০৩:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫

মর্যাদাপূর্ণ রজনি শবে কদরের তাৎপর্য ও ফজিলত

নিউজ ডেস্ক

গ্রামের সংবাদ ডেস্ক : পবিত্র রমজান মাসের সবচেয়ে পুণ্যময় একটি রজনীর নাম হচ্ছে লাইলাতুলকদর, যা ‘শবে কদর’ নামে পরিচিত। এই রজনীর বরকত ও পুণ্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের পূর্ণ একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। এই রাতের ফজিলত পবিত্র কুরআনুল কারীমে বর্ণিত হয়েছে, ‘কদরের এরাতটি এক হাজার মাসের (ইবাদতের) চেয়ে উত্তম। ‘ এক হাজার মাসে তিরাশি বছর চার মাস হয়ে থাকে। ওই ব্যক্তি ভাগ্যবান, যে এই রাতটি ইবাদত বন্দেগীর মধ্যে কাটিয়ে দিতে পারে। কেননা, এর মাধ্যমে সে তিরাশি বছর চার মাসের চেয়েও বেশি সময় ইবাদতে লিপ্ত থাকার সৌভাগ্য অর্জন করে। আর অধিক সময়ের সীমা কী তা একমাত্র আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কেউ বলতে পারে না। কুরআনে পাকে হাজার মাসের অধিক বলার কারণ হল, তখনকার আরবদের মধ্যে গণনার ক্ষেত্রে হাজারকেই সবচেয়ে বড় সংখ্যা গণ্য করা হত। অতএব, কুরআনের উদ্দেশ্য এখানে হাজার মাসে সীমাবদ্ধ করা নয়; বরং অধিক বুঝানোই উদ্দেশ্য। নি¤েœ পবিত্র কুরআনে এই পুণ্যময় রজনী সম্পর্কে যে ঘোষণা এসেছে, তার সারমর্ম তুলে ধরা হল।

পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হচ্ছে : নিশ্চয় আমি কুরআন শরীফ কদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি। (সূরা কদর : ১)। এই আয়াতের মর্ম হল: কুরআন শরীফ লওহে মাহফুয হতে দুনিয়ার আকাশে এ রাতে অবতীর্ণ করা হয়েছে। এই একটি মাত্র বিষয়ই এ রাতের ফযীলতের জন্য যথেষ্ট ছিল যে, আল-কুরআনের মতো মর্যাদাবান ঐশীগ্রন্হ এ রাতে অবতীর্ণ হয়েছে, এই রাতের মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের জন্য অন্য কোনো ফযীলত ও বরকতের প্রয়োজন ছিল না। তদুপরি পরবর্তী আয়াতে আগ্রহ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ইরশাদ হচ্ছে : আপনি কি অবগত আছেন যে, কদরের রাত কত মর্যাদা সম্পন্ন রাত? (সূরা কদর : ২)। অর্থাৎ এ রাতের মাহাত্ম্য ও ফযীলত সম্পর্কে আপনি কি অবগত রয়েছেন যে, এ রাতের কতটুকু কল্যাণ ও কী পরিমাণ ফযীলত রয়েছে? অত:পর এ রাতের ফযীলতের বিবরণ আলোচিত হয়েছে : শবে কদর হল হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। (সূরা কদর : ৩)। এর সারমর্ম হল, হাজার মাস ইবাদত করলে যে পরিমাণ সাওয়াব হয়, কদরের রাতে ইবাদত করার সাওয়াব এর চেয়েও বেশি। আর এ বেশি হওয়ার কোনো সীমারেখা নেই যে, কি পরিমাণ বেশি সাওয়াব হবে। ‘এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে।’ (সূরা কদর : ৪)।

আল্লামা রাযী (রহ.) লিখেছেন যে, ফেরেশতাগণ যখন প্রথমাবস্থায় পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা হিসেবে মানুষ সৃষ্টির সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন, তখন মানুষের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রকাশ করে আল্লাহ তাআলার দরবারে আরজ করেছিলেন যে, আপনি এমন এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন, যারা দুনিয়ায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং রক্ত প্রবাহিত করবে। এমতাবস্থায় শবে কদরে আল্লাহর পক্ষ হতে তাওফীকপ্রাপ্ত হয়ে যখন মানুষ আল্লাহ তাআলার পরিচিতি লাভ ও আনুগত্যকরণে লিপ্ত হয়, তখন ফেরেশতাগণ তাদের অজ্ঞতার ওযর পেশ করার জন্য অবতীর্ণ হন। এ রাতে ‘রুহুল কুদুস’ তথা হযরত জিবরাঈল (আ.)-ও অবতরণ করেন। এ প্রসঙ্গে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, শবে কদরে হযরত জিবরাঈল (আ.) একদল ফেরেশতাসহ অবতরণ করেন এবং যে ব্যক্তিকে যিকির ও অন্যান্য ইবাদতে লিপ্ত দেখেন, তার জন্য রহমতের দুআ করে থাকেন। ‘তাঁদের রবের নির্দেশে প্রত্যেক কল্যাণকর বিষয়সহ (পৃথিবীর দিকে অবতরণ করেন)। হাদীসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ মাযাহিরে হকের মধ্যে উল্লেখ আছে যে, এ রাতে ফেরেশতাদের জন্ম হয়েছে। এ রাতে হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করার উপকরণ একত্রিত করা আরম্ভ হয়েছে। এ রাতে জান্নাতে গাছ সৃষ্টি হয়েছে এবং এ রাতে দুআ ও অন্যান্য ইবাদত কবূল হওয়ার বিবরণও অনেক বর্ণনায় বিদ্যমান রয়েছে। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এ রাতে হযরত ঈসা (আ.) কে আসমানে ওঠিয়ে নেয়া হয়েছে এবং এ রাতে বনী ইসরাঈলের তওবা কবূল করা হয়েছে। ‘এ রাত সালাম তথা নিরাপত্তার রাত, যা ফজর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’ (সূরা কদর : ৫)।

তিনটি সংশয় ও তার সমাধান : প্রথম সংশয় : কুরআনে কারীমে শবে কদরকে হাজার মাস থেকে উত্তম আখ্যা দেয়া হয়েছে। এখানে সংশয় হল প্রতি বছরই তো একটি শবে কদরের আগমন ঘটবে, অর্থাৎ, সাওয়াবের জন্য পদত্ত হাজার মাস তথা তিরাশি বৎসরের মধ্যেও তো তিরাশিটি শবে কদর রয়েছে। এক্ষেত্রে হিসাব কীভাবে করবে? তাফসীরে মাআরিফুল কুরআনে এ সংশয়ের নিরসনে বলা হয়েছে যে, এই হিসাব থেকে শবে কদর বাদ দিতে হবে। আর শবে কদরকে বাদ দিয়ে হিসাব করলে হিসাবের সমস্যা নিরসন হয়ে যায়। দ্বিতীয় সংশয় : অনেকের মধ্যেই একটি সংশয় হল যে, সারাবিশ্বেই কি শবে কদর একই সময় হয়ে থাকে ? ফেকাহবিদগণ বলেছেন যে, শবে কদরের বিষয়টি মূলত: চাঁদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে দেশে যেদিন চাঁদ উদিত হবে, সেই দেশে সেখানকার চাঁদ উদয়ের তারিখ হিসাব করে শবে কদর সাব্যস্ত করতে হবে। তৃতীয় সংশয় : অনেকেই মনে করে থাকেন, যে রাতে শবে কদর হবে, সে রাতের পুরোটাই ইবাদত বন্দেগীতে কাটাতে সক্ষম হলেই হাজার মাসের সাওয়াব অর্জিত হবে, অন্যথায় নয়। এ প্রসঙ্গে হাদীসের বিশুদ্ধ কিতাব মুসলিম শরীফে হযরত ওসমান (রা.) মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। যাতে বলা হয়েছে: ‘যে ব্যক্তি ইশার নামাজ জামাআতের সঙ্গে আদায় করল, সে অর্ধরাত নফল ইবাদতের সাওয়াব পেল। আর সেই ব্যক্তি যখন ফজরের নামাযও জামাআতের সঙ্গে আদায় করল, সে সম্পূর্ণ রাত জেগে থেকে ইবাদত করার সাওয়াব অর্জন করল।’ [মাআরিফুল কুরআন: খন্ড-৮, পৃষ্ঠা-৭৯৩]

শবে বরাত ও শবে কদরের পার্থক্য : ‘শব’ ফার্সি শব্দ। আরবীতে ‘লাইলাতুন’ এর প্রতিশব্দ। অর্থাৎ লাইলাতুল ‘বরাত’ এবং ‘লাইলাতুল কদর’। ‘শব’ বা ‘লাইলাতুন’ শব্দের অর্থ ‘রাত’। আর ‘বরাত’ শব্দের অর্থ হল: ‘ক্ষমা লাভ করা’ বা ‘নাজাতপ্রাপ্ত হওয়া’। এ হিসাবে ‘লাইলাতুল বরাত’ বা ‘শবে বরাতে’র অর্থ হল: ‘ক্ষমা লাভ করার রাত’ বা ‘নাজাত প্রাপ্তির রাত’। আর ‘লাইলাতুল বরাতের’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্ধ শাবানের রাত (শাবানের ১৫ তারিখের রাত)। এ রাতেও মানবজাতির এক বছরের জাগতিক সব বিষয় ফায়সালা করা হয়। আর ‘কদর’ শব্দের অর্থ হল: ‘সম্মান ও মর্যাদা’। এ হিসাবে ‘লাইলাতুল কদর’ -এর অর্থ দাঁড়ায়- ‘সম্মান ও মর্যাদা অর্জনের রাত’। হযরত আবু বকর ওয়ারাকাহ (রহ.) বলেন: এ রাতকে এজন্য ‘লাইলাতুল কদর’ বলাহয় যে, ইতিপূর্বে আমলহীনতার কারণে যে ব্যক্তির কোনো কদর ও সম্মান-মর্যাদা ছিল না, এ রাতের তওবা, ইস্তিগফার ও ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে সে ব্যক্তি মর্যাদাবান ও সম্মানিত হয়ে যায়। কদরের আরেকটি অর্থ হচ্ছে ‘তাকদীর’। এ অর্থ হিসেবে ‘লাইলাতুল কদর’ নামকরণের কারণ হচ্ছে, তাকদীরের যে অংশ এ বছর রমজান হতে পরবর্তী রমজান পর্যন্ত বাস্তবায়িত ও সংঘটিত হবে তা ওইসব ফেরেশতাদের কাছে সোপর্দ করা হয়, যারা জাগতিক বিষয়াদি বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন।

শবে কদর অর্থ হলো মর্যাদাপূর্ণ রাত বা ভাগ্যরজনি। শবে কদরের আরবি হলো লাইলাতুল কদর তথা সম্মানিত রাত। লাইলাতুল কদরের রাত হচ্ছে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত।

পবিত্র কুরআনুল কারিম নাযিলের মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই রাতকে হাজারের মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ উত্তম ও মহা সম্মানিত রাত হিসেবে আমাদের জন্য দান করেছেন। প্রতিবছর রমজান মাসের শেষ দশকের রাতগুলোর মধ্যে কোনো এক বিজোড় রাত হলো ভাগ্য নির্ধারণ বা লাইলাতুল কদরের রাত।

যে রাতে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে, সে রাতই লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কুরআন নাজিল করেছি মর্যাদাপূর্ণ কদর রজনীতে। আপনি কি জানেন, মহিমাময় কদর রজনী কী? মহিমান্বিত কদর রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালামকে সমভিব্যহারে অবতরণ করেন; তাঁদের প্রভু মহান আল্লাহর নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে, সব বিষয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে। এই শান্তির ধারা চলতে থাকে উষা বা ফজর পর্যন্ত। (আল কুরআন, সুরা-৯৭ [২৫] আল কদর)

রমজান মাস পবিত্র কুরআন নাযিলের মাস। শবে কদর কুরআন নাযিলের রাত। এ রাতেই প্রথম পবিত্র মক্কা মুকাররমার হেরা পর্বতের গুহায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের সরদার হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে রাহমতুল্লিল আলামিন প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাযিল করেন।

এ কারণে আল্লাহ তায়ালা এ রাতের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ রাতে মহান আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মাদিকে হাজার মাসের ইবাদত-বন্দেগি ও আমলের সমান সাওয়াব দান করে। কুরআনুল কারিমের অন্য স্থানে এ রাতটিকে বরকতময় রাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন- হা-মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমি একে (কুরআন) এক বরকতময় রাতে নাজিল করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, আমিই প্রেরণকারী। আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা দুখান : আয়াত ১-৬)

কুরআন নাযিলের কারণে মর্যাদার এ রাতের কথা উল্লেখ করার পর যে মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে সে মাসের কথাও আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে উল্লেখ করেছেন এভাবে-

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রমজান মাস! এমন একটি মাস যে মাসে কোরআন নাযিল হয়েছে মানবের মুক্তির দিশারি ও হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনরূপে।’ (সুরা-২ আল বাকারা, আয়াত: ১৮৫)।

সুতরাং লাইলাতুল ক্বদরের রাতে আল্লাহর ওইসব বান্দারা সবচেয়ে বেশি সম্মানিত ও মর্যাদার অধিকারী হবেন, যাদের সঙ্গে কুরআনের সম্পর্ক বেশি। যিনি কুরআন-সুন্নাহর আলোকেই নিজের জীবন পরিচালিত করবেন। বাস্তবজীবনে কোরআন-সুন্নাহর আমলে সাজাবেন জীবন। আর তারাই হবেন সফল।

মর্যাদার এ রাত পেলে মুমিন বান্দা আল্লাহর কাছে কী প্রার্থনা করবেন? কী চাইবেন? এ সম্পর্কে হাদিসের একটি বর্ণনা এভাবে এসেছে- হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, একবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম- হে আল্লাহর রাসুল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনি বলে দিন, আমি লাইলাতুল কদর কোন রাতে হবে তা জানতে পারি, তাতে আমি কী (দোয়া) পড়বো?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি বলবে- ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আ’ফুয়্যুন; তুহিব্বুল আ’ফওয়া; ফা’ফু আ’ন্নী।’

অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল; ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মিশকাত)

লাইলাতুল কদরের মর্যাদা

লাইলাতুল কদরের মর্যাদা এত বেশি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাতটি পাওয়ার জন্য শেষ দশকে আজীবন ইতেকাফ করেছেন।

উম্মতে মুহাম্মদীর উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমি কদরের রাতের সন্ধানে (রমজানের) প্রথম ১০ দিন ইতিকাফ করলাম। এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন। তারপর আমার প্রতি ওহি নাযিল করে জানানো হলো যে, তা শেষ ১০ দিনে রয়েছে। সুতরাং তোমাদের যে ইতিকাফ পছন্দ করবে, সে যেন ইতিকাফ করে। তারপর মানুষ (সাহাবায়ে কেরাম) তাঁর সঙ্গে ইতেকাফে শরিক হয়।’ (মুসলিম শরীফ)

কদর রাতের ফজিলত

মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাযিল হওয়ার কারণে অন্যসব মাসের চেয়ে রমজান মাস বেশি ফজিলত ও বরকতময় হয়েছে। আর রমজানের রাতগুলোর মধ্যে কোরআন নাযিলের রাত লাইলাতুল ক্বদর সবচেয়ে তাৎপর্যমণ্ডিত একটি রাত।

এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি একে নাযিল করেছি কদরের রাতে। তুমি কি জান ক্বদরের রাত কি? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (সূরা: কদর, আয়াত: ১-৩)।

এ আয়াতের ব্যাখায় মুফাসসিরকুল শিরোমণি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, ‘এ রাতের ইবাদত অন্য হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম’। (তানবিরুল মিকবাস মিন তাফসিরে ইবনে আব্বাসঃ ৬৫৪ পৃষ্ঠা)।

তাবেয়ি মুজাহিদ (র.) বলেন, এর ভাবার্থ হলো, ‘এ রাতের ইবাদত, তেলাওয়াত, দরুদ কিয়াম ও অন্যান্য আমল হাজার মাস ইবাদতের চেয়েও উত্তম। ’

মুফাসসিররা এমনই ব্যাখ্যা করেছেন। আর এটিই সঠিক ব্যাখ্যা। (ইবনে কাসির: ১৮ খণ্ড, ২২৩ পৃষ্ঠা)।

শবে কদরের আমল

সুতরাং লাইলাতুল কদর পেলে এ আমল ও দোয়া রাত অতিবাহিত করা জরুরি। তা হলো-

১. নফল নামাজ পড়া।

২. মসজিদে ঢুকেই ২ রাকাত (দুখুলিল মাসজিদ) নামাজ পড়া।

৩. দুই দুই রাকাত করে (মাগরিবের পর ৬ রাকাত) আউওয়াবিনের নামাজ পড়া।

৪. রাতে তারাবির নামাজ পড়া।

৫. শেষ রাতে সাহরির আগে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া।

৬. সম্ভব হলে সালাতুত তাসবিহ পড়া।

৬. সম্ভব হলে তাওবার নামাজ পড়া।

৭. সম্ভব হলে সালাতুল হাজাত পড়া।

৮. সম্ভব হলে সালাতুশ শোকর ও অন্যান্য নফল নামাজ বেশি বেশি পড়া।

৯. কুরআন তেলাওয়াত করা। সুরা কদর, সুরা দুখান, সুরা মুয্যাম্মিল, সুরা মুদ্দাসির, সুরা ইয়াসিন, সুরা ত্বহা, সুরা আর-রাহমান, সুরা ওয়াকিয়া, সুরা মুলক, সুরা কুরাইশ এবং ৪ কুল পড়া।

১০. দরূদ শরিফ পড়া।

১১. তাওবাহ-ইসতেগফার পড়া। সাইয়্যেদুল ইসতেগফার পড়া।

১১. জিকির-আজকার করা।

১২. কুরআন-সুন্নায় বর্ণিত দোয়াপড়া।

১৩. পরিবার পরিজন, বাবা-মা ও মৃতদের জন্য দোয়া করা, কবর জেয়ারত করা।

১৪. বেশি বেশি দান-সদকা করা। আমীন।

Please Share This Post in Your Social Media

আপডেট: ১২:৪৪:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ মার্চ ২০২৫
২৬

মর্যাদাপূর্ণ রজনি শবে কদরের তাৎপর্য ও ফজিলত

আপডেট: ১২:৪৪:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ মার্চ ২০২৫

গ্রামের সংবাদ ডেস্ক : পবিত্র রমজান মাসের সবচেয়ে পুণ্যময় একটি রজনীর নাম হচ্ছে লাইলাতুলকদর, যা ‘শবে কদর’ নামে পরিচিত। এই রজনীর বরকত ও পুণ্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের পূর্ণ একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। এই রাতের ফজিলত পবিত্র কুরআনুল কারীমে বর্ণিত হয়েছে, ‘কদরের এরাতটি এক হাজার মাসের (ইবাদতের) চেয়ে উত্তম। ‘ এক হাজার মাসে তিরাশি বছর চার মাস হয়ে থাকে। ওই ব্যক্তি ভাগ্যবান, যে এই রাতটি ইবাদত বন্দেগীর মধ্যে কাটিয়ে দিতে পারে। কেননা, এর মাধ্যমে সে তিরাশি বছর চার মাসের চেয়েও বেশি সময় ইবাদতে লিপ্ত থাকার সৌভাগ্য অর্জন করে। আর অধিক সময়ের সীমা কী তা একমাত্র আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কেউ বলতে পারে না। কুরআনে পাকে হাজার মাসের অধিক বলার কারণ হল, তখনকার আরবদের মধ্যে গণনার ক্ষেত্রে হাজারকেই সবচেয়ে বড় সংখ্যা গণ্য করা হত। অতএব, কুরআনের উদ্দেশ্য এখানে হাজার মাসে সীমাবদ্ধ করা নয়; বরং অধিক বুঝানোই উদ্দেশ্য। নি¤েœ পবিত্র কুরআনে এই পুণ্যময় রজনী সম্পর্কে যে ঘোষণা এসেছে, তার সারমর্ম তুলে ধরা হল।

পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হচ্ছে : নিশ্চয় আমি কুরআন শরীফ কদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি। (সূরা কদর : ১)। এই আয়াতের মর্ম হল: কুরআন শরীফ লওহে মাহফুয হতে দুনিয়ার আকাশে এ রাতে অবতীর্ণ করা হয়েছে। এই একটি মাত্র বিষয়ই এ রাতের ফযীলতের জন্য যথেষ্ট ছিল যে, আল-কুরআনের মতো মর্যাদাবান ঐশীগ্রন্হ এ রাতে অবতীর্ণ হয়েছে, এই রাতের মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের জন্য অন্য কোনো ফযীলত ও বরকতের প্রয়োজন ছিল না। তদুপরি পরবর্তী আয়াতে আগ্রহ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ইরশাদ হচ্ছে : আপনি কি অবগত আছেন যে, কদরের রাত কত মর্যাদা সম্পন্ন রাত? (সূরা কদর : ২)। অর্থাৎ এ রাতের মাহাত্ম্য ও ফযীলত সম্পর্কে আপনি কি অবগত রয়েছেন যে, এ রাতের কতটুকু কল্যাণ ও কী পরিমাণ ফযীলত রয়েছে? অত:পর এ রাতের ফযীলতের বিবরণ আলোচিত হয়েছে : শবে কদর হল হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। (সূরা কদর : ৩)। এর সারমর্ম হল, হাজার মাস ইবাদত করলে যে পরিমাণ সাওয়াব হয়, কদরের রাতে ইবাদত করার সাওয়াব এর চেয়েও বেশি। আর এ বেশি হওয়ার কোনো সীমারেখা নেই যে, কি পরিমাণ বেশি সাওয়াব হবে। ‘এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে।’ (সূরা কদর : ৪)।

আল্লামা রাযী (রহ.) লিখেছেন যে, ফেরেশতাগণ যখন প্রথমাবস্থায় পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা হিসেবে মানুষ সৃষ্টির সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন, তখন মানুষের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রকাশ করে আল্লাহ তাআলার দরবারে আরজ করেছিলেন যে, আপনি এমন এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন, যারা দুনিয়ায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং রক্ত প্রবাহিত করবে। এমতাবস্থায় শবে কদরে আল্লাহর পক্ষ হতে তাওফীকপ্রাপ্ত হয়ে যখন মানুষ আল্লাহ তাআলার পরিচিতি লাভ ও আনুগত্যকরণে লিপ্ত হয়, তখন ফেরেশতাগণ তাদের অজ্ঞতার ওযর পেশ করার জন্য অবতীর্ণ হন। এ রাতে ‘রুহুল কুদুস’ তথা হযরত জিবরাঈল (আ.)-ও অবতরণ করেন। এ প্রসঙ্গে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, শবে কদরে হযরত জিবরাঈল (আ.) একদল ফেরেশতাসহ অবতরণ করেন এবং যে ব্যক্তিকে যিকির ও অন্যান্য ইবাদতে লিপ্ত দেখেন, তার জন্য রহমতের দুআ করে থাকেন। ‘তাঁদের রবের নির্দেশে প্রত্যেক কল্যাণকর বিষয়সহ (পৃথিবীর দিকে অবতরণ করেন)। হাদীসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ মাযাহিরে হকের মধ্যে উল্লেখ আছে যে, এ রাতে ফেরেশতাদের জন্ম হয়েছে। এ রাতে হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করার উপকরণ একত্রিত করা আরম্ভ হয়েছে। এ রাতে জান্নাতে গাছ সৃষ্টি হয়েছে এবং এ রাতে দুআ ও অন্যান্য ইবাদত কবূল হওয়ার বিবরণও অনেক বর্ণনায় বিদ্যমান রয়েছে। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এ রাতে হযরত ঈসা (আ.) কে আসমানে ওঠিয়ে নেয়া হয়েছে এবং এ রাতে বনী ইসরাঈলের তওবা কবূল করা হয়েছে। ‘এ রাত সালাম তথা নিরাপত্তার রাত, যা ফজর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’ (সূরা কদর : ৫)।

তিনটি সংশয় ও তার সমাধান : প্রথম সংশয় : কুরআনে কারীমে শবে কদরকে হাজার মাস থেকে উত্তম আখ্যা দেয়া হয়েছে। এখানে সংশয় হল প্রতি বছরই তো একটি শবে কদরের আগমন ঘটবে, অর্থাৎ, সাওয়াবের জন্য পদত্ত হাজার মাস তথা তিরাশি বৎসরের মধ্যেও তো তিরাশিটি শবে কদর রয়েছে। এক্ষেত্রে হিসাব কীভাবে করবে? তাফসীরে মাআরিফুল কুরআনে এ সংশয়ের নিরসনে বলা হয়েছে যে, এই হিসাব থেকে শবে কদর বাদ দিতে হবে। আর শবে কদরকে বাদ দিয়ে হিসাব করলে হিসাবের সমস্যা নিরসন হয়ে যায়। দ্বিতীয় সংশয় : অনেকের মধ্যেই একটি সংশয় হল যে, সারাবিশ্বেই কি শবে কদর একই সময় হয়ে থাকে ? ফেকাহবিদগণ বলেছেন যে, শবে কদরের বিষয়টি মূলত: চাঁদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে দেশে যেদিন চাঁদ উদিত হবে, সেই দেশে সেখানকার চাঁদ উদয়ের তারিখ হিসাব করে শবে কদর সাব্যস্ত করতে হবে। তৃতীয় সংশয় : অনেকেই মনে করে থাকেন, যে রাতে শবে কদর হবে, সে রাতের পুরোটাই ইবাদত বন্দেগীতে কাটাতে সক্ষম হলেই হাজার মাসের সাওয়াব অর্জিত হবে, অন্যথায় নয়। এ প্রসঙ্গে হাদীসের বিশুদ্ধ কিতাব মুসলিম শরীফে হযরত ওসমান (রা.) মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। যাতে বলা হয়েছে: ‘যে ব্যক্তি ইশার নামাজ জামাআতের সঙ্গে আদায় করল, সে অর্ধরাত নফল ইবাদতের সাওয়াব পেল। আর সেই ব্যক্তি যখন ফজরের নামাযও জামাআতের সঙ্গে আদায় করল, সে সম্পূর্ণ রাত জেগে থেকে ইবাদত করার সাওয়াব অর্জন করল।’ [মাআরিফুল কুরআন: খন্ড-৮, পৃষ্ঠা-৭৯৩]

শবে বরাত ও শবে কদরের পার্থক্য : ‘শব’ ফার্সি শব্দ। আরবীতে ‘লাইলাতুন’ এর প্রতিশব্দ। অর্থাৎ লাইলাতুল ‘বরাত’ এবং ‘লাইলাতুল কদর’। ‘শব’ বা ‘লাইলাতুন’ শব্দের অর্থ ‘রাত’। আর ‘বরাত’ শব্দের অর্থ হল: ‘ক্ষমা লাভ করা’ বা ‘নাজাতপ্রাপ্ত হওয়া’। এ হিসাবে ‘লাইলাতুল বরাত’ বা ‘শবে বরাতে’র অর্থ হল: ‘ক্ষমা লাভ করার রাত’ বা ‘নাজাত প্রাপ্তির রাত’। আর ‘লাইলাতুল বরাতের’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্ধ শাবানের রাত (শাবানের ১৫ তারিখের রাত)। এ রাতেও মানবজাতির এক বছরের জাগতিক সব বিষয় ফায়সালা করা হয়। আর ‘কদর’ শব্দের অর্থ হল: ‘সম্মান ও মর্যাদা’। এ হিসাবে ‘লাইলাতুল কদর’ -এর অর্থ দাঁড়ায়- ‘সম্মান ও মর্যাদা অর্জনের রাত’। হযরত আবু বকর ওয়ারাকাহ (রহ.) বলেন: এ রাতকে এজন্য ‘লাইলাতুল কদর’ বলাহয় যে, ইতিপূর্বে আমলহীনতার কারণে যে ব্যক্তির কোনো কদর ও সম্মান-মর্যাদা ছিল না, এ রাতের তওবা, ইস্তিগফার ও ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে সে ব্যক্তি মর্যাদাবান ও সম্মানিত হয়ে যায়। কদরের আরেকটি অর্থ হচ্ছে ‘তাকদীর’। এ অর্থ হিসেবে ‘লাইলাতুল কদর’ নামকরণের কারণ হচ্ছে, তাকদীরের যে অংশ এ বছর রমজান হতে পরবর্তী রমজান পর্যন্ত বাস্তবায়িত ও সংঘটিত হবে তা ওইসব ফেরেশতাদের কাছে সোপর্দ করা হয়, যারা জাগতিক বিষয়াদি বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন।

শবে কদর অর্থ হলো মর্যাদাপূর্ণ রাত বা ভাগ্যরজনি। শবে কদরের আরবি হলো লাইলাতুল কদর তথা সম্মানিত রাত। লাইলাতুল কদরের রাত হচ্ছে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত।

পবিত্র কুরআনুল কারিম নাযিলের মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই রাতকে হাজারের মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ উত্তম ও মহা সম্মানিত রাত হিসেবে আমাদের জন্য দান করেছেন। প্রতিবছর রমজান মাসের শেষ দশকের রাতগুলোর মধ্যে কোনো এক বিজোড় রাত হলো ভাগ্য নির্ধারণ বা লাইলাতুল কদরের রাত।

যে রাতে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে, সে রাতই লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কুরআন নাজিল করেছি মর্যাদাপূর্ণ কদর রজনীতে। আপনি কি জানেন, মহিমাময় কদর রজনী কী? মহিমান্বিত কদর রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালামকে সমভিব্যহারে অবতরণ করেন; তাঁদের প্রভু মহান আল্লাহর নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে, সব বিষয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে। এই শান্তির ধারা চলতে থাকে উষা বা ফজর পর্যন্ত। (আল কুরআন, সুরা-৯৭ [২৫] আল কদর)

রমজান মাস পবিত্র কুরআন নাযিলের মাস। শবে কদর কুরআন নাযিলের রাত। এ রাতেই প্রথম পবিত্র মক্কা মুকাররমার হেরা পর্বতের গুহায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের সরদার হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে রাহমতুল্লিল আলামিন প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাযিল করেন।

এ কারণে আল্লাহ তায়ালা এ রাতের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ রাতে মহান আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মাদিকে হাজার মাসের ইবাদত-বন্দেগি ও আমলের সমান সাওয়াব দান করে। কুরআনুল কারিমের অন্য স্থানে এ রাতটিকে বরকতময় রাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন- হা-মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমি একে (কুরআন) এক বরকতময় রাতে নাজিল করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, আমিই প্রেরণকারী। আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা দুখান : আয়াত ১-৬)

কুরআন নাযিলের কারণে মর্যাদার এ রাতের কথা উল্লেখ করার পর যে মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে সে মাসের কথাও আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে উল্লেখ করেছেন এভাবে-

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রমজান মাস! এমন একটি মাস যে মাসে কোরআন নাযিল হয়েছে মানবের মুক্তির দিশারি ও হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনরূপে।’ (সুরা-২ আল বাকারা, আয়াত: ১৮৫)।

সুতরাং লাইলাতুল ক্বদরের রাতে আল্লাহর ওইসব বান্দারা সবচেয়ে বেশি সম্মানিত ও মর্যাদার অধিকারী হবেন, যাদের সঙ্গে কুরআনের সম্পর্ক বেশি। যিনি কুরআন-সুন্নাহর আলোকেই নিজের জীবন পরিচালিত করবেন। বাস্তবজীবনে কোরআন-সুন্নাহর আমলে সাজাবেন জীবন। আর তারাই হবেন সফল।

মর্যাদার এ রাত পেলে মুমিন বান্দা আল্লাহর কাছে কী প্রার্থনা করবেন? কী চাইবেন? এ সম্পর্কে হাদিসের একটি বর্ণনা এভাবে এসেছে- হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, একবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম- হে আল্লাহর রাসুল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনি বলে দিন, আমি লাইলাতুল কদর কোন রাতে হবে তা জানতে পারি, তাতে আমি কী (দোয়া) পড়বো?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি বলবে- ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আ’ফুয়্যুন; তুহিব্বুল আ’ফওয়া; ফা’ফু আ’ন্নী।’

অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল; ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মিশকাত)

লাইলাতুল কদরের মর্যাদা

লাইলাতুল কদরের মর্যাদা এত বেশি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাতটি পাওয়ার জন্য শেষ দশকে আজীবন ইতেকাফ করেছেন।

উম্মতে মুহাম্মদীর উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমি কদরের রাতের সন্ধানে (রমজানের) প্রথম ১০ দিন ইতিকাফ করলাম। এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন। তারপর আমার প্রতি ওহি নাযিল করে জানানো হলো যে, তা শেষ ১০ দিনে রয়েছে। সুতরাং তোমাদের যে ইতিকাফ পছন্দ করবে, সে যেন ইতিকাফ করে। তারপর মানুষ (সাহাবায়ে কেরাম) তাঁর সঙ্গে ইতেকাফে শরিক হয়।’ (মুসলিম শরীফ)

কদর রাতের ফজিলত

মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাযিল হওয়ার কারণে অন্যসব মাসের চেয়ে রমজান মাস বেশি ফজিলত ও বরকতময় হয়েছে। আর রমজানের রাতগুলোর মধ্যে কোরআন নাযিলের রাত লাইলাতুল ক্বদর সবচেয়ে তাৎপর্যমণ্ডিত একটি রাত।

এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি একে নাযিল করেছি কদরের রাতে। তুমি কি জান ক্বদরের রাত কি? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (সূরা: কদর, আয়াত: ১-৩)।

এ আয়াতের ব্যাখায় মুফাসসিরকুল শিরোমণি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, ‘এ রাতের ইবাদত অন্য হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম’। (তানবিরুল মিকবাস মিন তাফসিরে ইবনে আব্বাসঃ ৬৫৪ পৃষ্ঠা)।

তাবেয়ি মুজাহিদ (র.) বলেন, এর ভাবার্থ হলো, ‘এ রাতের ইবাদত, তেলাওয়াত, দরুদ কিয়াম ও অন্যান্য আমল হাজার মাস ইবাদতের চেয়েও উত্তম। ’

মুফাসসিররা এমনই ব্যাখ্যা করেছেন। আর এটিই সঠিক ব্যাখ্যা। (ইবনে কাসির: ১৮ খণ্ড, ২২৩ পৃষ্ঠা)।

শবে কদরের আমল

সুতরাং লাইলাতুল কদর পেলে এ আমল ও দোয়া রাত অতিবাহিত করা জরুরি। তা হলো-

১. নফল নামাজ পড়া।

২. মসজিদে ঢুকেই ২ রাকাত (দুখুলিল মাসজিদ) নামাজ পড়া।

৩. দুই দুই রাকাত করে (মাগরিবের পর ৬ রাকাত) আউওয়াবিনের নামাজ পড়া।

৪. রাতে তারাবির নামাজ পড়া।

৫. শেষ রাতে সাহরির আগে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া।

৬. সম্ভব হলে সালাতুত তাসবিহ পড়া।

৬. সম্ভব হলে তাওবার নামাজ পড়া।

৭. সম্ভব হলে সালাতুল হাজাত পড়া।

৮. সম্ভব হলে সালাতুশ শোকর ও অন্যান্য নফল নামাজ বেশি বেশি পড়া।

৯. কুরআন তেলাওয়াত করা। সুরা কদর, সুরা দুখান, সুরা মুয্যাম্মিল, সুরা মুদ্দাসির, সুরা ইয়াসিন, সুরা ত্বহা, সুরা আর-রাহমান, সুরা ওয়াকিয়া, সুরা মুলক, সুরা কুরাইশ এবং ৪ কুল পড়া।

১০. দরূদ শরিফ পড়া।

১১. তাওবাহ-ইসতেগফার পড়া। সাইয়্যেদুল ইসতেগফার পড়া।

১১. জিকির-আজকার করা।

১২. কুরআন-সুন্নায় বর্ণিত দোয়াপড়া।

১৩. পরিবার পরিজন, বাবা-মা ও মৃতদের জন্য দোয়া করা, কবর জেয়ারত করা।

১৪. বেশি বেশি দান-সদকা করা। আমীন।