১০:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

শালিখায় শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও দু’টি কথা

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৮:১৫:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৫
  • / ৩৪৭

লক্ষণ কুমার মন্ডল, শালিখা মাগুরা প্রতিনিধিঃ
মাগুরার শালিখায় শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব (৫২৫১তম) তিথি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করেন, উপজেলা আড়পাড়া কেন্দ্রীয় মন্দিরের সার্বজনীন জন্মাষ্টমী উদযাপন কমিটি। ভাদ্র মাসের রোদের উত্তাপ উপেক্ষা করে এসময় রাস্তার দুধারে অসংখ্য মানুষ তা উপভোগ করেন। এসময় সনাতন নারীরা উলুধ্বনি দিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা কে স্বাগত জানায়।

শঙ্খ ধ্বনি, ঢাকঢোলের বাদ্য বাজনা নিয়ে উৎসবমুখর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় অংশ নেন সনাতন ধর্ম অবলম্বীরা। শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষের সরব অংশ গ্রহণ দেখে মনে হয়েছে, যেন কৃষ্ণ প্রেমের এক অদৃশ্য টানে ছুটে চলেছেন তারা শেকড়ের সন্ধানে।

রবিবার (১৭ আগষ্ট) বিকাল ৩ টায় উপজেলা কেন্দ্রীয় মন্দির প্রাঙ্গনে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাটি হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে পরিণত হয় মিলনমেলায়। বিভিন্ন সাজে সজ্জিত কৃষ্ণ ভক্তরা নেচে গেয়ে বাদ্য বাজনা বাজিয়ে উপজেলা সদর আড়পাড়া বাজারের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। পরে কেন্দ্রীয় মন্দির প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

উপজেলা কেন্দ্রীয় মন্দিরের ভক্তবৃন্দ অপরুপ সাহা জানান, শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে দিনটি উদযাপন করেন।ও এই দিন ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের সান্নিধ্য লাভের আশায় ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে মন্দির ও বাসাবাড়িতে নানান রকম ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করেন।ও দেবকীর বিয়ের পর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাবণ একটি দৈববাণীর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের হাতে তার মৃত্যু হবে। এই কথা শুনে তিনি দেবকী ও বসুদেবকে কারারুদ্ধ করেন এবং তাদের প্রথম ছয় পুত্রকে হত্যা করেন। দেবকী তার সপ্তম গর্ভ রোহিণীকে প্রদান করলে, বলরামের জন্ম হয়। কিন্তু জন্ম কালীন সময় জগতের বিশ্বময় আকাশ মেঘে আচ্ছন্ন ও বিদ্যুৎ চমকায়,বৃষ্টির প্লাবন পৃথিবীর বুকে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে এরই মাঝে কৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন, মানবজাতির জন্য যেন একটা অলৌকিক বার্তা পৃথিবীর বুকে এসেছে। তিনি বলেন হিন্দু পুরাণ অনুসারে, আনুমান আজ থেকে প্রায় ৫ হাজার ২ শ বছর পূর্বে, দাপর যুগে যখন রাজা কংসের অত্যাচারে চারিদিকে অরাজকতা, নৃসংশতা, নিপীড়নে মানুষ জর্জরিত, সে সময়ে বাসুদেব ও দেবকীর ঘরে ভূমিষ্ট হন শ্রীকৃষ্ণ সেই থেকে প্রতিবছর এই তিথিতে কৃষ্ণ জন্মোৎসব পালিত হয়। এটি কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী নামে পরিচিত।

জন্মাষ্টমী কি?
“”””””””””””””””””””
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তিথিকে জন্মাষ্টমী বলা হয়।

জন্মাষ্টমীর উপবাস করতে হয় কেন?
“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী ব্রতদিন নির্ণয় করতে গিয়ে শাস্ত্রে বলা হয়েছে:

“কৃষ্ণোপাস্যাষ্টমী ভাদ্রে রোহিণ্যাঢ্যা মহাফলা।
নিশীথেহত্রাপি কিঞ্চেন্দৌজ্ঞে বাপি নবমীযুতা”॥

অর্থাৎ, ভাদ্রমাসে কৃষ্ণাষ্টমী উপবাস যোগ্যা। রোহিণী নক্ষত্রযুক্তা হলে আরও অধিক ফলপ্রদা। আর নবমী তিথি সংযুক্তা হলে আরও অধিক ফলপ্রদা হয়।
অর্থাৎ নবমী তিথি যুক্ত জন্মাষ্টমী অধিক শ্রেষ্ঠ। অন্যদিকে পূর্বতিথি সপ্তমী বিদ্ধা জন্মাষ্টমী সর্বদা ত্যজ্য।

পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে:
“পঞ্চগব্যং যথা শুদ্ধং ন গ্রাহ্যং মদ্যসঙযুক্তম্।
রবিবিদ্ধা তথা ত্যজ্যা রোহিণী সহিতা যদি”॥

অনুবাদঃ যদিও পঞ্চগব্য পবিত্র, কিন্তু এতে মদ মিশলে আর তা গ্রহণযোগ্য থাকেনা, তেমনিভাবে রোহিণী নক্ষত্র সংযুক্তা হলেও সপ্তমীবিদ্ধা অষ্টমী গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, সপ্তমী তিথি থাকার দরুন ঐ দিন অষ্টমী হলেও তা জন্মাষ্টমী নয়।

একই কারণে এই বছর ১৫ আগস্ট অষ্টমী তিথির সঙ্গে সপ্তমী তিথি সংযুক্ত থাকায় তা প্রকৃত অর্থে জন্মাষ্টমী নয়। এজন্য ১৬ আগস্ট জন্মাষ্টমী পালন করা কর্তব্য হয় (২০২৫) এ বছরের জন্য।

কিভাবে জন্মাষ্টমীর উপবাস পালন করতে হয় ?
“””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
১) আগের দিন শুক্রবার রাত ১২ টার আগে অন্ন প্রসাদ পাবেন। ঘুমানোর আগে ব্রাশ করে ঘুমাতে হবে।

২) পরের দিন শনিবার সকাল থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত উপবাস এবং জাগরণ। উপবাস থেকে হরিনাম জপ, কৃষ্ণ লীলা শ্রবন, ভগবানকে দর্শন, ভক্ত সঙ্গে হরিনাম কীর্তন,, অভিষেক দর্শন করতে হবে এবং ভগবানকে অভিষেক করে একাদশীর দিনের মতো অনুকল্প প্রসাদ সেবন করতে হবে।

৩) আর যাদের উপবাস পালনে সমস্যা, অসুস্থ, তারা অবশ্যই দুপুর ১২টার পরে, কৃষ্ণের কাছে ক্ষমা চেয়ে, একটু দুধ, বা ফল খেতে পারবেন।

৪) পরের দিন সকালে স্নান করা শেষে ৭টা থেকে ৮ টার মধ্যে কৃষ্ণ প্রসাদ দিয়ে পারন করবেন।

২০২৫ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কততম জন্মাষ্টমী?
**************************************
২০২৫ ইং সালের জন্মাষ্টমী পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫১ তম শুভ জন্মাষ্টমী। কারণ, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ১২৫ বছর প্রকট লীলাবিলাস করেন। ১২৫ বছর ধরাধামে অবস্থান করে গোলকে গমন করেন। মাঘ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ইহধাম ত্যাগ করে অন্তর্ধান করেন। সেই দিনই কলি প্রবেশ করেছে, সেই দিন ছিল শুক্রবার। খ্রীষ্টপূর্ব ৩১০১ এ কলিযুগ আরম্ভ হয়। বর্তমান ২০২৫ খ্রীষ্টাব্দ, তাহলে কলির বয়স ৩১০১+২০২৫ = ৫১২৬ বছর। শ্রীকৃষ্ণের অর্ন্তধানের দিন কলির আবির্ভাব। শ্রীকৃষ্ণ ১২৫ বছর প্রকট লীলা করেছেন। তাহলে শ্রীকৃষ্ণের আর্বিভাব ৫১২৬+১২৫ = ৫২৫১ বছর পূর্বে হয়েছিল। অর্থাৎ ২০২৫ ইংরেজি সালের মাঘী পূর্ণিমা থেকে ৫২৫১ বছর পূর্বে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়।

শাস্ত্রে আছে কেউ যদি একবার শ্রীকৃষ্ণের এই জন্মাষ্টমীর উপবাস পালন করে তা হলে তাকে আর এই জড় জগতে জন্ম, মৃত্যু, জড়া, ব্যাধি, ভোগ করতে হয় না, ও পূর্নজন্ম গ্রহন করতে হয় না। তাই সকলে শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫১ তম জন্মাষ্টমী পালন করে মানব জীবনটাকে পুন্যময় করে তুলুন।।

লীলা পুরুষোত্তম পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫১ তম শুভ আবির্ভাব তিথি জন্মাষ্টমী মহোৎসব ২০২৫ সকলের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ এবং শান্তি এই প্রার্থনা পরম পিতা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রী চরণ কমলে করছি। সকলের জীবন হোক কৃষ্ণময়।

শ্রীকৃষ্ণ বিশ্বসৃষ্টির প্রয়োজনে ব্রহ্মা (রজোগুণ), বিষ্ণু (সত্ত্বগুণ) ও শিবের (তমোগুণ) দ্বারা যথাক্রমে বিশ্ব সৃষ্টি, পালন ও ধ্বংস করেন। জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণ সৃষ্টি করেও ভগবান জড়া প্রকৃতির অতীত।

হে ‘গোবিন্দ’, হে লীলা পুরুষোত্তম পরম-পিতা পরমেশ্বর ভগবান ‘শ্রীকৃষ্ণ’, সুখ দিলে ঠিক ততটাই দিও যাতে মনে অহংকার জন্ম না নেয়, আর দুঃখ দিলেও ঠিক ততটাই দিও যেন তোমার উপর থেকে বিশ্বাস চলে না যায়।

মানুষ কেন “শ্রীকৃষ্ণই” যে ভগবান, সেটা বুঝতে পারে না? সেই সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীভগবান বলেছেন-

“অজেহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানীমীম্বরোহপি সন্।
প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া।।”
(চতুর্দশ-অধ্যায়-গুণত্রয়-বিভাগ-যোগ-৪/৬।।)

অনুবাদঃ যদিও আমি জন্মরহিত এবং আমার চিন্ময় দেহ অব্যয় এবং যদিও আমি সর্বভূতের ঈশ্বর, তবুও আমার অন্তরঙ্গা শক্তিকে আশ্রয় করে আমি আমার আদি চিন্ময় রূপে যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।

“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনং সৃজামহ্যম্।।”
(চতুর্দশ-অধ্যায়-গুণত্রয়-বিভাগ-যোগ-৪/৭।।)

অনুবাদঃ হে ভারত! যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখন আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হই।

“পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।”
(চতুর্দশ-অধ্যায়-গুণত্রয়-বিভাগ-যোগ-৪/৮।।)

অনুবাদঃ সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য এবং দুষ্কৃত কারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।

“জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।
ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন।।”
(চতুর্দশ-অধ্যায়-গুণত্রয়-বিভাগ-যোগ-৪/৯।।)

অনুবাদঃ হে অর্জুন! ‍যিনি আমার এই প্রকার দিব্য জন্ম ও কর্ম যথাযথভাবে জানেন, তাঁকে আর দেহত্যাগ করার পর পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হয় না, তিনি আমার নিত্য ধাম লাভ করেন।

“যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্।
মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।”
(চতুর্দশ-অধ্যায়-গুণত্রয়-বিভাগ-যোগ-৪/১১।।)

অনুবাদঃ যারা যেভাবে আমার প্রতি আত্মসমর্পণ করে, আমি তাদেরকে সেভাবেই পুরস্কৃত করি। হে পার্থ! সকলেই সর্বতোভাবে আমার পথ অনুসরণ করে।

“ভোক্তারং যজ্ঞতপসাং সর্বলোকমহেশ্বরম্।
সুহৃদং সর্বভূতানাং জ্ঞাত্বা মাং শান্তিমৃচ্ছতি।।”
(পঞ্চদশ-অধ্যায়-পুরুষোত্তম-যোগ- ৫/২৯।।)

অনুবাদঃ আমাকে সমস্ত যজ্ঞ ও তপস্যার পরম ভোক্তা, সর্বলোকের মহেশ্বর এবং সমস্ত জীবের সুহৃদরূপে জেনে যোগীরা জড় জগতের দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্ত হয়ে শান্তি লাভ করেন।

“মনুষ্যাণাং সহস্রেষু কশ্চিদ্ যততি সিদ্ধয়ে।
মততামপি সিদ্ধানাং কশ্চিন্মাং বেত্তি তত্ত্বতঃ।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-৭/৩)

অনুবাদঃ হাজার হাজার মানুষের মধ্যে কদাচিৎ কোন একজন সিদ্ধি লাভের জন্য যত্ন করেন, আর সেই প্রকার যত্নশীল সিদ্ধদের মধ্যে কদাচিৎ একজন আমাকে অর্থাৎ আমার ভগবৎ-স্বরূপকে তত্ত্বত অবগত হন।

“এতদযোনীনি ভূতানি সর্বাণীত্যুপধারয়।
অহং কৃৎস্নস্য জগতঃ প্রভবঃ প্রলয়স্তথা।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-৭/৬।।)

অনুবাদঃ আমার এই উভয় প্রকৃতি থেকে জড় ও চেতন সব কিছু উৎপন্ন হয়েছে। অতএব নিশ্চিতভাবে জেনে রেখো যে, আমিই সমস্ত জগতের উৎপত্তি ও প্রলয়ের মূল কারণ।

“মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয়।
ময়ি সর্বমিদং প্রোতং সূত্রে মণিগণা ইব।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-৭/৭।।)

অনুবাদঃ হে ধনঞ্জয়! আমার থেকে শ্রেষ্ঠ আর কেউ নেই। সূত্রে যেমন মণিসমূহ গাঁথা থাকে, তেমনই সমস্ত বিশ্বই আমাতে ওতঃপ্রোতভাবে অবস্থান করে।

“ন মাং দুষ্কৃতিনো মূঢ়াঃ প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ।
মায়য়াপহৃতজ্ঞানা আসুরং ভাবমাশ্রিতাঃ।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-৭/১৫)

অনুবাদঃ মূঢ়, নরাধম, মায়ার দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে এবং যারা আসুরিক ভাবসম্পন্ন, সেই সমস্ত দুস্কৃতকারীরা কখনও আমার শরণাগত হয় না।

“বহুনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্মং প্রপদ্যতে।
বাসুদেবঃ সর্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-৭/১৯)

অনুবাদঃ বহু জন্মের পর তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তি আমাকে সর্ব কারণের পরম কারণ রূপে জেনে আমার শরণাগত হন। সেইরূপ মহাত্মা অত্যন্ত দুর্লভ।

“যো যো যাং তনুং ভক্তঃ শ্রদ্ধয়ার্চিতুমিচ্ছতি।
তস্য তস্যাচলাং শ্রদ্ধাং তামেব বিদধাম্যহম্।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-৭/২১।।)

অনুবাদঃ পরমাত্মরূপে আমি সকলের হৃদয়ে বিরাজ করি। যখনই কেউ দেবতাদের পূজা করতে ইচ্ছা করে, তখনই আমি সেই সেই ভক্তের তাতেই অচলা শ্রদ্ধা বিধান করি।

“নাহং প্রকাশঃ সর্বস্য যোগমায়াসমাবৃতঃ।
মূঢ়োহয়ং নাভিজানাতি লোকো মামজমব্যয়ম্।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-৭/২৫)

অনুবাদঃ আমি মূঢ় ও বুদ্ধিহীন ব্যক্তিদের কাছে কখনও প্রকাশিত হই না। তাদের কাছে আমি আমার অন্তরঙ্গা শক্তি যোগমায়ার দ্বারা আবৃত থাকি। তাই, তাঁরা আমার অজ ও অব্যয় স্বরূপকে জানতে পারে না।

“অন্তকালে চ মামেব স্মরন্মুক্তা কলেবরম্।
যঃ প্রয়াতি স মদ্ভাবং যাতি নাস্ত্যত্র সংশয়ঃ।।”
(অষ্টম অধ্যায়-অক্ষরব্রহ্ম-যোগ-৮/৫।।)

অনুবাদঃ মৃত্যুর সময়ে যিনি আমাকে স্মরণ করে দেহত্যাগ করেন, তিনি তৎক্ষণাৎ আমার ভাবই প্রাপ্ত হন। এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

“যং যং বাপি স্মরন্ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্।
তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ।।”
(অষ্টম অধ্যায়-অক্ষরব্রহ্ম-যোগ-৮/৬।।)

অনুবাদঃ অন্তিমকালে যিনি যে ভাব স্মরণ করে দেহত্যাগ করেন, তিনি সেই ভাবে ভাবিত তত্ত্বকেই লাভ করেন।

“আব্রহ্মভুবনাল্লোকাঃ পুনরাবর্তিনোহর্জুন।
মামুপেত্য তু কৌন্তেয় পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।।”
(অষ্টম অধ্যায়-অক্ষরব্রহ্ম-যোগ-৮/১৬।।)

অনুুবাদঃ হে অর্জুন! এই ভুবন থেকে ব্রহ্মলোক পর্যন্ত সমস্ত লোকই পুনরাবর্তনশীল অর্থাৎ পুনর্জন্ম হয়। কিন্তু হে কৌন্তেয়! আমাকে প্রাপ্ত হলে আর পুনর্জন্ম হয় না।

“অহং হি সর্বযজ্ঞানাং ভোক্তা চ প্রভুরেব চ।
ন তু মামভিজানন্তি তত্ত্বেনাতশ্চ্যবন্তি তে।।”
(নবম অধ্যায়-রাজগুহ্য-যোগ-৯/২৪।।)

অনুবাদঃ আমিই সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা ও প্রভু। কিন্তু যারা আমার চিন্ময় স্বরূপ জানে না, তারা আবার সংসার সমুদ্রে অধঃপতিত হয়।

“অহমাত্মা গুড়াকেশ সর্বভূতাশয়স্থিতঃ।
অহমাদিশ্চ মধ্যং চ ভূতানামন্ত এব চ।।”
(দশম অধ্যায়-বিভূতি-যোগ১০/২০।।)

অনুবাদঃ হে গুড়াকেশ! আমিই সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থিত পরমাত্মা। আমিই সর্বভূতের আদি, মধ্য ও অন্ত।

“সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো
মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনং চ।
বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো
বেদান্তকৃদ্ বেদবিদেব চাহম্।।”
(পঞ্চদশ-অধ্যায়-পুরুষোত্তম-যোগ-১৫/১৫।।)

অনুবাদঃ আমি সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থিত এবং আমর থেকেই স্মৃতি, জ্ঞান ও বিলোপ হয়। আমিই সমস্ত বেদের জ্ঞাতব্য এবং আমিই বেদান্তকর্তা ও বেদবিৎ।

“দ্বাবিমৌ পুরুষৌ লোকে ক্ষরশ্চাক্ষর এব চ।
ক্ষরঃ সর্বাণি ভূতানি কূটস্থোহক্ষর উচ্যতে।।”
(পঞ্চদশ-অধ্যায়-পুরুষোত্তম-যোগ-১৫/১৬।।)

অনুবাদঃ ক্ষর ও অক্ষর দুই প্রকার জীব রয়েছে। এই জড় জগতের সমস্ত জীবকে ক্ষর এবং চিৎ-জগতের সমস্ত জীবকে অক্ষর বলা হয়।

“অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং চ সংশ্রিতাঃ।
মামাত্মপরদেহেষু প্রদ্বিষন্তোহভ্যসূয়কাঃ।।”
(ষোড়শ-অধ্যায়-দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ-১৬/১৮।)

অনুবাদঃ অহঙ্কার, বল, দর্প, কাম ও ক্রোধকে আশ্রয় করে অসুরেরা স্বীয় দেহে ও পরদেহে অবস্থিত পরমেশ্বর স্বরূপ আমাকে দ্বেষ করে এবং সাধুদের গুণেতে দোষারোপ করে।

“আসুরীং যোনিমাপন্না মূঢ়া জন্মনি জন্মনি।
মামপ্রাপ্যৈব কৌন্তেয় ততো যান্ত্যধমাং গতিম্।।”
(ষোড়শ-অধ্যায়-দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ-১৬/২০।)

অনুবাদঃ হে কৌন্তেয়! জন্মে জন্মে অসুরযোনি প্রাপ্ত হয়ে, সেই মূঢ় ব্যক্তিরা আমাকে লাভ করতে অক্ষম হয়ে তার থেকেও অধম গতি প্রাপ্ত হয়।

“শ্রীভগবানুবাচ
ত্রিবিধা ভবতি শ্রদ্ধা দেহিনাং সা স্বভাবজা।
সাত্ত্বিকী রাজসী চৈব তামসী চেতি তাং শৃণু।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-১৭/২।।)

অনুবাদঃ শ্রীভগবান বললেন-দেহীদের স্বভাব-জনিত শ্রদ্ধা তিন প্রকার- সাত্ত্বিকী, রাজসী ও তামসী। এখন সেই সম্বন্ধে শ্রবণ কর।

“যজন্তে সাত্ত্বিকা দেবান্ যক্ষরক্ষাংসি রাজসাঃ।
প্রেতান্ ভূতগণাংশ্চান্যে যজন্তে তামসা জনাঃ।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-১৭/৪।।)

অনুবাদঃ সাত্ত্বিক ব্যক্তিরা দেবতাদের পূজা করে, সাজসিক ব্যক্তিরা যক্ষ ও রাক্ষসদের পূজা করে এবং তামসিক ব্যক্তিরা ভূত ও প্রেতাত্মাদের পূজা করে।

“অশ্রদ্ধয়া হুতং দত্তং তপস্তপ্তং কৃতং চ যৎ।
অসদিত্যুচ্যতে পার্থ ন চ তৎ প্রেত্য নো ইহ।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-১৭/২৮।।)

অনুবাদঃ হে পার্থ! অশ্রদ্ধা সহকারে হোম, দান বা তপস্যা যা কিছু অনুষ্ঠিত হয়, তাকে বলা হয় ‘অসৎ’। সেই সমস্ত ক্রিয়া ইহলোকে ও পরলোকে ফলদায়ক হয় না।

“মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদযাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে।।”
(অষ্টাদশ অধ্যায়-মোক্ষযোগ-১৮/৬৫।।)

অনুবাদঃ তুমি আমাতে চিত্ত অর্পণ কর, আমর ভক্ত হও, আমার পূজা কর এবং আমাকে নমস্কার কর। তাহলে তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয় হবে।

“সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।”
(অষ্টাদশ অধ্যায়-মোক্ষযোগ১৮/৬৬।।)

অনুবাদঃ সর্ব প্রকার ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব। তুমি শোক করো না।

“যেখানে ব্রহ্মাজী, পরম বৈষ্ণব শিরোমণি মহাদেব বলছেন কৃষ্ণের আরাধনা করতে!”

“ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্।।”
(ব্রহ্মসংহিতা-৫/১)

অনুবাদঃ শ্রীকৃষ্ণ, যিনি গোবিন্দ নামেও পরিচিত, তিনি হচ্ছেন পরম ঈশ্বর। তাঁর রূপ সচ্চিদানন্দময় (নিত্য, জ্ঞানময় ও আনন্দময়)। তিনি হচ্ছেন সব কিছুর পরম উৎস। তাঁর কোন উৎস নেই, কেন না তিনি হচ্ছেন সমস্ত কারণের পরম কারণ ।

ভগবান নিজেও সর্বধর্ম পরিত্যাগ করে তাঁর শরণ নিতে বলছেন ১৮ অধ্যায়ের ৬৬ নাম্বার শ্লোকে।। আর আমরা সেই ভগবানকেই চিনতে পারছি না!!!

জন্মাষ্টমী ব্রত বা উপবাস পালন করার ফল, যা প্রত্যেকের জানা উচিত, এই বিষয় নিয়ে শাস্ত্রে অত্যন্ত মহিমান্বিত ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে-

১. পাপমোচন ও মুক্তি লাভঃ
“জন্মাষ্টমীর উপবাসে সমস্ত পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সন্দেহ নেই, ভক্ত বিষ্ণুলোকে গমন করেন।।”
— ভবিষ্যোত্তর পুরাণ, উত্তরখণ্ড, ১৪৪.২৪

জন্মাষ্টমীতে উপবাস করলে জীবনের সকল পাপ দূর হয় এবং ভগবান বিষ্ণুর চিরধামে স্থান লাভ হয়।।

২. জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন মুক্তিঃ
“যে ভক্ত জন্মাষ্টমীর দিনে ব্রত পালন করে, তার সমস্ত পাপ নাশ হয়। ভগবানের কৃপায় সে আর পুনর্জন্ম লাভ করে না।”
— স্কন্দ পুরাণ, বৈষ্ণবখণ্ড

এই ব্রত ভক্তকে জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি দিয়ে চিরশান্তি প্রদান করে।।

৩. ইচ্ছাপূরণ ও সৌভাগ্য লাভঃ
“যে ভক্তি সহকারে জন্মাষ্টমীর ব্রত পালন করে, ভগবান বিষ্ণু তার সমস্ত কামনা পূর্ণ করেন।।”
— পদ্ম পুরাণ, উত্তরখণ্ড

এই ব্রত জীবনের সব শুভ ইচ্ছা পূর্ণ করে এবং অটল সৌভাগ্য প্রদান করে।।

৪. ভগবৎপ্রেম বৃদ্ধি ও অন্তরের পবিত্রতাঃ
“উপবাসে জন্মানো পুণ্য হৃদয়কে শুদ্ধ করে এবং কৃষ্ণভক্তি বৃদ্ধি করে।।”
— নারদ পুরাণ, পূর্বখণ্ড

এই উপবাসে অন্তরের অপবিত্রতা দূর হয়, ভগবৎপ্রেম বৃদ্ধি পায় এবং কৃষ্ণস্মরণ সহজ হয়।।

৫.পরিবারের কল্যাণ ও রক্ষাকবচঃ
“যে ব্যক্তি জন্মাষ্টমীর ব্রত যথাযথভাবে পালন করে, সে নিজের এবং তার পরিবারের মঙ্গল নিশ্চিত করে এবং ভগবান বিষ্ণুর কৃপা লাভ করে।।” —গরুড় পুরাণ

এই ব্রত পালনকারী শুধু নিজের নয়, পূর্বপুরুষ ও পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করেন এবং সংসারের অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করে।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন লীলা কাহিনীঃ
ভগবদগীতায় শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন যে তাঁর জন্ম, কর্ম ইত্যাদি সবই দিব্য, এবং কেউ যখন তত্ত্বগতভাবে তা জানতে পারে, তখন তিনি ভগবদ্ধামে প্রবেশ করবার যোগ্যতা অর্জন করেন।

ভগবানের জন্ম একজন সাধারণ মানুষের মতো নয়। সাধারণ মানুষের জন্ম হয় কর্মফলের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে। কর্মের ফলস্বরূপ সে এক দেহ থেকে অন্য আরেক দেহে দেহান্তরিত হয়। ভগবানের জন্মের কথা বিশ্লেষণ করে ভগবদগীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে, তিনি তাঁর নিজের ইচ্ছার প্রভাবে আবির্ভূত হন। গ্রহ নক্ষত্রের শুভ স্থানে অবস্থান। যখন ভগবানের আবির্ভাবের সময় হল, তখন কাল সর্বগুণ সমন্বিত হয়ে পরম সুন্দর হয়ে উঠল। তখন পৃথিবী আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। তিথি, যোগ এবং নক্ষত্র তখন সর্বমঙ্গলময় এবং সর্বসুলক্ষণ যুক্ত হয়ে উঠল। সর্বসুলক্ষণযুক্তা রোহিণী নক্ষত্র তখন তুঙ্গে প্রকাশিত হল।

ব্রহ্মা স্বয়ং এই রোহিণী নক্ষত্রের পর্যবেক্ষণ করেন। জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে, নক্ষত্রের অবস্থান ছাড়াও বিভিন্ন গ্রহের অবস্থান ও প্রভাবের ফলে শুভ এবং অশুভ তিথি ও যোগ বিচার করা হয়। শ্রীকৃষ্ণের জন্মের সময় সমস্ত গ্রহগুলি সব সময় মঙ্গলময় অবস্থা এবং সব সময় শুভ ইঙ্গিত প্রদর্শন করে বিরাজ করতে লাগল।

তখন দশদিক শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠল। শুভ নক্ষত্রগুলি নভোমন্ডলে শোভা পেতে লাগল। নগর, গ্রাম, গোচারণভূমি এবং সকলের হৃদয়ে সব রকমের শুভ ইঙ্গিত দেখা যেতে লাগল। জলে পূর্ণ হয়ে নদনদী প্রবাহিত হতে লাগল, সরোবরগুলি বিকশিত পদ্মে পূর্ণ হয়ে শোভা পেতে লাগল।

বনভূমি নানা রকম সুন্দর সুন্দর পাখি ও ময়ুরপূর্ণ হয়ে উঠল। পাখিরা সুমধুর স্বরে গান গাইতে লাগল এবং সেই গানের ছন্দে ময়ুরেরা ময়ুরীদের সঙ্গে নাচতে শুরু করল। সুমধুর গন্ধ বহন করে বায়ু বইতে লাগল এবং শরীরের স্পর্শানুভূতি অত্যন্ত সুখকর বলে বোধ হতে লাগল।

ব্রাহ্মণেরা অনুভব করল যে, তাদের গৃহের পরিবেশ যজ্ঞানুষ্ঠানের অনুকুল হয়ে উঠেছে। আসুরিক রাজাদের অত্যাচারে যজ্ঞ অনুষ্ঠান তথন প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যজ্ঞের আগুন প্রায় নিভে গিয়েছিল, কিন্তু এখন তারা আবার প্রশান্ত চিত্তে আগুন জ্বালাতে সক্ষম হল।

যজ্ঞ অনুষ্ঠান করা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে ব্রাহ্মণেরা অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়েছিল, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের সময় তাদের চিত্ত প্রসন্ন হয়ে উঠল, কেননা তারা নভোমন্ডলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবসূচক দিব্য শব্দতরঙ্গ শুনতে পেল।

গন্ধর্ব এবং কিন্নরেরা সুমধুর সুরে গান গাইতে লাগল এবং সিদ্ধ ও চারণেরা ভগবানের গুণকীর্তন করে তাঁর স্তব করতে লাগল। স্বর্গলোকে দেবতারা তাঁদের সহচরী এবং অস্পরাদের সঙ্গে সুললিত ছন্দে নৃত্য করতে লাগলেন। দেবতারা এবং মুনিঋষিরা পুষ্পবর্ষণ করতে লাগলেন। সমুদ্রের উপকূলে তরঙ্গের মৃদু মৃদু শব্দ হতে লাগল এবং সমুদ্রের উপরে সুমধুর মেঘগর্জন হতে লাগল।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চতুর্ভুজ রূপে আবির্ভাব। তখন ভগবান বিষ্ণু, যিনি সকলের হৃদয়ে বিরাজ করেন, তিনি রাতের গভীর অন্ধকারে পরমেশ্বর ভগবানরূপে দেবকীর সম্মুকে আবির্ভূত হলেন। পূর্ণচন্দ্র যেভাবে পূর্বদিগন্তে উদিত হয়, ঠিক তেমন ভাবেই পরমেশ্বর ভগবান আবির্ভূত হলেন।

কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, অষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়েছিল তা হলে পূর্ণচন্দ্রের উদয় হল কি করে? এর অর্থ উত্তরে বলা হয়েছে যে, শ্রীকৃষ্ণ চন্দ্রবংশে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাই চন্দ্র সেই রাত্রে অপূর্ণ থাকলেও সেই বংশে ভগবানের আবির্ভাবের জন্য আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে সেদিন পূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন।

খমাণিক্য নামক জ্যোতিষ শাস্ত্রগ্রন্থে ভগবানের আবির্ভাব সময়কালীন গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান খুব সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে প্রমাণ করা হয়েছে যে, এই শুভ মুহূর্তে যে শিশুটির জন্ম হল, তিনি হচ্ছেন পরম-ব্রহ্ম।

বসুদেব দেখলেন যে, সেই অদ্ভুত শিশুটি চতুর্ভুজ। তিনি তাঁর চার হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম ধারণ করে আছেন। বক্ষে তাঁর শ্রীবৎস চিহ্ন, কন্ঠে তাঁর কৌস্তভ শোভিত কন্ঠহার, পরনে তাঁর পীতবসন, উজ্জ্বল মেঘের মতো তাঁর গায়ের রঙ, বৈদুর্য মণিভূষিত কিরীট তাঁর মস্তকে শোভা পাচ্ছে, নানা রকম মহামূল্য মণি-রত্ন শোভিত সমস্ত অলঙ্কার তাঁর দিব্য দেহে শোভা পাচ্ছে, তাঁর মাথা ভর্তি কুঞ্চিত কালো কেশরাশি।

এই অদ্ভুত শিশুটিকে দেখে বসুদেব অত্যন্ত আশ্চর্য হলেন। তিনি ভাবলেন কিভাবে একটি নবজাত শিশু এই রকম সমস্ত অলঙ্কারে ভূষিত হল? তাই তিনি বুঝতে পারলেনম যে, শ্রীকৃষ্ণই তাঁর পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছেন।

তিনি তখন অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। বসুদেব তখন ভাবতে লাগলেন, যদিও তিনি একজন সাধারণ মানুষ এবং বাহ্যিক দিক দিয়ে কংসের কারাগারে আবদ্ধ, তবুও পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণু তাঁর স্বরূপ ধারণ করে তাঁর সন্তানরূপে আবির্ভুত হয়েছেন।

কোনও মনুষ্যশিশু এইভাবে চতুর্ভুজ রূপ নিয়ে অলঙ্কার এবং সব রকম দিব্য সাজে সজ্জিত হয়ে এবং পরমেশ্বর ভগবানের সমস্ত লক্ষণগুলি যুক্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করে না।

বসুদেব বারবার সেই শিশু সন্তানটির দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন এবং ভাবতে লাগলেন কিভাবে তাঁর এই পরম সৌভাগ্যের মুহুর্তটি তিনি উদযাপন করবেন। তিনি ভাবলেন, “সাধারণত যখন পুত্রসন্তানের জন্ম হয়, মানুষ তখন মহোৎসব করে, আর পরমেশ্বর ভগবান আজ আমার গৃহে আমার সন্তানরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। কত মহা আড়ম্বরে আমার এই উৎসব পালন করা উচিত।”

বসুদেব, যাঁর আরেক নাম আনকদুন্দুভি, যখন তাঁর নবজাত শিশুটির দিকে তাখিয়ে দেখলেন, তখন তাঁর হৃদয়ে আনন্দে এত উৎফুল্ল হয়ে উঠল যে, তিনি তখন নানা অলঙ্কারে ভূষিত হাজার হাজার গাভী ব্রাহ্মণদের দান করতে ইচ্ছা করলেন।

বৈদিক প্রথা অনুসারে যখন ক্ষত্রিয় রাজার প্রসাদে কোন শুভ অনুষ্ঠান হয়, রাজা তখন নানা রকম সম্পদ দান করেন। বিশেষ করে ব্রাহ্মণ এবং মুনি-ঋষিদের তাঁরা স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত গাভী দান করেন।

শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি উদযাপন করতে বসুদেবও দান করতে ইচ্ছা করলেন। কিন্তু যেহেতু তিনি কংসের কারাগারে শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিলেন, তাই তাঁর পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। তাই মনে মনে তিনি ব্রাহ্মণদের হাজার হাজার গাভী দান করলেন।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে বসুদেবের প্রার্থনা বসুদেবের মনে আর যখন কোন সংশয় রইল না যে, এই নবজাত শিশুটিই হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, তখন তিনি করজোড়ে প্রণিপাত করে তাঁর বন্দনা করতে শুরু করলেন। বসুদেব তখন চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং তিনি সম্পূর্ণভাবে কংসের ভয় থেকে মুক্ত হলেন। সেই শিশুটির অঙ্গকান্তিতে সেই ঘর উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।

বসুদেব তখন প্রার্থনা করতে লাগলেন, “হে প্রিয় প্রভু, আমি জানি আপনি কে। আপনিই হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, সমস্ত জীবের পরমাত্মা এবং সত্য। আপনি আপনার নিত্য স্বরূপ নিয়ে আবির্ভুত হয়েছেন, যা আমি এখন সরাসরিভাবে প্রত্যক্ষ করতে পারছি।

আমি বুঝতে পারছি যে, যেহেতু আমি কংসের ভয়ে ভীত, তাই সেই ভয় থেকে আমাকে উদ্ধার করার জন্য আপনি আবির্ভূত হয়েছেন। আপনি এই প্রকৃতির অতীত; আপনিই হচ্ছেন সেই পরম পুরুষ, যিনি মায়ার প্রতি দৃষ্টিপাত করে এই জড় জগৎকে প্রকাশিত করেন।

কেউ তর্ক করতে পারে যে, পরমেশ্বর ভগবান, যিনি কেবলমাত্র দৃষ্টিপাত করার মাধ্যমে সমস্ত জড় সৃষ্টিকে প্রকাশিত করেন, তাঁর পক্ষে বসুদেবের পত্মী দেবকীর গর্ভে আবির্ভূত হওয়া কি করে সম্ভব! সেই সন্দেহ দূর করার জন্য বসুদেব বললেন, “হে প্রিয় ভগবান, আপনি যে দেবকীর গর্ভে আবির্ভূত হয়েছেন এটা তেমন কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়। কেননা এই জড় সৃষ্টিও অনেকটা সেই ভাবেই প্রকাশিত হয়েছে।

আপনি মহাবিষ্ণুরূপে কারণসমুদ্রে শয়ন করে আছেন এবং আপনার নিঃশ্বাসের প্রভাবে অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ড প্রকাশিত হচ্ছে। তারপর গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণরূপে আপনি প্রতিটি ব্রহ্মান্ডে প্রবিষ্ট হয়েছেন।

তারপর আবার আপনি নিজেকে ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণুরূপে প্রকাশ করে সমস্ত জীবের হৃদয়ে প্রবেশ করছেন, এমন কি প্রতিটি পরমাণুর মধ্যেও আপনি নিজেকে প্রকাশ করছেন, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। যদিও মনে হচ্ছে যে, আপনি দেবকীর গর্ভে প্রবেশ করছেন, কিন্তু তা হলেও আপনি সর্বব্যাপ্ত।

জড় দৃষ্টান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আপনার প্রবেশ এবং সর্বব্যাপ্তি উপলব্ধি করতে পারি না। ১৬টি উপাদানে বিভক্ত হওয়ার পরেও জড়া প্রকৃতি অবিকৃতই থেকে যায়। জড় শরীর মাটি, জল, আগুন, বায়ু ও আকাশ-এই পঞ্চ মহাভূতের সমন্বয় মাত্র।

জড় শরীর দেখলেই মনে হয় যেন এই উপাদানগুলি নতুন সৃষ্টি করা হয়েছে, কিন্তু সেউ উপাদনগুলি দেহের বাইরে সব সময়েই রয়েছে। তেমনই, যদিও আপনি একটি শিশুরূপে দেবকীর গর্ভে আবির্ভূত হয়েছেন, তবুও আপনি বাইরেও বিরাজ করছেন। আপনি সব সময়ই আপনার ধামে বিরাজ করতে পারেন।

“গভীর বুদ্ধিমত্তা সহকারে আপনার আবির্ভাবের তত্ত্ব উপলব্ধি করতে হয়, কেননা জড়া প্রকৃতিও আপনার থেকেই উদ্ভুত হয়েছে। সূর্য যেমন সূর্যকিরণের উৎস, আপনিও তেমনই জড়া প্রকৃতির আদি উৎস। সুর্যকিরণ কখনও সূর্যমন্ডলকে আচ্ছাদিত করতে পারে না।

ঠিক তেমনই আপনার থেকে উদ্ভুত হওয়ার ফলে জড়া প্রকৃতি কখনও আপনাকে আবৃত্ত করতে পারে না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যেন আপনি জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা প্রভাবিত, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জড়া প্রকৃতির গুণ কখনই আপনাকে প্রভাবিত করতে পারে না।

গভীর বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন দার্শনিকেরা তা বুঝতে পারেন। পক্ষান্তরে বলা যায় যে, যদিও মনে হয় যে, আপনি এই জড়া প্রকৃতিতে রয়েছেন, তবুও আপনি কখনও তার দ্বারা আচ্ছাদিত হন না।”

বৈদিক শাস্ত্র থেকে আমরা জানতে পরি যে, পরমব্রক্ষের দেহ-নির্গত রশ্মিচ্ছটার প্রভাবে সব কিছু প্রকাশিত হয়। ব্রহ্মসংহিতা থেকে আমরা জানতে পারি যে, ব্রহ্মজ্যোতি হচ্ছে ভগবানের দেহ-নির্গত রশ্মিচ্ছটা, এবং ব্রহ্মজ্যোতি থেকে সব কিছুর সৃষ্টি হয়। ভগবদগীতাতে আরও বলা হয়েছে যে, পরমেশ্বর ভগবানই হচ্ছেন ব্রহ্মজ্যোতির উৎস। প্রকৃতপক্ষে তিনিই হচ্ছেন সব কিছুর মূল কারণ। কিন্তু অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা মনে করে যে, পরমেশ্বর ভগবান যখন এই জড় জগতে আবির্ভূত হন, তখন তিনি জড় গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েন। এই ধরনের সিদ্ধান্ত যারা করে, তারা অত্যন্ত মুর্খ, ভগবান সম্বন্ধে তাদের কোন জ্ঞানই নেই।

পরমেশ্বর ভগবান প্রত্যক্ষভাবে এবং পরোক্ষভাবে সর্বত্রই বিরাজ করেন। তিনি কেবল গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুরূপেই এই জড় সৃষ্টির অন্তরেও বিরাজ করেন তা নয়, তিনি প্রতিটি পরমাণুর মধ্যেও বিরাজ করছেন। তিনি আছেন বলেই সব কিছুর অস্তিত্ব আছে। তাঁকে ছাড়া কোন কিছুরই অস্তিত্ব থাকতে পারে না। বৈদিক শাস্ত্রে আমরা দেখতে পাই যে, পরমাত্মা থেকে স্বতন্ত্র হয়ে কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই। তাই এই জড়া প্রকৃতিও তাঁরই শক্তির প্রকাশ। জড় পদার্থ এবং চিন্ময় আত্মা উভয়েই তাঁর থেকে উদ্ভত হয়েছে। মূর্খ লোকেরাই কেবল মনে করে যে, পরমেশ্বর ভগবান যখন আবির্ভূত হন, তখন তিনি জড়া প্রকৃতির দ্বারা প্রভাবিত হন।

তিনি একটি জড় শরীর গ্রহণ করছেন বলে মনে হলেও তিনি কখনই জড়া প্রকৃতির অধীন হন না। শ্রীকৃষ্ণ তাই আবির্ভূত হয়ে পরমেশ্বর ভগবানের আবির্ভাব এবং অপ্রকট সম্বন্ধীয় সব কটি ভ্রান্ত মতবাদকে পরাস্ত করলেন।

“হে প্রভু, আপনার আবির্ভাব, অবস্থান এবং অপ্রকট লীলা জড় জগতের সব কটি গুণের সমস্ত প্রভাবের অতীত, যেহেতু আপনিই হচ্ছেন সব কিছুর নিয়ন্তা এবং পরমব্রহ্মের আশ্রয়, তাই আপনার পক্ষে অসম্ভব কিছুই নয় এবং কিছুই আপনাতে বিসদৃশ নয়। একজন সরকারী কর্মচারী যেমন রাষ্ট্রপ্রধানের অধীন কাজ করেন, জড়া প্রকৃতিও ঠিক তেমনই আপনার তত্ত্বাবধানে কাজ করেন। তাই আপনার পক্ষে কারো অধীনস্থ হওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না, পরব্রহ্ম এবং সব কিছুই আপনাকে আশ্রয় করে আছে এবং জড়া প্রকৃতির সমস্ত কার্যকলাপ আপনার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

“আপনাকে ‘শুক্লম্’ বলে সম্বোধন করা হয়। ‘শুক্লম্’ বা সাদা হচ্ছেন পরমেশ্বর সত্যস্বরূপ আপনার এক প্রতীক মাত্র। কেননা আপনি জড়জাগতিক গুণের দ্বারা প্রভবিত হন না। ব্রহ্মাকে ‘রক্ত’ বলা হয়, কেননা তিনি সৃজনাত্মকরূপে রজোগুণের অধিকারী, আর তমোগুণ শিবের অধীন, কেননা তিনিই সমস্ত সৃষ্টির সংহার করেন। সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয় আপনার দ্বারাই সম্পাদিত হয়, কিন্তু তবুও আপনি সেই সমস্ত গুণের অতীত।” বেদে বিহিত হয়েছে, “হরির্হিনির্গুণসাক্ষাৎ”- পরমেশ্বর ভগবান সর্বদাই জড়জাগতিক গুণের অতীত। সেখানে আরও বলা হয়েছে যে, পরমেশ্বর ভগবানে তমো ও রজোগুণের কোন রকম অস্তিত্ব নেই।

“হে প্রভু! আপনিই হচ্ছেন পরম নিয়ন্তা পরমেশ্বর ভগবান পরম ব্রহ্ম। আপনিই সমস্ত সৃষ্টি পরিচালনা করেন। পরম নিয়ন্তা হওয়া সত্ত্বেও আপনি কৃপা করে আমার গৃহে অবতরণ করেছেন এবং আপনার অবতরণের কারণ হচ্ছে সেই সমস্ত অসুরদের সংহার করা, যারা রাজবেশ ধারণ করে পৃথিবীর উপর রাজত্ব করছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা হচ্ছে অসুর। আপনি যে তাদের এবং তাদের সমস্ত অনুচরদের সংহার করবেন, সেই সম্বন্ধে আমার কোন সন্দেহ নেই।

“আমি জানি যে, বর্বর কংস ও তার দুরাচারী সঙ্গীদের সংহার করবার জন্য আপনি অবতরণ করেছেন। কিন্তু আপনি যে তাকে এবং তার অনুচরদের সংহার করাবার জন্য অবতরণ করবেন, সেই কথা জানতে পেরে কংস আপনার পূর্বজাত বড় ভাইদের হত্যা করেছে। এখন সে কেবল আপনার জন্ম সংবাদের প্রতীক্ষা করছে। যখনই সেই সংবাদ সে পাবে, তখনই সে আপনাকে হত্যার জন্য সশস্ত্র উপস্থিত হবে।”

মাতা দেবকীর শ্রীকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনাঃ
বসুদেবের এই প্রার্থনার পর, শ্রীকৃষ্ণের মাতা দেবকী প্রার্থনা করতে শুরু করলেন। তাঁর ভাই কংসের অত্যাচারে তিনি অত্যন্ত ভীত ছিলেন। দেবকী বললেন, “প্রিয় প্রভু! নারায়ণ, রাম, শেষ, বরাহ, নৃসিংহ, বামন; বলদেব এবং এই রকম কোটি কোটি অবতারের।

Please Share This Post in Your Social Media

শালিখায় শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও দু’টি কথা

আপডেট: ০৮:১৫:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৫

লক্ষণ কুমার মন্ডল, শালিখা মাগুরা প্রতিনিধিঃ
মাগুরার শালিখায় শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব (৫২৫১তম) তিথি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করেন, উপজেলা আড়পাড়া কেন্দ্রীয় মন্দিরের সার্বজনীন জন্মাষ্টমী উদযাপন কমিটি। ভাদ্র মাসের রোদের উত্তাপ উপেক্ষা করে এসময় রাস্তার দুধারে অসংখ্য মানুষ তা উপভোগ করেন। এসময় সনাতন নারীরা উলুধ্বনি দিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা কে স্বাগত জানায়।

শঙ্খ ধ্বনি, ঢাকঢোলের বাদ্য বাজনা নিয়ে উৎসবমুখর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় অংশ নেন সনাতন ধর্ম অবলম্বীরা। শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষের সরব অংশ গ্রহণ দেখে মনে হয়েছে, যেন কৃষ্ণ প্রেমের এক অদৃশ্য টানে ছুটে চলেছেন তারা শেকড়ের সন্ধানে।

রবিবার (১৭ আগষ্ট) বিকাল ৩ টায় উপজেলা কেন্দ্রীয় মন্দির প্রাঙ্গনে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাটি হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে পরিণত হয় মিলনমেলায়। বিভিন্ন সাজে সজ্জিত কৃষ্ণ ভক্তরা নেচে গেয়ে বাদ্য বাজনা বাজিয়ে উপজেলা সদর আড়পাড়া বাজারের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। পরে কেন্দ্রীয় মন্দির প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

উপজেলা কেন্দ্রীয় মন্দিরের ভক্তবৃন্দ অপরুপ সাহা জানান, শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে দিনটি উদযাপন করেন।ও এই দিন ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের সান্নিধ্য লাভের আশায় ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে মন্দির ও বাসাবাড়িতে নানান রকম ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করেন।ও দেবকীর বিয়ের পর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাবণ একটি দৈববাণীর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের হাতে তার মৃত্যু হবে। এই কথা শুনে তিনি দেবকী ও বসুদেবকে কারারুদ্ধ করেন এবং তাদের প্রথম ছয় পুত্রকে হত্যা করেন। দেবকী তার সপ্তম গর্ভ রোহিণীকে প্রদান করলে, বলরামের জন্ম হয়। কিন্তু জন্ম কালীন সময় জগতের বিশ্বময় আকাশ মেঘে আচ্ছন্ন ও বিদ্যুৎ চমকায়,বৃষ্টির প্লাবন পৃথিবীর বুকে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে এরই মাঝে কৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন, মানবজাতির জন্য যেন একটা অলৌকিক বার্তা পৃথিবীর বুকে এসেছে। তিনি বলেন হিন্দু পুরাণ অনুসারে, আনুমান আজ থেকে প্রায় ৫ হাজার ২ শ বছর পূর্বে, দাপর যুগে যখন রাজা কংসের অত্যাচারে চারিদিকে অরাজকতা, নৃসংশতা, নিপীড়নে মানুষ জর্জরিত, সে সময়ে বাসুদেব ও দেবকীর ঘরে ভূমিষ্ট হন শ্রীকৃষ্ণ সেই থেকে প্রতিবছর এই তিথিতে কৃষ্ণ জন্মোৎসব পালিত হয়। এটি কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী নামে পরিচিত।

জন্মাষ্টমী কি?
“”””””””””””””””””””
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তিথিকে জন্মাষ্টমী বলা হয়।

জন্মাষ্টমীর উপবাস করতে হয় কেন?
“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী ব্রতদিন নির্ণয় করতে গিয়ে শাস্ত্রে বলা হয়েছে:

“কৃষ্ণোপাস্যাষ্টমী ভাদ্রে রোহিণ্যাঢ্যা মহাফলা।
নিশীথেহত্রাপি কিঞ্চেন্দৌজ্ঞে বাপি নবমীযুতা”॥

অর্থাৎ, ভাদ্রমাসে কৃষ্ণাষ্টমী উপবাস যোগ্যা। রোহিণী নক্ষত্রযুক্তা হলে আরও অধিক ফলপ্রদা। আর নবমী তিথি সংযুক্তা হলে আরও অধিক ফলপ্রদা হয়।
অর্থাৎ নবমী তিথি যুক্ত জন্মাষ্টমী অধিক শ্রেষ্ঠ। অন্যদিকে পূর্বতিথি সপ্তমী বিদ্ধা জন্মাষ্টমী সর্বদা ত্যজ্য।

পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে:
“পঞ্চগব্যং যথা শুদ্ধং ন গ্রাহ্যং মদ্যসঙযুক্তম্।
রবিবিদ্ধা তথা ত্যজ্যা রোহিণী সহিতা যদি”॥

অনুবাদঃ যদিও পঞ্চগব্য পবিত্র, কিন্তু এতে মদ মিশলে আর তা গ্রহণযোগ্য থাকেনা, তেমনিভাবে রোহিণী নক্ষত্র সংযুক্তা হলেও সপ্তমীবিদ্ধা অষ্টমী গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, সপ্তমী তিথি থাকার দরুন ঐ দিন অষ্টমী হলেও তা জন্মাষ্টমী নয়।

একই কারণে এই বছর ১৫ আগস্ট অষ্টমী তিথির সঙ্গে সপ্তমী তিথি সংযুক্ত থাকায় তা প্রকৃত অর্থে জন্মাষ্টমী নয়। এজন্য ১৬ আগস্ট জন্মাষ্টমী পালন করা কর্তব্য হয় (২০২৫) এ বছরের জন্য।

কিভাবে জন্মাষ্টমীর উপবাস পালন করতে হয় ?
“””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
১) আগের দিন শুক্রবার রাত ১২ টার আগে অন্ন প্রসাদ পাবেন। ঘুমানোর আগে ব্রাশ করে ঘুমাতে হবে।

২) পরের দিন শনিবার সকাল থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত উপবাস এবং জাগরণ। উপবাস থেকে হরিনাম জপ, কৃষ্ণ লীলা শ্রবন, ভগবানকে দর্শন, ভক্ত সঙ্গে হরিনাম কীর্তন,, অভিষেক দর্শন করতে হবে এবং ভগবানকে অভিষেক করে একাদশীর দিনের মতো অনুকল্প প্রসাদ সেবন করতে হবে।

৩) আর যাদের উপবাস পালনে সমস্যা, অসুস্থ, তারা অবশ্যই দুপুর ১২টার পরে, কৃষ্ণের কাছে ক্ষমা চেয়ে, একটু দুধ, বা ফল খেতে পারবেন।

৪) পরের দিন সকালে স্নান করা শেষে ৭টা থেকে ৮ টার মধ্যে কৃষ্ণ প্রসাদ দিয়ে পারন করবেন।

২০২৫ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কততম জন্মাষ্টমী?
**************************************
২০২৫ ইং সালের জন্মাষ্টমী পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫১ তম শুভ জন্মাষ্টমী। কারণ, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ১২৫ বছর প্রকট লীলাবিলাস করেন। ১২৫ বছর ধরাধামে অবস্থান করে গোলকে গমন করেন। মাঘ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ইহধাম ত্যাগ করে অন্তর্ধান করেন। সেই দিনই কলি প্রবেশ করেছে, সেই দিন ছিল শুক্রবার। খ্রীষ্টপূর্ব ৩১০১ এ কলিযুগ আরম্ভ হয়। বর্তমান ২০২৫ খ্রীষ্টাব্দ, তাহলে কলির বয়স ৩১০১+২০২৫ = ৫১২৬ বছর। শ্রীকৃষ্ণের অর্ন্তধানের দিন কলির আবির্ভাব। শ্রীকৃষ্ণ ১২৫ বছর প্রকট লীলা করেছেন। তাহলে শ্রীকৃষ্ণের আর্বিভাব ৫১২৬+১২৫ = ৫২৫১ বছর পূর্বে হয়েছিল। অর্থাৎ ২০২৫ ইংরেজি সালের মাঘী পূর্ণিমা থেকে ৫২৫১ বছর পূর্বে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়।

শাস্ত্রে আছে কেউ যদি একবার শ্রীকৃষ্ণের এই জন্মাষ্টমীর উপবাস পালন করে তা হলে তাকে আর এই জড় জগতে জন্ম, মৃত্যু, জড়া, ব্যাধি, ভোগ করতে হয় না, ও পূর্নজন্ম গ্রহন করতে হয় না। তাই সকলে শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫১ তম জন্মাষ্টমী পালন করে মানব জীবনটাকে পুন্যময় করে তুলুন।।

লীলা পুরুষোত্তম পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫১ তম শুভ আবির্ভাব তিথি জন্মাষ্টমী মহোৎসব ২০২৫ সকলের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ এবং শান্তি এই প্রার্থনা পরম পিতা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রী চরণ কমলে করছি। সকলের জীবন হোক কৃষ্ণময়।

শ্রীকৃষ্ণ বিশ্বসৃষ্টির প্রয়োজনে ব্রহ্মা (রজোগুণ), বিষ্ণু (সত্ত্বগুণ) ও শিবের (তমোগুণ) দ্বারা যথাক্রমে বিশ্ব সৃষ্টি, পালন ও ধ্বংস করেন। জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণ সৃষ্টি করেও ভগবান জড়া প্রকৃতির অতীত।

হে ‘গোবিন্দ’, হে লীলা পুরুষোত্তম পরম-পিতা পরমেশ্বর ভগবান ‘শ্রীকৃষ্ণ’, সুখ দিলে ঠিক ততটাই দিও যাতে মনে অহংকার জন্ম না নেয়, আর দুঃখ দিলেও ঠিক ততটাই দিও যেন তোমার উপর থেকে বিশ্বাস চলে না যায়।

মানুষ কেন “শ্রীকৃষ্ণই” যে ভগবান, সেটা বুঝতে পারে না? সেই সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীভগবান বলেছেন-

“অজেহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানীমীম্বরোহপি সন্।
প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া।।”
(চতুর্দশ-অধ্যায়-গুণত্রয়-বিভাগ-যোগ-৪/৬।।)

অনুবাদঃ যদিও আমি জন্মরহিত এবং আমার চিন্ময় দেহ অব্যয় এবং যদিও আমি সর্বভূতের ঈশ্বর, তবুও আমার অন্তরঙ্গা শক্তিকে আশ্রয় করে আমি আমার আদি চিন্ময় রূপে যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।

“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনং সৃজামহ্যম্।।”
(চতুর্দশ-অধ্যায়-গুণত্রয়-বিভাগ-যোগ-৪/৭।।)

অনুবাদঃ হে ভারত! যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখন আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হই।

“পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।”
(চতুর্দশ-অধ্যায়-গুণত্রয়-বিভাগ-যোগ-৪/৮।।)

অনুবাদঃ সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য এবং দুষ্কৃত কারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।

“জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।
ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন।।”
(চতুর্দশ-অধ্যায়-গুণত্রয়-বিভাগ-যোগ-৪/৯।।)

অনুবাদঃ হে অর্জুন! ‍যিনি আমার এই প্রকার দিব্য জন্ম ও কর্ম যথাযথভাবে জানেন, তাঁকে আর দেহত্যাগ করার পর পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হয় না, তিনি আমার নিত্য ধাম লাভ করেন।

“যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্।
মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।”
(চতুর্দশ-অধ্যায়-গুণত্রয়-বিভাগ-যোগ-৪/১১।।)

অনুবাদঃ যারা যেভাবে আমার প্রতি আত্মসমর্পণ করে, আমি তাদেরকে সেভাবেই পুরস্কৃত করি। হে পার্থ! সকলেই সর্বতোভাবে আমার পথ অনুসরণ করে।

“ভোক্তারং যজ্ঞতপসাং সর্বলোকমহেশ্বরম্।
সুহৃদং সর্বভূতানাং জ্ঞাত্বা মাং শান্তিমৃচ্ছতি।।”
(পঞ্চদশ-অধ্যায়-পুরুষোত্তম-যোগ- ৫/২৯।।)

অনুবাদঃ আমাকে সমস্ত যজ্ঞ ও তপস্যার পরম ভোক্তা, সর্বলোকের মহেশ্বর এবং সমস্ত জীবের সুহৃদরূপে জেনে যোগীরা জড় জগতের দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্ত হয়ে শান্তি লাভ করেন।

“মনুষ্যাণাং সহস্রেষু কশ্চিদ্ যততি সিদ্ধয়ে।
মততামপি সিদ্ধানাং কশ্চিন্মাং বেত্তি তত্ত্বতঃ।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-৭/৩)

অনুবাদঃ হাজার হাজার মানুষের মধ্যে কদাচিৎ কোন একজন সিদ্ধি লাভের জন্য যত্ন করেন, আর সেই প্রকার যত্নশীল সিদ্ধদের মধ্যে কদাচিৎ একজন আমাকে অর্থাৎ আমার ভগবৎ-স্বরূপকে তত্ত্বত অবগত হন।

“এতদযোনীনি ভূতানি সর্বাণীত্যুপধারয়।
অহং কৃৎস্নস্য জগতঃ প্রভবঃ প্রলয়স্তথা।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-৭/৬।।)

অনুবাদঃ আমার এই উভয় প্রকৃতি থেকে জড় ও চেতন সব কিছু উৎপন্ন হয়েছে। অতএব নিশ্চিতভাবে জেনে রেখো যে, আমিই সমস্ত জগতের উৎপত্তি ও প্রলয়ের মূল কারণ।

“মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয়।
ময়ি সর্বমিদং প্রোতং সূত্রে মণিগণা ইব।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-৭/৭।।)

অনুবাদঃ হে ধনঞ্জয়! আমার থেকে শ্রেষ্ঠ আর কেউ নেই। সূত্রে যেমন মণিসমূহ গাঁথা থাকে, তেমনই সমস্ত বিশ্বই আমাতে ওতঃপ্রোতভাবে অবস্থান করে।

“ন মাং দুষ্কৃতিনো মূঢ়াঃ প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ।
মায়য়াপহৃতজ্ঞানা আসুরং ভাবমাশ্রিতাঃ।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-৭/১৫)

অনুবাদঃ মূঢ়, নরাধম, মায়ার দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে এবং যারা আসুরিক ভাবসম্পন্ন, সেই সমস্ত দুস্কৃতকারীরা কখনও আমার শরণাগত হয় না।

“বহুনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্মং প্রপদ্যতে।
বাসুদেবঃ সর্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-৭/১৯)

অনুবাদঃ বহু জন্মের পর তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তি আমাকে সর্ব কারণের পরম কারণ রূপে জেনে আমার শরণাগত হন। সেইরূপ মহাত্মা অত্যন্ত দুর্লভ।

“যো যো যাং তনুং ভক্তঃ শ্রদ্ধয়ার্চিতুমিচ্ছতি।
তস্য তস্যাচলাং শ্রদ্ধাং তামেব বিদধাম্যহম্।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-৭/২১।।)

অনুবাদঃ পরমাত্মরূপে আমি সকলের হৃদয়ে বিরাজ করি। যখনই কেউ দেবতাদের পূজা করতে ইচ্ছা করে, তখনই আমি সেই সেই ভক্তের তাতেই অচলা শ্রদ্ধা বিধান করি।

“নাহং প্রকাশঃ সর্বস্য যোগমায়াসমাবৃতঃ।
মূঢ়োহয়ং নাভিজানাতি লোকো মামজমব্যয়ম্।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-৭/২৫)

অনুবাদঃ আমি মূঢ় ও বুদ্ধিহীন ব্যক্তিদের কাছে কখনও প্রকাশিত হই না। তাদের কাছে আমি আমার অন্তরঙ্গা শক্তি যোগমায়ার দ্বারা আবৃত থাকি। তাই, তাঁরা আমার অজ ও অব্যয় স্বরূপকে জানতে পারে না।

“অন্তকালে চ মামেব স্মরন্মুক্তা কলেবরম্।
যঃ প্রয়াতি স মদ্ভাবং যাতি নাস্ত্যত্র সংশয়ঃ।।”
(অষ্টম অধ্যায়-অক্ষরব্রহ্ম-যোগ-৮/৫।।)

অনুবাদঃ মৃত্যুর সময়ে যিনি আমাকে স্মরণ করে দেহত্যাগ করেন, তিনি তৎক্ষণাৎ আমার ভাবই প্রাপ্ত হন। এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

“যং যং বাপি স্মরন্ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্।
তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ।।”
(অষ্টম অধ্যায়-অক্ষরব্রহ্ম-যোগ-৮/৬।।)

অনুবাদঃ অন্তিমকালে যিনি যে ভাব স্মরণ করে দেহত্যাগ করেন, তিনি সেই ভাবে ভাবিত তত্ত্বকেই লাভ করেন।

“আব্রহ্মভুবনাল্লোকাঃ পুনরাবর্তিনোহর্জুন।
মামুপেত্য তু কৌন্তেয় পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।।”
(অষ্টম অধ্যায়-অক্ষরব্রহ্ম-যোগ-৮/১৬।।)

অনুুবাদঃ হে অর্জুন! এই ভুবন থেকে ব্রহ্মলোক পর্যন্ত সমস্ত লোকই পুনরাবর্তনশীল অর্থাৎ পুনর্জন্ম হয়। কিন্তু হে কৌন্তেয়! আমাকে প্রাপ্ত হলে আর পুনর্জন্ম হয় না।

“অহং হি সর্বযজ্ঞানাং ভোক্তা চ প্রভুরেব চ।
ন তু মামভিজানন্তি তত্ত্বেনাতশ্চ্যবন্তি তে।।”
(নবম অধ্যায়-রাজগুহ্য-যোগ-৯/২৪।।)

অনুবাদঃ আমিই সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা ও প্রভু। কিন্তু যারা আমার চিন্ময় স্বরূপ জানে না, তারা আবার সংসার সমুদ্রে অধঃপতিত হয়।

“অহমাত্মা গুড়াকেশ সর্বভূতাশয়স্থিতঃ।
অহমাদিশ্চ মধ্যং চ ভূতানামন্ত এব চ।।”
(দশম অধ্যায়-বিভূতি-যোগ১০/২০।।)

অনুবাদঃ হে গুড়াকেশ! আমিই সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থিত পরমাত্মা। আমিই সর্বভূতের আদি, মধ্য ও অন্ত।

“সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো
মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনং চ।
বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো
বেদান্তকৃদ্ বেদবিদেব চাহম্।।”
(পঞ্চদশ-অধ্যায়-পুরুষোত্তম-যোগ-১৫/১৫।।)

অনুবাদঃ আমি সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থিত এবং আমর থেকেই স্মৃতি, জ্ঞান ও বিলোপ হয়। আমিই সমস্ত বেদের জ্ঞাতব্য এবং আমিই বেদান্তকর্তা ও বেদবিৎ।

“দ্বাবিমৌ পুরুষৌ লোকে ক্ষরশ্চাক্ষর এব চ।
ক্ষরঃ সর্বাণি ভূতানি কূটস্থোহক্ষর উচ্যতে।।”
(পঞ্চদশ-অধ্যায়-পুরুষোত্তম-যোগ-১৫/১৬।।)

অনুবাদঃ ক্ষর ও অক্ষর দুই প্রকার জীব রয়েছে। এই জড় জগতের সমস্ত জীবকে ক্ষর এবং চিৎ-জগতের সমস্ত জীবকে অক্ষর বলা হয়।

“অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং চ সংশ্রিতাঃ।
মামাত্মপরদেহেষু প্রদ্বিষন্তোহভ্যসূয়কাঃ।।”
(ষোড়শ-অধ্যায়-দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ-১৬/১৮।)

অনুবাদঃ অহঙ্কার, বল, দর্প, কাম ও ক্রোধকে আশ্রয় করে অসুরেরা স্বীয় দেহে ও পরদেহে অবস্থিত পরমেশ্বর স্বরূপ আমাকে দ্বেষ করে এবং সাধুদের গুণেতে দোষারোপ করে।

“আসুরীং যোনিমাপন্না মূঢ়া জন্মনি জন্মনি।
মামপ্রাপ্যৈব কৌন্তেয় ততো যান্ত্যধমাং গতিম্।।”
(ষোড়শ-অধ্যায়-দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ-১৬/২০।)

অনুবাদঃ হে কৌন্তেয়! জন্মে জন্মে অসুরযোনি প্রাপ্ত হয়ে, সেই মূঢ় ব্যক্তিরা আমাকে লাভ করতে অক্ষম হয়ে তার থেকেও অধম গতি প্রাপ্ত হয়।

“শ্রীভগবানুবাচ
ত্রিবিধা ভবতি শ্রদ্ধা দেহিনাং সা স্বভাবজা।
সাত্ত্বিকী রাজসী চৈব তামসী চেতি তাং শৃণু।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-১৭/২।।)

অনুবাদঃ শ্রীভগবান বললেন-দেহীদের স্বভাব-জনিত শ্রদ্ধা তিন প্রকার- সাত্ত্বিকী, রাজসী ও তামসী। এখন সেই সম্বন্ধে শ্রবণ কর।

“যজন্তে সাত্ত্বিকা দেবান্ যক্ষরক্ষাংসি রাজসাঃ।
প্রেতান্ ভূতগণাংশ্চান্যে যজন্তে তামসা জনাঃ।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-১৭/৪।।)

অনুবাদঃ সাত্ত্বিক ব্যক্তিরা দেবতাদের পূজা করে, সাজসিক ব্যক্তিরা যক্ষ ও রাক্ষসদের পূজা করে এবং তামসিক ব্যক্তিরা ভূত ও প্রেতাত্মাদের পূজা করে।

“অশ্রদ্ধয়া হুতং দত্তং তপস্তপ্তং কৃতং চ যৎ।
অসদিত্যুচ্যতে পার্থ ন চ তৎ প্রেত্য নো ইহ।।”
(সপ্তদশ-অধ্যায়-শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ-১৭/২৮।।)

অনুবাদঃ হে পার্থ! অশ্রদ্ধা সহকারে হোম, দান বা তপস্যা যা কিছু অনুষ্ঠিত হয়, তাকে বলা হয় ‘অসৎ’। সেই সমস্ত ক্রিয়া ইহলোকে ও পরলোকে ফলদায়ক হয় না।

“মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদযাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে।।”
(অষ্টাদশ অধ্যায়-মোক্ষযোগ-১৮/৬৫।।)

অনুবাদঃ তুমি আমাতে চিত্ত অর্পণ কর, আমর ভক্ত হও, আমার পূজা কর এবং আমাকে নমস্কার কর। তাহলে তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয় হবে।

“সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।”
(অষ্টাদশ অধ্যায়-মোক্ষযোগ১৮/৬৬।।)

অনুবাদঃ সর্ব প্রকার ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব। তুমি শোক করো না।

“যেখানে ব্রহ্মাজী, পরম বৈষ্ণব শিরোমণি মহাদেব বলছেন কৃষ্ণের আরাধনা করতে!”

“ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্।।”
(ব্রহ্মসংহিতা-৫/১)

অনুবাদঃ শ্রীকৃষ্ণ, যিনি গোবিন্দ নামেও পরিচিত, তিনি হচ্ছেন পরম ঈশ্বর। তাঁর রূপ সচ্চিদানন্দময় (নিত্য, জ্ঞানময় ও আনন্দময়)। তিনি হচ্ছেন সব কিছুর পরম উৎস। তাঁর কোন উৎস নেই, কেন না তিনি হচ্ছেন সমস্ত কারণের পরম কারণ ।

ভগবান নিজেও সর্বধর্ম পরিত্যাগ করে তাঁর শরণ নিতে বলছেন ১৮ অধ্যায়ের ৬৬ নাম্বার শ্লোকে।। আর আমরা সেই ভগবানকেই চিনতে পারছি না!!!

জন্মাষ্টমী ব্রত বা উপবাস পালন করার ফল, যা প্রত্যেকের জানা উচিত, এই বিষয় নিয়ে শাস্ত্রে অত্যন্ত মহিমান্বিত ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে-

১. পাপমোচন ও মুক্তি লাভঃ
“জন্মাষ্টমীর উপবাসে সমস্ত পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সন্দেহ নেই, ভক্ত বিষ্ণুলোকে গমন করেন।।”
— ভবিষ্যোত্তর পুরাণ, উত্তরখণ্ড, ১৪৪.২৪

জন্মাষ্টমীতে উপবাস করলে জীবনের সকল পাপ দূর হয় এবং ভগবান বিষ্ণুর চিরধামে স্থান লাভ হয়।।

২. জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন মুক্তিঃ
“যে ভক্ত জন্মাষ্টমীর দিনে ব্রত পালন করে, তার সমস্ত পাপ নাশ হয়। ভগবানের কৃপায় সে আর পুনর্জন্ম লাভ করে না।”
— স্কন্দ পুরাণ, বৈষ্ণবখণ্ড

এই ব্রত ভক্তকে জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি দিয়ে চিরশান্তি প্রদান করে।।

৩. ইচ্ছাপূরণ ও সৌভাগ্য লাভঃ
“যে ভক্তি সহকারে জন্মাষ্টমীর ব্রত পালন করে, ভগবান বিষ্ণু তার সমস্ত কামনা পূর্ণ করেন।।”
— পদ্ম পুরাণ, উত্তরখণ্ড

এই ব্রত জীবনের সব শুভ ইচ্ছা পূর্ণ করে এবং অটল সৌভাগ্য প্রদান করে।।

৪. ভগবৎপ্রেম বৃদ্ধি ও অন্তরের পবিত্রতাঃ
“উপবাসে জন্মানো পুণ্য হৃদয়কে শুদ্ধ করে এবং কৃষ্ণভক্তি বৃদ্ধি করে।।”
— নারদ পুরাণ, পূর্বখণ্ড

এই উপবাসে অন্তরের অপবিত্রতা দূর হয়, ভগবৎপ্রেম বৃদ্ধি পায় এবং কৃষ্ণস্মরণ সহজ হয়।।

৫.পরিবারের কল্যাণ ও রক্ষাকবচঃ
“যে ব্যক্তি জন্মাষ্টমীর ব্রত যথাযথভাবে পালন করে, সে নিজের এবং তার পরিবারের মঙ্গল নিশ্চিত করে এবং ভগবান বিষ্ণুর কৃপা লাভ করে।।” —গরুড় পুরাণ

এই ব্রত পালনকারী শুধু নিজের নয়, পূর্বপুরুষ ও পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করেন এবং সংসারের অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করে।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন লীলা কাহিনীঃ
ভগবদগীতায় শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন যে তাঁর জন্ম, কর্ম ইত্যাদি সবই দিব্য, এবং কেউ যখন তত্ত্বগতভাবে তা জানতে পারে, তখন তিনি ভগবদ্ধামে প্রবেশ করবার যোগ্যতা অর্জন করেন।

ভগবানের জন্ম একজন সাধারণ মানুষের মতো নয়। সাধারণ মানুষের জন্ম হয় কর্মফলের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে। কর্মের ফলস্বরূপ সে এক দেহ থেকে অন্য আরেক দেহে দেহান্তরিত হয়। ভগবানের জন্মের কথা বিশ্লেষণ করে ভগবদগীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে, তিনি তাঁর নিজের ইচ্ছার প্রভাবে আবির্ভূত হন। গ্রহ নক্ষত্রের শুভ স্থানে অবস্থান। যখন ভগবানের আবির্ভাবের সময় হল, তখন কাল সর্বগুণ সমন্বিত হয়ে পরম সুন্দর হয়ে উঠল। তখন পৃথিবী আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। তিথি, যোগ এবং নক্ষত্র তখন সর্বমঙ্গলময় এবং সর্বসুলক্ষণ যুক্ত হয়ে উঠল। সর্বসুলক্ষণযুক্তা রোহিণী নক্ষত্র তখন তুঙ্গে প্রকাশিত হল।

ব্রহ্মা স্বয়ং এই রোহিণী নক্ষত্রের পর্যবেক্ষণ করেন। জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে, নক্ষত্রের অবস্থান ছাড়াও বিভিন্ন গ্রহের অবস্থান ও প্রভাবের ফলে শুভ এবং অশুভ তিথি ও যোগ বিচার করা হয়। শ্রীকৃষ্ণের জন্মের সময় সমস্ত গ্রহগুলি সব সময় মঙ্গলময় অবস্থা এবং সব সময় শুভ ইঙ্গিত প্রদর্শন করে বিরাজ করতে লাগল।

তখন দশদিক শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠল। শুভ নক্ষত্রগুলি নভোমন্ডলে শোভা পেতে লাগল। নগর, গ্রাম, গোচারণভূমি এবং সকলের হৃদয়ে সব রকমের শুভ ইঙ্গিত দেখা যেতে লাগল। জলে পূর্ণ হয়ে নদনদী প্রবাহিত হতে লাগল, সরোবরগুলি বিকশিত পদ্মে পূর্ণ হয়ে শোভা পেতে লাগল।

বনভূমি নানা রকম সুন্দর সুন্দর পাখি ও ময়ুরপূর্ণ হয়ে উঠল। পাখিরা সুমধুর স্বরে গান গাইতে লাগল এবং সেই গানের ছন্দে ময়ুরেরা ময়ুরীদের সঙ্গে নাচতে শুরু করল। সুমধুর গন্ধ বহন করে বায়ু বইতে লাগল এবং শরীরের স্পর্শানুভূতি অত্যন্ত সুখকর বলে বোধ হতে লাগল।

ব্রাহ্মণেরা অনুভব করল যে, তাদের গৃহের পরিবেশ যজ্ঞানুষ্ঠানের অনুকুল হয়ে উঠেছে। আসুরিক রাজাদের অত্যাচারে যজ্ঞ অনুষ্ঠান তথন প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যজ্ঞের আগুন প্রায় নিভে গিয়েছিল, কিন্তু এখন তারা আবার প্রশান্ত চিত্তে আগুন জ্বালাতে সক্ষম হল।

যজ্ঞ অনুষ্ঠান করা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে ব্রাহ্মণেরা অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়েছিল, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের সময় তাদের চিত্ত প্রসন্ন হয়ে উঠল, কেননা তারা নভোমন্ডলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবসূচক দিব্য শব্দতরঙ্গ শুনতে পেল।

গন্ধর্ব এবং কিন্নরেরা সুমধুর সুরে গান গাইতে লাগল এবং সিদ্ধ ও চারণেরা ভগবানের গুণকীর্তন করে তাঁর স্তব করতে লাগল। স্বর্গলোকে দেবতারা তাঁদের সহচরী এবং অস্পরাদের সঙ্গে সুললিত ছন্দে নৃত্য করতে লাগলেন। দেবতারা এবং মুনিঋষিরা পুষ্পবর্ষণ করতে লাগলেন। সমুদ্রের উপকূলে তরঙ্গের মৃদু মৃদু শব্দ হতে লাগল এবং সমুদ্রের উপরে সুমধুর মেঘগর্জন হতে লাগল।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চতুর্ভুজ রূপে আবির্ভাব। তখন ভগবান বিষ্ণু, যিনি সকলের হৃদয়ে বিরাজ করেন, তিনি রাতের গভীর অন্ধকারে পরমেশ্বর ভগবানরূপে দেবকীর সম্মুকে আবির্ভূত হলেন। পূর্ণচন্দ্র যেভাবে পূর্বদিগন্তে উদিত হয়, ঠিক তেমন ভাবেই পরমেশ্বর ভগবান আবির্ভূত হলেন।

কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, অষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়েছিল তা হলে পূর্ণচন্দ্রের উদয় হল কি করে? এর অর্থ উত্তরে বলা হয়েছে যে, শ্রীকৃষ্ণ চন্দ্রবংশে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাই চন্দ্র সেই রাত্রে অপূর্ণ থাকলেও সেই বংশে ভগবানের আবির্ভাবের জন্য আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে সেদিন পূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন।

খমাণিক্য নামক জ্যোতিষ শাস্ত্রগ্রন্থে ভগবানের আবির্ভাব সময়কালীন গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান খুব সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে প্রমাণ করা হয়েছে যে, এই শুভ মুহূর্তে যে শিশুটির জন্ম হল, তিনি হচ্ছেন পরম-ব্রহ্ম।

বসুদেব দেখলেন যে, সেই অদ্ভুত শিশুটি চতুর্ভুজ। তিনি তাঁর চার হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম ধারণ করে আছেন। বক্ষে তাঁর শ্রীবৎস চিহ্ন, কন্ঠে তাঁর কৌস্তভ শোভিত কন্ঠহার, পরনে তাঁর পীতবসন, উজ্জ্বল মেঘের মতো তাঁর গায়ের রঙ, বৈদুর্য মণিভূষিত কিরীট তাঁর মস্তকে শোভা পাচ্ছে, নানা রকম মহামূল্য মণি-রত্ন শোভিত সমস্ত অলঙ্কার তাঁর দিব্য দেহে শোভা পাচ্ছে, তাঁর মাথা ভর্তি কুঞ্চিত কালো কেশরাশি।

এই অদ্ভুত শিশুটিকে দেখে বসুদেব অত্যন্ত আশ্চর্য হলেন। তিনি ভাবলেন কিভাবে একটি নবজাত শিশু এই রকম সমস্ত অলঙ্কারে ভূষিত হল? তাই তিনি বুঝতে পারলেনম যে, শ্রীকৃষ্ণই তাঁর পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছেন।

তিনি তখন অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। বসুদেব তখন ভাবতে লাগলেন, যদিও তিনি একজন সাধারণ মানুষ এবং বাহ্যিক দিক দিয়ে কংসের কারাগারে আবদ্ধ, তবুও পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণু তাঁর স্বরূপ ধারণ করে তাঁর সন্তানরূপে আবির্ভুত হয়েছেন।

কোনও মনুষ্যশিশু এইভাবে চতুর্ভুজ রূপ নিয়ে অলঙ্কার এবং সব রকম দিব্য সাজে সজ্জিত হয়ে এবং পরমেশ্বর ভগবানের সমস্ত লক্ষণগুলি যুক্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করে না।

বসুদেব বারবার সেই শিশু সন্তানটির দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন এবং ভাবতে লাগলেন কিভাবে তাঁর এই পরম সৌভাগ্যের মুহুর্তটি তিনি উদযাপন করবেন। তিনি ভাবলেন, “সাধারণত যখন পুত্রসন্তানের জন্ম হয়, মানুষ তখন মহোৎসব করে, আর পরমেশ্বর ভগবান আজ আমার গৃহে আমার সন্তানরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। কত মহা আড়ম্বরে আমার এই উৎসব পালন করা উচিত।”

বসুদেব, যাঁর আরেক নাম আনকদুন্দুভি, যখন তাঁর নবজাত শিশুটির দিকে তাখিয়ে দেখলেন, তখন তাঁর হৃদয়ে আনন্দে এত উৎফুল্ল হয়ে উঠল যে, তিনি তখন নানা অলঙ্কারে ভূষিত হাজার হাজার গাভী ব্রাহ্মণদের দান করতে ইচ্ছা করলেন।

বৈদিক প্রথা অনুসারে যখন ক্ষত্রিয় রাজার প্রসাদে কোন শুভ অনুষ্ঠান হয়, রাজা তখন নানা রকম সম্পদ দান করেন। বিশেষ করে ব্রাহ্মণ এবং মুনি-ঋষিদের তাঁরা স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত গাভী দান করেন।

শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি উদযাপন করতে বসুদেবও দান করতে ইচ্ছা করলেন। কিন্তু যেহেতু তিনি কংসের কারাগারে শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিলেন, তাই তাঁর পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। তাই মনে মনে তিনি ব্রাহ্মণদের হাজার হাজার গাভী দান করলেন।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে বসুদেবের প্রার্থনা বসুদেবের মনে আর যখন কোন সংশয় রইল না যে, এই নবজাত শিশুটিই হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, তখন তিনি করজোড়ে প্রণিপাত করে তাঁর বন্দনা করতে শুরু করলেন। বসুদেব তখন চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং তিনি সম্পূর্ণভাবে কংসের ভয় থেকে মুক্ত হলেন। সেই শিশুটির অঙ্গকান্তিতে সেই ঘর উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।

বসুদেব তখন প্রার্থনা করতে লাগলেন, “হে প্রিয় প্রভু, আমি জানি আপনি কে। আপনিই হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, সমস্ত জীবের পরমাত্মা এবং সত্য। আপনি আপনার নিত্য স্বরূপ নিয়ে আবির্ভুত হয়েছেন, যা আমি এখন সরাসরিভাবে প্রত্যক্ষ করতে পারছি।

আমি বুঝতে পারছি যে, যেহেতু আমি কংসের ভয়ে ভীত, তাই সেই ভয় থেকে আমাকে উদ্ধার করার জন্য আপনি আবির্ভূত হয়েছেন। আপনি এই প্রকৃতির অতীত; আপনিই হচ্ছেন সেই পরম পুরুষ, যিনি মায়ার প্রতি দৃষ্টিপাত করে এই জড় জগৎকে প্রকাশিত করেন।

কেউ তর্ক করতে পারে যে, পরমেশ্বর ভগবান, যিনি কেবলমাত্র দৃষ্টিপাত করার মাধ্যমে সমস্ত জড় সৃষ্টিকে প্রকাশিত করেন, তাঁর পক্ষে বসুদেবের পত্মী দেবকীর গর্ভে আবির্ভূত হওয়া কি করে সম্ভব! সেই সন্দেহ দূর করার জন্য বসুদেব বললেন, “হে প্রিয় ভগবান, আপনি যে দেবকীর গর্ভে আবির্ভূত হয়েছেন এটা তেমন কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়। কেননা এই জড় সৃষ্টিও অনেকটা সেই ভাবেই প্রকাশিত হয়েছে।

আপনি মহাবিষ্ণুরূপে কারণসমুদ্রে শয়ন করে আছেন এবং আপনার নিঃশ্বাসের প্রভাবে অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ড প্রকাশিত হচ্ছে। তারপর গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণরূপে আপনি প্রতিটি ব্রহ্মান্ডে প্রবিষ্ট হয়েছেন।

তারপর আবার আপনি নিজেকে ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণুরূপে প্রকাশ করে সমস্ত জীবের হৃদয়ে প্রবেশ করছেন, এমন কি প্রতিটি পরমাণুর মধ্যেও আপনি নিজেকে প্রকাশ করছেন, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। যদিও মনে হচ্ছে যে, আপনি দেবকীর গর্ভে প্রবেশ করছেন, কিন্তু তা হলেও আপনি সর্বব্যাপ্ত।

জড় দৃষ্টান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আপনার প্রবেশ এবং সর্বব্যাপ্তি উপলব্ধি করতে পারি না। ১৬টি উপাদানে বিভক্ত হওয়ার পরেও জড়া প্রকৃতি অবিকৃতই থেকে যায়। জড় শরীর মাটি, জল, আগুন, বায়ু ও আকাশ-এই পঞ্চ মহাভূতের সমন্বয় মাত্র।

জড় শরীর দেখলেই মনে হয় যেন এই উপাদানগুলি নতুন সৃষ্টি করা হয়েছে, কিন্তু সেউ উপাদনগুলি দেহের বাইরে সব সময়েই রয়েছে। তেমনই, যদিও আপনি একটি শিশুরূপে দেবকীর গর্ভে আবির্ভূত হয়েছেন, তবুও আপনি বাইরেও বিরাজ করছেন। আপনি সব সময়ই আপনার ধামে বিরাজ করতে পারেন।

“গভীর বুদ্ধিমত্তা সহকারে আপনার আবির্ভাবের তত্ত্ব উপলব্ধি করতে হয়, কেননা জড়া প্রকৃতিও আপনার থেকেই উদ্ভুত হয়েছে। সূর্য যেমন সূর্যকিরণের উৎস, আপনিও তেমনই জড়া প্রকৃতির আদি উৎস। সুর্যকিরণ কখনও সূর্যমন্ডলকে আচ্ছাদিত করতে পারে না।

ঠিক তেমনই আপনার থেকে উদ্ভুত হওয়ার ফলে জড়া প্রকৃতি কখনও আপনাকে আবৃত্ত করতে পারে না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যেন আপনি জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা প্রভাবিত, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জড়া প্রকৃতির গুণ কখনই আপনাকে প্রভাবিত করতে পারে না।

গভীর বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন দার্শনিকেরা তা বুঝতে পারেন। পক্ষান্তরে বলা যায় যে, যদিও মনে হয় যে, আপনি এই জড়া প্রকৃতিতে রয়েছেন, তবুও আপনি কখনও তার দ্বারা আচ্ছাদিত হন না।”

বৈদিক শাস্ত্র থেকে আমরা জানতে পরি যে, পরমব্রক্ষের দেহ-নির্গত রশ্মিচ্ছটার প্রভাবে সব কিছু প্রকাশিত হয়। ব্রহ্মসংহিতা থেকে আমরা জানতে পারি যে, ব্রহ্মজ্যোতি হচ্ছে ভগবানের দেহ-নির্গত রশ্মিচ্ছটা, এবং ব্রহ্মজ্যোতি থেকে সব কিছুর সৃষ্টি হয়। ভগবদগীতাতে আরও বলা হয়েছে যে, পরমেশ্বর ভগবানই হচ্ছেন ব্রহ্মজ্যোতির উৎস। প্রকৃতপক্ষে তিনিই হচ্ছেন সব কিছুর মূল কারণ। কিন্তু অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা মনে করে যে, পরমেশ্বর ভগবান যখন এই জড় জগতে আবির্ভূত হন, তখন তিনি জড় গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েন। এই ধরনের সিদ্ধান্ত যারা করে, তারা অত্যন্ত মুর্খ, ভগবান সম্বন্ধে তাদের কোন জ্ঞানই নেই।

পরমেশ্বর ভগবান প্রত্যক্ষভাবে এবং পরোক্ষভাবে সর্বত্রই বিরাজ করেন। তিনি কেবল গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুরূপেই এই জড় সৃষ্টির অন্তরেও বিরাজ করেন তা নয়, তিনি প্রতিটি পরমাণুর মধ্যেও বিরাজ করছেন। তিনি আছেন বলেই সব কিছুর অস্তিত্ব আছে। তাঁকে ছাড়া কোন কিছুরই অস্তিত্ব থাকতে পারে না। বৈদিক শাস্ত্রে আমরা দেখতে পাই যে, পরমাত্মা থেকে স্বতন্ত্র হয়ে কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই। তাই এই জড়া প্রকৃতিও তাঁরই শক্তির প্রকাশ। জড় পদার্থ এবং চিন্ময় আত্মা উভয়েই তাঁর থেকে উদ্ভত হয়েছে। মূর্খ লোকেরাই কেবল মনে করে যে, পরমেশ্বর ভগবান যখন আবির্ভূত হন, তখন তিনি জড়া প্রকৃতির দ্বারা প্রভাবিত হন।

তিনি একটি জড় শরীর গ্রহণ করছেন বলে মনে হলেও তিনি কখনই জড়া প্রকৃতির অধীন হন না। শ্রীকৃষ্ণ তাই আবির্ভূত হয়ে পরমেশ্বর ভগবানের আবির্ভাব এবং অপ্রকট সম্বন্ধীয় সব কটি ভ্রান্ত মতবাদকে পরাস্ত করলেন।

“হে প্রভু, আপনার আবির্ভাব, অবস্থান এবং অপ্রকট লীলা জড় জগতের সব কটি গুণের সমস্ত প্রভাবের অতীত, যেহেতু আপনিই হচ্ছেন সব কিছুর নিয়ন্তা এবং পরমব্রহ্মের আশ্রয়, তাই আপনার পক্ষে অসম্ভব কিছুই নয় এবং কিছুই আপনাতে বিসদৃশ নয়। একজন সরকারী কর্মচারী যেমন রাষ্ট্রপ্রধানের অধীন কাজ করেন, জড়া প্রকৃতিও ঠিক তেমনই আপনার তত্ত্বাবধানে কাজ করেন। তাই আপনার পক্ষে কারো অধীনস্থ হওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না, পরব্রহ্ম এবং সব কিছুই আপনাকে আশ্রয় করে আছে এবং জড়া প্রকৃতির সমস্ত কার্যকলাপ আপনার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

“আপনাকে ‘শুক্লম্’ বলে সম্বোধন করা হয়। ‘শুক্লম্’ বা সাদা হচ্ছেন পরমেশ্বর সত্যস্বরূপ আপনার এক প্রতীক মাত্র। কেননা আপনি জড়জাগতিক গুণের দ্বারা প্রভবিত হন না। ব্রহ্মাকে ‘রক্ত’ বলা হয়, কেননা তিনি সৃজনাত্মকরূপে রজোগুণের অধিকারী, আর তমোগুণ শিবের অধীন, কেননা তিনিই সমস্ত সৃষ্টির সংহার করেন। সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয় আপনার দ্বারাই সম্পাদিত হয়, কিন্তু তবুও আপনি সেই সমস্ত গুণের অতীত।” বেদে বিহিত হয়েছে, “হরির্হিনির্গুণসাক্ষাৎ”- পরমেশ্বর ভগবান সর্বদাই জড়জাগতিক গুণের অতীত। সেখানে আরও বলা হয়েছে যে, পরমেশ্বর ভগবানে তমো ও রজোগুণের কোন রকম অস্তিত্ব নেই।

“হে প্রভু! আপনিই হচ্ছেন পরম নিয়ন্তা পরমেশ্বর ভগবান পরম ব্রহ্ম। আপনিই সমস্ত সৃষ্টি পরিচালনা করেন। পরম নিয়ন্তা হওয়া সত্ত্বেও আপনি কৃপা করে আমার গৃহে অবতরণ করেছেন এবং আপনার অবতরণের কারণ হচ্ছে সেই সমস্ত অসুরদের সংহার করা, যারা রাজবেশ ধারণ করে পৃথিবীর উপর রাজত্ব করছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা হচ্ছে অসুর। আপনি যে তাদের এবং তাদের সমস্ত অনুচরদের সংহার করবেন, সেই সম্বন্ধে আমার কোন সন্দেহ নেই।

“আমি জানি যে, বর্বর কংস ও তার দুরাচারী সঙ্গীদের সংহার করবার জন্য আপনি অবতরণ করেছেন। কিন্তু আপনি যে তাকে এবং তার অনুচরদের সংহার করাবার জন্য অবতরণ করবেন, সেই কথা জানতে পেরে কংস আপনার পূর্বজাত বড় ভাইদের হত্যা করেছে। এখন সে কেবল আপনার জন্ম সংবাদের প্রতীক্ষা করছে। যখনই সেই সংবাদ সে পাবে, তখনই সে আপনাকে হত্যার জন্য সশস্ত্র উপস্থিত হবে।”

মাতা দেবকীর শ্রীকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনাঃ
বসুদেবের এই প্রার্থনার পর, শ্রীকৃষ্ণের মাতা দেবকী প্রার্থনা করতে শুরু করলেন। তাঁর ভাই কংসের অত্যাচারে তিনি অত্যন্ত ভীত ছিলেন। দেবকী বললেন, “প্রিয় প্রভু! নারায়ণ, রাম, শেষ, বরাহ, নৃসিংহ, বামন; বলদেব এবং এই রকম কোটি কোটি অবতারের।