০৪:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

**হৃদয়ের রক্তক্ষরণে লেখা : মানবতার ফেরিওয়ালা মিজানুর রহমান মিজান আজ নেই**

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৯:০৫:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ৫০

শেখ কাজিম উদ্দিন : মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করা মানুষটি-উদ্ভাবক ও মানবতার ফেরিওয়ালা মিজানুর রহমান মিজান (৫৫)-আজ আর আমাদের মাঝে নেই। যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরেই তিনি জীবনের শেষ সীমানা টেনে দিলেন।
খবরটি শোনার পর থেকেই বুকের ভেতর যেন অজানা এক ব্যথা ক্রমাগত রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে চলছে।

কারা সূত্র জানায়, শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর ২০২৫) সন্ধ্যা আনুমানিক ৫টা ৫৯ মিনিটে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরের কার্পেট তৈরির ঘরে তিনি আত্মহত্যা করেন। সবার অগোচরে ঘরের এ্যাংগেলের সঙ্গে রশি বেঁধে গলায় ফাঁস লাগান। পরে কারারক্ষীরা তাঁকে উদ্ধার করলেও তখন আর কিছুই করার ছিল না-জীবন নিভে গেছে ততক্ষণে।

মৃত মিজানুর রহমান মিজান যশোরের শার্শা উপজেলার আমতলা গাতিপাড়া গ্রামের মো. আক্কাস আলীর ছেলে। তাঁর বিরুদ্ধে শার্শা থানার মামলা নং ০৭, তারিখ ২১/০৮/২০০৪, জিআর নং ৬৪৩/০৪ এবং এসসি নং ৫৮৯/০৬-এর ৩০২/৩৪ ধারার হত্যা মামলায় আদালত ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড (অনাদায়ে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড) দেন। রায়ের পর থেকে তিনি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজা ভোগ করছিলেন।
আমার দেখা মিজান ভাই-মানুষটি কেমন ছিলেন-

মরহুম মিজান ভাইকে যতটুকু দেখেছি-তিনি জীবদ্দশায় ছিলেন একজন মোটরসাইকেল মেকানিক, তবে তার চেয়েও বেশি কিছু। অগ্নি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ যন্ত্রসহ নানান উদ্ভাবনী প্রযুক্তির আবিষ্কার করে তিনি স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়েও পরিচিতি পান। সরকারের বিভিন্ন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী মেলায় তিনি বারবার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন। তাঁর হাতে পাওয়া সম্মাননা যেন নিবেদন ছিল দেশের মানুষের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার।

কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় ছিল-একজন মানবতার ফেরিওয়ালা। নিজের প্রতিভার অর্জন, নিজের সম্পদ-সবকিছু তিনি উদার হাতে বিলিয়েছেন পথশিশু, প্রবীণ, অসহায়, রোগাক্রান্ত ও দুঃস্থ মানুষের কল্যাণে। সবচেয়ে আলোচিত হয় তাঁর “ফ্রি ভাতের বাড়ি”-ক্ষুধা লাগলে খেয়ে যান। যেখানে ক্ষুধার্ত মানুষ বিনা মূল্যে খেতে পারতেন। শুক্রবারসহ বিশেষ দিনে ছিল গরু-ছাগলের মাংসসহ উন্নত খাবারের আয়োজন।

করোনার ভয়াবহ সময়ের কথা আজও ভুলতে পারি না। সবাই যখন জীবন বাঁচাতে ঘরবন্দি, কেউ কারও কাছে যায় না, সন্তান বাবা-মাকে স্পর্শ করতেও ভয় পায়-তখন মিজান ভাই নিজের হাতে রান্না করে রাস্তার পাগল, অসহায় মানুষ এমনকি কুকুর-প্রাণীদেরও খুঁজে খুঁজে খাইয়েছেন। পৃথিবী যেখানে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, সেখানে তিনি ছিলেন উষ্ণ মানবতার আলোর বাতি।

এমন মানুষ কি বারবার জন্মায়?
তিনি শ্যামলাগাছি এলাকায় একটি আবাসিক এতিমখানা ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন-পথশিশুদের কুড়িয়ে এনে বাবা-মায়ের আদলে দিয়েছেন আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, খাবার-সবকিছুর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। শত শত শিশু সেখানে নতুন জীবন পেয়েছে।

সেই শিশুদের মুখের হাসিই ছিল তাঁর দিনের আলো, রাতের শান্তি।

আমি নিজেও তাঁর ভালোবাসার ছোঁয়া পেয়েছি। করোনার সময়ে বেনাপোল বাজারে এসে শপিং ব্যাগ কেটে বানানো তাঁর নিজের হাতে তৈরি মাস্ক আমার মুখে পরিয়ে দেন। আমাকে বলেছিলেন-“কাজিম ভাই, আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করেন… খুব ভয় হয়-যেন আপনাদের মতো কাউকে আমরা না হারাই।”

সেই কথাগুলো আজ আরও বেশি আমারে কাঁদায়।
কিন্তু তিনি চলে গেলেন-কোন লজ্জায়? কোন কষ্টে?
হয়তো আমরা কেউ জানি না তিনি কী ভয়ংকর মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে শেষ মুহূর্তগুলো পার করছিলেন।

হয়তো সমাজের অদেখা কোনো দহন তাকে ভেঙে ফেলেছিল।
হয়তো তিনি চেয়েছিলেন চুপচাপ বিদায় নিতে-যেন কেউ বোঝেই না তিনি কতটা ভেঙে গিয়েছিলেন।
কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া এতিমখানা? পথশিশু? রোগাক্রান্ত মানুষগুলো?
কে দেখবে তাদের? কে তুলে দেবে ভাতের প্লেট?
অসুস্থ হলে কে দেবে ওষুধ?
এই প্রশ্নগুলো আজ আমাকে ভেতর থেকে ছারখার করে দিচ্ছে।
তবে মহান আল্লাহ দয়ালু। তিনি নিশ্চয়ই এই শিশুদের দেখবেন, রিজিকের দরজা খুলে দেবেন।
শেষ প্রার্থনা-
আমার দেখা একজন মানবিক মানুষের গল্প বললাম। তাঁর ভালো দিক দেখেছি, খারাপ দিকে যদি কিছু জেনে না থাকি-সেটা আমার সীমাবদ্ধতা। ভুল হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
মহান আল্লাহ যেন তাঁর রুহের মাগফিরাত দান করেন,
তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে স্থান দেন। আমিন।
পরিশেষে বলি তার স্বল্প আয়ের মধ্যে থেকে চলার পথে যা দেখেছি – মানুষের কল্যাণে তিনি প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এতিমখানা, মসজিদের জায়গা কেনাসহ সকল বিষয়ে জনসাধারণের সহযোগিতা চেয়েছেন – কিছু দিন পরে বলেছেন দয়া করে আর কেউ এ বিষয়ে আমাদের দান করবেন না- কখগঘ-এতো -এতো-সর্বমোট + হয়েছে। এভাবেই তিনি বিশাল টাকার মালিক না হলেও মসজিদ-মাদ্রাসা, এতিমখানা নির্মাণ সহ অনাহারীর মুখে হাসি ফুটিয়েছে ন। সমাজের মানুষের দেখিয়ে গিয়েছিলেন ধনবান নি হয়েও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা যায়।
আমার নিজের দেখা একজন মানবিক মানুষ মিজান ভাইয়ের জীবন থেকে নেওয়া কিছুটা গল্প শোনালাম। বলতে থাকলে অনেক কথা চলে আসবে, আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুন, আমীন।
লেখক: শেখ কাজিম উদ্দিন
একজন মফস্বল সংবাদকর্মী।

Please Share This Post in Your Social Media

**হৃদয়ের রক্তক্ষরণে লেখা : মানবতার ফেরিওয়ালা মিজানুর রহমান মিজান আজ নেই**

আপডেট: ০৯:০৫:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫

শেখ কাজিম উদ্দিন : মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করা মানুষটি-উদ্ভাবক ও মানবতার ফেরিওয়ালা মিজানুর রহমান মিজান (৫৫)-আজ আর আমাদের মাঝে নেই। যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরেই তিনি জীবনের শেষ সীমানা টেনে দিলেন।
খবরটি শোনার পর থেকেই বুকের ভেতর যেন অজানা এক ব্যথা ক্রমাগত রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে চলছে।

কারা সূত্র জানায়, শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর ২০২৫) সন্ধ্যা আনুমানিক ৫টা ৫৯ মিনিটে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরের কার্পেট তৈরির ঘরে তিনি আত্মহত্যা করেন। সবার অগোচরে ঘরের এ্যাংগেলের সঙ্গে রশি বেঁধে গলায় ফাঁস লাগান। পরে কারারক্ষীরা তাঁকে উদ্ধার করলেও তখন আর কিছুই করার ছিল না-জীবন নিভে গেছে ততক্ষণে।

মৃত মিজানুর রহমান মিজান যশোরের শার্শা উপজেলার আমতলা গাতিপাড়া গ্রামের মো. আক্কাস আলীর ছেলে। তাঁর বিরুদ্ধে শার্শা থানার মামলা নং ০৭, তারিখ ২১/০৮/২০০৪, জিআর নং ৬৪৩/০৪ এবং এসসি নং ৫৮৯/০৬-এর ৩০২/৩৪ ধারার হত্যা মামলায় আদালত ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড (অনাদায়ে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড) দেন। রায়ের পর থেকে তিনি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজা ভোগ করছিলেন।
আমার দেখা মিজান ভাই-মানুষটি কেমন ছিলেন-

মরহুম মিজান ভাইকে যতটুকু দেখেছি-তিনি জীবদ্দশায় ছিলেন একজন মোটরসাইকেল মেকানিক, তবে তার চেয়েও বেশি কিছু। অগ্নি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ যন্ত্রসহ নানান উদ্ভাবনী প্রযুক্তির আবিষ্কার করে তিনি স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়েও পরিচিতি পান। সরকারের বিভিন্ন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী মেলায় তিনি বারবার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন। তাঁর হাতে পাওয়া সম্মাননা যেন নিবেদন ছিল দেশের মানুষের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার।

কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় ছিল-একজন মানবতার ফেরিওয়ালা। নিজের প্রতিভার অর্জন, নিজের সম্পদ-সবকিছু তিনি উদার হাতে বিলিয়েছেন পথশিশু, প্রবীণ, অসহায়, রোগাক্রান্ত ও দুঃস্থ মানুষের কল্যাণে। সবচেয়ে আলোচিত হয় তাঁর “ফ্রি ভাতের বাড়ি”-ক্ষুধা লাগলে খেয়ে যান। যেখানে ক্ষুধার্ত মানুষ বিনা মূল্যে খেতে পারতেন। শুক্রবারসহ বিশেষ দিনে ছিল গরু-ছাগলের মাংসসহ উন্নত খাবারের আয়োজন।

করোনার ভয়াবহ সময়ের কথা আজও ভুলতে পারি না। সবাই যখন জীবন বাঁচাতে ঘরবন্দি, কেউ কারও কাছে যায় না, সন্তান বাবা-মাকে স্পর্শ করতেও ভয় পায়-তখন মিজান ভাই নিজের হাতে রান্না করে রাস্তার পাগল, অসহায় মানুষ এমনকি কুকুর-প্রাণীদেরও খুঁজে খুঁজে খাইয়েছেন। পৃথিবী যেখানে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, সেখানে তিনি ছিলেন উষ্ণ মানবতার আলোর বাতি।

এমন মানুষ কি বারবার জন্মায়?
তিনি শ্যামলাগাছি এলাকায় একটি আবাসিক এতিমখানা ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন-পথশিশুদের কুড়িয়ে এনে বাবা-মায়ের আদলে দিয়েছেন আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, খাবার-সবকিছুর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। শত শত শিশু সেখানে নতুন জীবন পেয়েছে।

সেই শিশুদের মুখের হাসিই ছিল তাঁর দিনের আলো, রাতের শান্তি।

আমি নিজেও তাঁর ভালোবাসার ছোঁয়া পেয়েছি। করোনার সময়ে বেনাপোল বাজারে এসে শপিং ব্যাগ কেটে বানানো তাঁর নিজের হাতে তৈরি মাস্ক আমার মুখে পরিয়ে দেন। আমাকে বলেছিলেন-“কাজিম ভাই, আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করেন… খুব ভয় হয়-যেন আপনাদের মতো কাউকে আমরা না হারাই।”

সেই কথাগুলো আজ আরও বেশি আমারে কাঁদায়।
কিন্তু তিনি চলে গেলেন-কোন লজ্জায়? কোন কষ্টে?
হয়তো আমরা কেউ জানি না তিনি কী ভয়ংকর মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে শেষ মুহূর্তগুলো পার করছিলেন।

হয়তো সমাজের অদেখা কোনো দহন তাকে ভেঙে ফেলেছিল।
হয়তো তিনি চেয়েছিলেন চুপচাপ বিদায় নিতে-যেন কেউ বোঝেই না তিনি কতটা ভেঙে গিয়েছিলেন।
কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া এতিমখানা? পথশিশু? রোগাক্রান্ত মানুষগুলো?
কে দেখবে তাদের? কে তুলে দেবে ভাতের প্লেট?
অসুস্থ হলে কে দেবে ওষুধ?
এই প্রশ্নগুলো আজ আমাকে ভেতর থেকে ছারখার করে দিচ্ছে।
তবে মহান আল্লাহ দয়ালু। তিনি নিশ্চয়ই এই শিশুদের দেখবেন, রিজিকের দরজা খুলে দেবেন।
শেষ প্রার্থনা-
আমার দেখা একজন মানবিক মানুষের গল্প বললাম। তাঁর ভালো দিক দেখেছি, খারাপ দিকে যদি কিছু জেনে না থাকি-সেটা আমার সীমাবদ্ধতা। ভুল হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
মহান আল্লাহ যেন তাঁর রুহের মাগফিরাত দান করেন,
তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে স্থান দেন। আমিন।
পরিশেষে বলি তার স্বল্প আয়ের মধ্যে থেকে চলার পথে যা দেখেছি – মানুষের কল্যাণে তিনি প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এতিমখানা, মসজিদের জায়গা কেনাসহ সকল বিষয়ে জনসাধারণের সহযোগিতা চেয়েছেন – কিছু দিন পরে বলেছেন দয়া করে আর কেউ এ বিষয়ে আমাদের দান করবেন না- কখগঘ-এতো -এতো-সর্বমোট + হয়েছে। এভাবেই তিনি বিশাল টাকার মালিক না হলেও মসজিদ-মাদ্রাসা, এতিমখানা নির্মাণ সহ অনাহারীর মুখে হাসি ফুটিয়েছে ন। সমাজের মানুষের দেখিয়ে গিয়েছিলেন ধনবান নি হয়েও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা যায়।
আমার নিজের দেখা একজন মানবিক মানুষ মিজান ভাইয়ের জীবন থেকে নেওয়া কিছুটা গল্প শোনালাম। বলতে থাকলে অনেক কথা চলে আসবে, আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুন, আমীন।
লেখক: শেখ কাজিম উদ্দিন
একজন মফস্বল সংবাদকর্মী।