খাগড়াছড়িতে ১৪৪ ধারার মধ্যেই গোলাগুলি-সংঘর্ষ-অগ্নিসংযোগ, ৩ জন নিহত
- আপডেট: ১২:৩৯:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / ১১৭

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা উপজেলায় ১৪৪ ধারা জারি থাকা অবস্থায় রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) অবরোধ চলাকালে ব্যাপক সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও গুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে তিনজন পাহাড়ি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সেনাবাহিনী ও পুলিশের অন্তত ১৬ জন সদস্য।
পাহাড়ি এক মারমা স্কুলছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে টানটান উত্তেজনার মধ্যে শনিবার থেকে গুইমারায় ১৪৪ ধারা বলবৎ ছিল। কিন্তু রোববার ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ ব্যানারে কর্মসূচি পালনকালে আইন অমান্য করে অবরোধ চলতে থাকে। এ সময় পুলিশ, সেনা সদস্য ও অবরোধকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে তিনজনের নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, “গুইমারা উপজেলায় দুষ্কৃতকারীদের হামলায় তিনজন পাহাড়ি নিহত এবং মেজরসহ ১৩ জন সেনাসদস্য, গুইমারা থানার ওসিসহ তিনজন পুলিশ সদস্যসহ আরও অনেকে আহত হয়েছেন।” তবে নিহতদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
এ ঘটনায় গুইমারার একটি বাজারে আগুন দেওয়া হলে পাহাড়িদের মালিকানাধীন বেশ কয়েকটি দোকান পুড়ে যায়। সেনাবাহিনী অভিযোগ করেছে, এ সহিংসতার জন্য পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে (ইউপিডিএফ) দায়ী করা হচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। উত্তেজনা বিরাজ করায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে শিগগির তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ততক্ষণ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য ধারণ করে শান্ত থাকার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে প্রাইভেট পড়ে ফেরার পথে এক মারমা কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পরে ওইদিন রাত ১১টার দিকে অচেতন অবস্থায় একটি ক্ষেত থেকে স্বজনরা তাকে উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শয়ন শীল (১৯) নামে এক তরুণকে আটক করেছে পুলিশ।
যা বলছে সেনাবাহিনী
গতকাল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেছে, গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে মোটরসাইকেল চালক মামুন হত্যাকে কেন্দ্র করে ইউপিডিএফ মূল এবং অঙ্গসংগঠনগুলো দীঘিনালা ও রাঙামাটিতে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ওই ঘটনার এক বছর পূর্তি হিসেবে এ বছর ইউপিডিএফ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করে এবং অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা করে।
আইএসপিআর আরও বলেছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালা এলাকায় এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ আমলে নিয়ে ইউপিডিএফের (মূল) দাবিকৃত সন্দেহভাজন শয়ন শীলকে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় পরদিন গ্রেপ্তার করা হয় এবং পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে নেওয়া হয়। শয়ন শীলকে গ্রেপ্তার করা সত্ত্বেও ইউপিডিএফের অঙ্গসংগঠন পিসিপির নেতা উখ্যানু মারমা ‘জুম্ম ছাত্র-জনতার’ ব্যানারে গত ২৪ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল এবং প্রতিবাদী মানববন্ধনের ডাক দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২৫ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফের আহ্বানে খাগড়াছড়িতে অর্ধবেলা হরতাল পালিত হয়। ২৬ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফের কর্মী উখ্যানু মারমার নেতৃত্বে এবং সামাজিক মাধ্যমে দেশি, প্রবাসী ব্লগারসহ পার্বত্য জেলার কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তির উসকানিমূলক প্রচারের প্রভাবে সমগ্র খাগড়াছড়িতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অবরোধ চলাকালে একপর্যায়ে ইউপিডিএফের প্ররোচনায় উচ্ছৃঙ্খল এলাকাবাসী টহলরত সেনাদলের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। ফলে তিনজন সেনাসদস্য আহত হন। সার্বিক পরিস্থিতি এবং উসকানির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেনাবাহিনী অত্যন্ত ধৈর্য্য, সংযম ও মানবিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এবং বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকে। ২৭ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফের অঙ্গসংগঠনের কর্মীরা আবারও দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টির চেষ্টা চালায় এবং বিভিন্ন স্থানে বাঙালিসহ সাধারণ মানুষের ওপর গুলি, ভাঙচুর, অ্যাম্বুলেন্সে আক্রমণ এবং রাস্তা অবরোধসহ নাশকতা করে সমগ্র খাগড়াছড়ি পৌরসভা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটায়। অবস্থা বিচারে জেলা প্রশাসন খাগড়াছড়ি ও গুইমারা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে।
আইএসপিআর আরও জানায়, খাগড়াছড়ি পৌরসভা এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির অপচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ইউপিডিএফ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো গতকাল সকাল থেকে গুইমারা উপজেলার রামসু বাজার এলাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সাধারণ জনগণকে উসকে রাস্তা অবরোধ করে গুইমারা-খাগড়াছড়ি রাস্তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। সকাল সাড়ে ১০টায় ইউপিডিএফ কর্মী এবং সন্ত্রাসীরা এলাকার বাঙালি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় লিপ্ত হয়। এ পর্যায়ে সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে তারা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র, ইট-পাটকেল, গুলতি ও লাঠিসোটা নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে সেনাবাহিনীর ওপর হামলা চালায়। এতে সেনাবাহিনীর তিনজন অফিসারসহ ১০ জন সদস্য আহত হন। একই সময় তারা রামগড় এলাকায় বিজিবির গাড়ি ভাঙচুর করে এবং বিজিবি সদস্যদের আহত করে। সংঘর্ষ চলাকালীন আনুমানিক সাড়ে ১১টায় রামসু বাজারের পশ্চিম দিকে অবস্থিত উঁচু পাহাড় থেকে ইউপিডিএফের (মূল) সশস্ত্র দলের সদস্যরা ৪-৫ বার অটোমেটিক অস্ত্র দিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং পাহাড়ি, বাঙালি ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত সেনাসদস্যদের লক্ষ্য করে ১০০-১৫০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। এতে এলাকাবাসীর অনেকে গুলিবিদ্ধ হন। এ অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনীর টহল দল দ্রুত সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করার লক্ষ্যে ওই এলাকায় গমন করে। সেনাবাহিনীর তৎপরতায় সশস্ত্র দলটি দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।
উভয়ের প্রতি শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান সুপ্রদীপ চাকমার: পাহাড়ি-বাঙালি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা। তিনি বলেন, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রোধে এবং পরিস্থিতি শান্ত রাখতে প্রশাসনকে কঠোর আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। তিনি ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকারও পরামর্শ দেন। গতকাল দুপুরে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে বিশেষ আইনশৃঙ্খলা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
সুপ্রদীপ চাকমা বলেন, পাহাড়ে শুধু সরকারি বাহিনীর কাছেই অস্ত্র থাকবে। এর বাইরে কারও কাছে অস্ত্র থাকতে পারবে না। চাঁদাবাজির কারণে এ এলাকায় উন্নয়নে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। প্রশাসনকে এ বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি টিআইবির: খাগড়াছড়িতে ১২ বছরের কিশোরী ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে চলা আন্দোলনে ব্যাপক সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সঙ্গে এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল এক বিবৃতিতে এ দাবি জানিয়েছে টিআইবি।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গত এক বছরে এই জেলায় সাতজন আদিবাসী নারী ধর্ষণের শিকার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ঘটনার বিচার হয়নি। এ অবস্থায় ফের কিশোরীকে বর্বরোচিত ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ন্যায়বিচারের দাবিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর যৌক্তিক আন্দোলন কি অপরাধ?’
একই সঙ্গে ধর্ষণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংসরূপ দিতে যারা জড়িত এবং যেসব কুশীলব ভূমিকা পালন করেছে, তাদের খুঁজে বের করাসহ এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছে টিআইবি।
সহিংসতা বন্ধের আহ্বান ঐক্য পরিষদের
খাগড়াছড়িতে সহিংসতা অনতিবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ। একই সঙ্গে দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও আহতদের সুচিকিৎসারও জোর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল ঐক্য পরিষদের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি এ দাবি জানানো হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক নিরাপত্তা আরও বাড়াতে বলল হেফাজতে ইসলাম
গুইমারায় সেনাবাহিনীর ওপর সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে সংগঠনের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব সাজেদুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক নিরাপত্তা পদক্ষেপ আরও বাড়াতে হবে। তারা আরও বলেন, মুসলিম-অধ্যুষিত বাংলাদেশ থেকে পার্বত্য অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করে ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্র’ বানানোর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও বহু পুরোনো। এই ষড়যন্ত্র ঠেকিয়ে দিতে বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক ধর্মপ্রাণ ছাত্র-জনতা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিয়োজিত সেনাবাহিনী ও বিজিবির পাশে আছে।
তিন পার্বত্য জেলায় অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ
এবার আট দফা দাবিতে তিন পার্বত্য জেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’। অবরোধ চলাকালে সব পর্যটন কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ থাকবে বলেও উল্লেখ করা হয়। গতকাল সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ অবরোধের তথ্য জানানো হয়।
তাদের আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে, ধর্ষণ মামলার অবশিষ্ট দুই আসামিকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োগ করা; ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি ও গুইমারায় ঘটে যাওয়া লুটপাট, অগ্নিসংযোগের ঘটনার তদন্ত করা; জুম্ম ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত হামলা, দোকানপাট ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগে সৃষ্ট ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদান; চলমান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আটককৃত সবাইকে মুক্তি দেওয়া এবং ১৪৪ ধারা বাতিল করা।
সুত্র : ঢাকা টাইমস।





















