হবে, সম্ভাব্য বাধা কী এবং বিশ্ব কী আশা করতে পারে।
কখন এবং কোথায় বৈঠক হবে?
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ উভয় পক্ষকে আমন্ত্রণ জানানোর পর এই শনিবার ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হচ্ছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, শনিবার স্থানীয় সময় সকাল থেকে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, আলোচনা সর্বোচ্চ ১৫ দিন পর্যন্ত চলতে পারে অর্থাৎ প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদে থাকতে পারেন বা পরে আবার ফিরে আসতে পারেন।
ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এটি ফরেন অফিসের পাশে রেড জোনে অবস্থিত, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ও দূতাবাস রয়েছে। বুধবার সন্ধ্যা থেকে রবিবার পর্যন্ত হোটেলটি খালি করে দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীতে ৯ ও ১০ এপ্রিল সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, যদিও জরুরি সেবা চালু রয়েছে।
শহরজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রেড জোন সিল করে দেওয়া হয়েছে এবং শহরে প্রবেশের প্রধান পথগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে।
কারা অংশ নিচ্ছেন?
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে থাকবেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার।
ইরানের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেবেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তবে আইআরজিসির কোনো প্রতিনিধি থাকবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রতিনিধিরা বাস্তবে না পৌঁছানো পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত নয়।
আলোচনা কেমন হবে?
প্রধানমন্ত্রী শরিফ প্রথমে আলাদা করে উভয় পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার মূল আলোচনা পরিচালনা করবেন।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা আলাদা কক্ষে বসবেন এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বার্তা আদান-প্রদান করবেন।
ভ্যান্সের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইরান আগের আলোচনার অভিজ্ঞতার কারণে উইটকফ ও কুশনারের ওপর আস্থা কম রাখে। তারা ভ্যান্সকে তুলনামূলকভাবে যুদ্ধ শেষ করার পক্ষে বেশি আগ্রহী মনে করেন।
কেন পাকিস্তান?
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুই দেশের সঙ্গে তার কার্যকর সম্পর্ক রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের ৯০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে এবং এখানে বড় শিয়া জনগোষ্ঠী আছে, যা ইরানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই। এটিও ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক সম্পর্কও রয়েছে।
আলোচনার মূল বিষয় কী?
দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে রয়েছে- হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে রাজি, যা তারা অনড় অবস্থান হিসেবে দেখছে। তবে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করেনি।
লেবানন ইস্যু আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলায় ২০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইরান বলছে, এই হামলা বন্ধ না হলে তারা যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন পড়ে না।
সম্ভাব্য ফলাফল ও বাধা কী?
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কোনো চূড়ান্ত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে।
লেবাননই এখন সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্বের কেন্দ্র। ইরান চায়, সেখানে হামলা বন্ধ হোক; আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তা মানতে রাজি নয়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো- ইসরায়েল এই আলোচনায় নেই, অথচ তারা যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো টেকসই সমাধান পেতে হলে ইসরায়েলকে আলোচনায় আনতেই হবে।
তবে কিছু ইতিবাচক দিকও আছে। উভয় পক্ষই ক্লান্ত এবং কিছুটা বিরতি চায়। তাই আংশিক সমঝোতা, বিশেষ করে পারমাণবিক ইস্যু ও হরমুজ প্রণালি খোলা নিয়ে চুক্তি সম্ভব হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা মূলত আস্থা তৈরির প্রথম ধাপ। যদি যুদ্ধবিরতি টিকে থাকে এবং আলোচনা এগোয়, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় সাফল্য।



























