১১:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

আওয়ামী লীগের অবরোধ কর্মসূচি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনীতি ….স্বপন বিশ্বাস

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৬:২৪:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫
  • / ৯৬

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নহে
বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও অস্থিরতার চক্রে প্রবেশ করেছে। একদিকে শাসকদলের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ও জনঅসন্তোষ, অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের আন্দোলনের তীব্রতা—সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আজ নতুন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো আওয়ামী লীগের ঘোষিত অবরোধ কর্মসূচি, যা একদিকে তাদের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতীক, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

অবরোধ কর্মসূচির পটভূমি
আওয়ামী লীগ, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর, এখন নিজ দলের ভেতর থেকেই সমালোচনার মুখে পড়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব, ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার দায় এখন আর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এমন প্রেক্ষাপটে দলীয় নেতৃত্ব ঘোষণা দিয়েছে “দেশজুড়ে অবরোধ” কর্মসূচি—যা মূলত প্রশাসনের প্রতি এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা, এবং বিরোধী পক্ষের ওপর শক্তি প্রদর্শনের কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কর্মসূচি এক অর্থে সরকারের ভেতরকার দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশও বটে। সাম্প্রতিক সময়ের অভ্যন্তরীণ সমালোচনা, দুর্নীতি, এবং প্রশাসনের প্রতি জনঅবিশ্বাস—সবকিছু মিলিয়ে আওয়ামী লীগ চায় তাদের ‘সংগঠিত উপস্থিতি’ আবারও দৃশ্যমান করতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উপস্থিতি প্রদর্শনের উপায় যদি হয় অবরোধ, রাস্তা বন্ধ, বা জনজীবন অচল করা—তাহলে সেটি আদৌ গণতান্ত্রিক নাকি আত্মঘাতী?

গণতান্ত্রিক আন্দোলন নাকি দমনমূলক কৌশল?
অবরোধ, ধর্মঘট বা বিক্ষোভ—এসবই রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে, যদি তা হয় শান্তিপূর্ণ ও জনসম্পৃক্ত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে যে সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা নাগরিক জীবনে ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো—ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-বরিশাল, চট্টগ্রাম-সিলেট মহাসড়ক—অবরোধের কবলে পড়েছে। গাছ কেটে রাস্তা বন্ধ করা, টায়ার জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ করা—এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন সাধারণ যাত্রীরা, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পণ্য পরিবহন ও কৃষিজাত বাজার।

একজন ব্যবসায়ী মন্তব্য করেছেন, “রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার লড়াইয়ে আমরা জনতা বারবার জিম্মি হচ্ছি।”
এই মন্তব্যের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বাস্তব প্রতিধ্বনি—রাজনীতির লড়াই প্রায়ই হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রের স্বাভাবিক চলাচল অচল করে দেওয়ার প্রতিযোগিতা।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয়ের সংকট
এক সময় আওয়ামী লীগ ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক, গণতন্ত্র ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনের প্রধান ধারক। কিন্তু আজ সেই দলের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর যেকোনো রাজনৈতিক দলই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির বাইরে চলে যায়—আওয়ামী লীগও তার ব্যতিক্রম নয়। আজকের আওয়ামী লীগ একদিকে প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী, কিন্তু নৈতিক ও জনআস্থার জায়গায় দুর্বল। দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রায় অনুপস্থিত, সিদ্ধান্ত আসে উপর থেকে নিচে। স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা এখন আর তৃণমূল জনগণের কণ্ঠ নয়, বরং প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অংশ। ফলে দলটি ধীরে ধীরে একটি রাষ্ট্র-নির্ভর রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিয়েছে, যেখানে আন্দোলন, অবরোধ বা শক্তি প্রদর্শনও মূলত ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার।

এ অবস্থায় দলটির জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হলো ‘আদর্শগত বৈধতা’। জনগণের কাছে প্রশ্ন উঠছে—যে দল একসময় গণতন্ত্রের জন্য লড়েছিল, আজ তারা নিজেই কি গণতন্ত্রকে সংকুচিত করছে না?

বিরোধী রাজনীতি ও প্রতিক্রিয়া
বিরোধী দল বিএনপি ও অন্যান্য জোটগুলোও একইভাবে আন্দোলনে রয়েছে। ফলে মাঠে নেমে আওয়ামী লীগ যদি একই কৌশল নেয়—অবরোধ বা পাল্টা অবরোধ—তাহলে রাজনৈতিক সংঘর্ষ অনিবার্য। এর ফলশ্রুতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চাপ বাড়বে, যা রাজনৈতিক সহিংসতার দিকে দেশকে ঠেলে দিতে পারে।তবে এই পাল্টা-অবরোধ রাজনীতি জনসাধারণের কাছে এক প্রকার ক্লান্তি সৃষ্টি করছে। জনগণ আজ আর দলীয় পরিচয়ের চেয়ে বেশি চিন্তিত জীবিকা, মূল্যস্ফীতি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলো যতই নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে ব্যস্ত হোক না কেন, জনমনে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্নতার বীজ বপন হচ্ছে—যা গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ সংকেত।

বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনীতি: তিনটি সম্ভাব্য দিক এখন প্রশ্ন, এই অবরোধ রাজনীতি বাংলাদেশের ভবিষ্যতকে কোন পথে নিয়ে যাবে?

(১) সংস্কার ও পুনর্জাগরণের পথ
একটি সম্ভাবনা হলো—এই সংকট থেকেই নতুন রাজনৈতিক সংস্কারের সূচনা হতে পারে। আওয়ামী লীগ যদি আত্মসমালোচনা করে, দলীয় কাঠামোতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনে, নতুন নেতৃত্বকে জায়গা দেয় এবং প্রশাসনিক সংস্কার শুরু করে, তাহলে তারা পুনরায় জনআস্থা ফিরে পেতে পারে। এজন্য প্রয়োজন হবে দলের ভিতরে জবাবদিহি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা।

(২) সংঘাত ও দমননীতির পথ
দ্বিতীয় সম্ভাবনা—রাজনীতি ক্রমশ দমননীতির দিকে এগোবে। তখন সরকার অবরোধ বা আন্দোলন ঠেকাতে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবে, ফলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হবে। এতে সাময়িক স্থিতিশীলতা এলেও দীর্ঘমেয়াদে সমাজে হতাশা, ক্রোধ ও অরাজকতার জন্ম দেবে। ইতিহাস বলছে, দমননীতি কখনোই স্থায়ী সমাধান দেয় না; বরং তা আরও বড় অস্থিরতার কারণ হয়।

(৩) বিকল্প শক্তির উত্থান

তৃতীয় সম্ভাবনা—একটি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব। তরুণ সমাজ, নাগরিক আন্দোলন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক সংগঠনগুলো আজ যেভাবে রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রশ্নে সোচ্চার, তাতে আগামী দশকে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এই প্রজন্ম আর পুরনো দলের আনুগত্যে আবদ্ধ নয়; তারা চায় সুশাসন, ন্যায়, স্বচ্ছতা এবং মানবিক রাজনীতি।

যদি আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য বড় দল এ পরিবর্তনের আহ্বান শুনতে ব্যর্থ হয়, তবে ইতিহাস নতুন বিকল্প খুঁজে নেবে—যেমনটি বহুবার ঘটেছে বিশ্ব রাজনীতিতে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও আলোচিত। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ও চীন—সবাইই বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে আগ্রহী। তারা চায় না বাংলাদেশ কোনো গৃহদ্বন্দ্ব বা সহিংসতার পথে যাক। কিন্তু যদি অবরোধ, সংঘর্ষ ও অনিশ্চয়তা বাড়ে, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানি, এমনকি মানবাধিকার ইমেজও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অর্থাৎ রাজনীতির বর্তমান অস্থিরতা কেবল দলীয় স্বার্থে নয়—রাষ্ট্রের অর্থনীতি, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানেও প্রভাব ফেলছে।

গণমানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আজ রাজনীতি থেকে চায় স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার ও সুযোগের সমতা। তারা আর আন্দোলনের নামে হরতাল, অবরোধ বা সহিংসতা চায় না। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যেন বারবার সেই পুরনো কৌশলেই ফিরে যায়।

অবরোধ কর্মসূচির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ হয়তো নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করছে, কিন্তু তা তাদের জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে না। বরং নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ মনে করছে, রাজনীতি এখন সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

উপসংহার
আওয়ামী লীগের অবরোধ কর্মসূচি বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রতীকী মুহূর্ত—যেখানে শাসকদলই আন্দোলনের ভাষা ব্যবহার করছে। এটি যেমন এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল, তেমনি এক গভীর সংকটের প্রতিফলনও বটে। আজ বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে দুটি রাস্তা—

একটি, আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের রাস্তা, যেখানে দলগুলো নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নতুন করে বিশ্বাস গড়ে তুলবে;

অন্যটি, সংঘাত, দমননীতি ও অবিশ্বাসের রাস্তা, যা দেশকে আবারও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সংলাপের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা। ক্ষমতা নয়, প্রয়োজন জনগণের আস্থা।
যদি আওয়ামী লীগ সত্যিই দেশের শাসনক্ষমতায় থাকতে চায়, তবে তাদের বুঝতে হবে—শক্তি প্রদর্শন নয়, বিশ্বাসই রাজনীতির আসল ভিত্তি।

Please Share This Post in Your Social Media

আওয়ামী লীগের অবরোধ কর্মসূচি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনীতি ….স্বপন বিশ্বাস

আপডেট: ০৬:২৪:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নহে
বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও অস্থিরতার চক্রে প্রবেশ করেছে। একদিকে শাসকদলের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ও জনঅসন্তোষ, অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের আন্দোলনের তীব্রতা—সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আজ নতুন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো আওয়ামী লীগের ঘোষিত অবরোধ কর্মসূচি, যা একদিকে তাদের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতীক, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

অবরোধ কর্মসূচির পটভূমি
আওয়ামী লীগ, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর, এখন নিজ দলের ভেতর থেকেই সমালোচনার মুখে পড়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব, ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার দায় এখন আর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এমন প্রেক্ষাপটে দলীয় নেতৃত্ব ঘোষণা দিয়েছে “দেশজুড়ে অবরোধ” কর্মসূচি—যা মূলত প্রশাসনের প্রতি এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা, এবং বিরোধী পক্ষের ওপর শক্তি প্রদর্শনের কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কর্মসূচি এক অর্থে সরকারের ভেতরকার দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশও বটে। সাম্প্রতিক সময়ের অভ্যন্তরীণ সমালোচনা, দুর্নীতি, এবং প্রশাসনের প্রতি জনঅবিশ্বাস—সবকিছু মিলিয়ে আওয়ামী লীগ চায় তাদের ‘সংগঠিত উপস্থিতি’ আবারও দৃশ্যমান করতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উপস্থিতি প্রদর্শনের উপায় যদি হয় অবরোধ, রাস্তা বন্ধ, বা জনজীবন অচল করা—তাহলে সেটি আদৌ গণতান্ত্রিক নাকি আত্মঘাতী?

গণতান্ত্রিক আন্দোলন নাকি দমনমূলক কৌশল?
অবরোধ, ধর্মঘট বা বিক্ষোভ—এসবই রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে, যদি তা হয় শান্তিপূর্ণ ও জনসম্পৃক্ত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে যে সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা নাগরিক জীবনে ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো—ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-বরিশাল, চট্টগ্রাম-সিলেট মহাসড়ক—অবরোধের কবলে পড়েছে। গাছ কেটে রাস্তা বন্ধ করা, টায়ার জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ করা—এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন সাধারণ যাত্রীরা, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পণ্য পরিবহন ও কৃষিজাত বাজার।

একজন ব্যবসায়ী মন্তব্য করেছেন, “রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার লড়াইয়ে আমরা জনতা বারবার জিম্মি হচ্ছি।”
এই মন্তব্যের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বাস্তব প্রতিধ্বনি—রাজনীতির লড়াই প্রায়ই হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রের স্বাভাবিক চলাচল অচল করে দেওয়ার প্রতিযোগিতা।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয়ের সংকট
এক সময় আওয়ামী লীগ ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক, গণতন্ত্র ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনের প্রধান ধারক। কিন্তু আজ সেই দলের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর যেকোনো রাজনৈতিক দলই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির বাইরে চলে যায়—আওয়ামী লীগও তার ব্যতিক্রম নয়। আজকের আওয়ামী লীগ একদিকে প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী, কিন্তু নৈতিক ও জনআস্থার জায়গায় দুর্বল। দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রায় অনুপস্থিত, সিদ্ধান্ত আসে উপর থেকে নিচে। স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা এখন আর তৃণমূল জনগণের কণ্ঠ নয়, বরং প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অংশ। ফলে দলটি ধীরে ধীরে একটি রাষ্ট্র-নির্ভর রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিয়েছে, যেখানে আন্দোলন, অবরোধ বা শক্তি প্রদর্শনও মূলত ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার।

এ অবস্থায় দলটির জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হলো ‘আদর্শগত বৈধতা’। জনগণের কাছে প্রশ্ন উঠছে—যে দল একসময় গণতন্ত্রের জন্য লড়েছিল, আজ তারা নিজেই কি গণতন্ত্রকে সংকুচিত করছে না?

বিরোধী রাজনীতি ও প্রতিক্রিয়া
বিরোধী দল বিএনপি ও অন্যান্য জোটগুলোও একইভাবে আন্দোলনে রয়েছে। ফলে মাঠে নেমে আওয়ামী লীগ যদি একই কৌশল নেয়—অবরোধ বা পাল্টা অবরোধ—তাহলে রাজনৈতিক সংঘর্ষ অনিবার্য। এর ফলশ্রুতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চাপ বাড়বে, যা রাজনৈতিক সহিংসতার দিকে দেশকে ঠেলে দিতে পারে।তবে এই পাল্টা-অবরোধ রাজনীতি জনসাধারণের কাছে এক প্রকার ক্লান্তি সৃষ্টি করছে। জনগণ আজ আর দলীয় পরিচয়ের চেয়ে বেশি চিন্তিত জীবিকা, মূল্যস্ফীতি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলো যতই নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে ব্যস্ত হোক না কেন, জনমনে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্নতার বীজ বপন হচ্ছে—যা গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ সংকেত।

বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনীতি: তিনটি সম্ভাব্য দিক এখন প্রশ্ন, এই অবরোধ রাজনীতি বাংলাদেশের ভবিষ্যতকে কোন পথে নিয়ে যাবে?

(১) সংস্কার ও পুনর্জাগরণের পথ
একটি সম্ভাবনা হলো—এই সংকট থেকেই নতুন রাজনৈতিক সংস্কারের সূচনা হতে পারে। আওয়ামী লীগ যদি আত্মসমালোচনা করে, দলীয় কাঠামোতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনে, নতুন নেতৃত্বকে জায়গা দেয় এবং প্রশাসনিক সংস্কার শুরু করে, তাহলে তারা পুনরায় জনআস্থা ফিরে পেতে পারে। এজন্য প্রয়োজন হবে দলের ভিতরে জবাবদিহি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা।

(২) সংঘাত ও দমননীতির পথ
দ্বিতীয় সম্ভাবনা—রাজনীতি ক্রমশ দমননীতির দিকে এগোবে। তখন সরকার অবরোধ বা আন্দোলন ঠেকাতে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবে, ফলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হবে। এতে সাময়িক স্থিতিশীলতা এলেও দীর্ঘমেয়াদে সমাজে হতাশা, ক্রোধ ও অরাজকতার জন্ম দেবে। ইতিহাস বলছে, দমননীতি কখনোই স্থায়ী সমাধান দেয় না; বরং তা আরও বড় অস্থিরতার কারণ হয়।

(৩) বিকল্প শক্তির উত্থান

তৃতীয় সম্ভাবনা—একটি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব। তরুণ সমাজ, নাগরিক আন্দোলন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক সংগঠনগুলো আজ যেভাবে রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রশ্নে সোচ্চার, তাতে আগামী দশকে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এই প্রজন্ম আর পুরনো দলের আনুগত্যে আবদ্ধ নয়; তারা চায় সুশাসন, ন্যায়, স্বচ্ছতা এবং মানবিক রাজনীতি।

যদি আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য বড় দল এ পরিবর্তনের আহ্বান শুনতে ব্যর্থ হয়, তবে ইতিহাস নতুন বিকল্প খুঁজে নেবে—যেমনটি বহুবার ঘটেছে বিশ্ব রাজনীতিতে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও আলোচিত। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ও চীন—সবাইই বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে আগ্রহী। তারা চায় না বাংলাদেশ কোনো গৃহদ্বন্দ্ব বা সহিংসতার পথে যাক। কিন্তু যদি অবরোধ, সংঘর্ষ ও অনিশ্চয়তা বাড়ে, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানি, এমনকি মানবাধিকার ইমেজও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অর্থাৎ রাজনীতির বর্তমান অস্থিরতা কেবল দলীয় স্বার্থে নয়—রাষ্ট্রের অর্থনীতি, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানেও প্রভাব ফেলছে।

গণমানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আজ রাজনীতি থেকে চায় স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার ও সুযোগের সমতা। তারা আর আন্দোলনের নামে হরতাল, অবরোধ বা সহিংসতা চায় না। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যেন বারবার সেই পুরনো কৌশলেই ফিরে যায়।

অবরোধ কর্মসূচির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ হয়তো নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করছে, কিন্তু তা তাদের জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে না। বরং নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ মনে করছে, রাজনীতি এখন সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

উপসংহার
আওয়ামী লীগের অবরোধ কর্মসূচি বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রতীকী মুহূর্ত—যেখানে শাসকদলই আন্দোলনের ভাষা ব্যবহার করছে। এটি যেমন এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল, তেমনি এক গভীর সংকটের প্রতিফলনও বটে। আজ বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে দুটি রাস্তা—

একটি, আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের রাস্তা, যেখানে দলগুলো নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নতুন করে বিশ্বাস গড়ে তুলবে;

অন্যটি, সংঘাত, দমননীতি ও অবিশ্বাসের রাস্তা, যা দেশকে আবারও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সংলাপের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা। ক্ষমতা নয়, প্রয়োজন জনগণের আস্থা।
যদি আওয়ামী লীগ সত্যিই দেশের শাসনক্ষমতায় থাকতে চায়, তবে তাদের বুঝতে হবে—শক্তি প্রদর্শন নয়, বিশ্বাসই রাজনীতির আসল ভিত্তি।