০৭:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

সত্যের অপলাপ : কার্ড বাণিজ্য ও ‘অপসাংবাদিকতা’: মফস্বলে কোণঠাসা সৎ সাংবাদিকরা, সীমান্তে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ‘ডামি’ রিপোর্টার

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৩:৫১:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
  • / ১৫

মো: আনিছুর রহমান : মফস্বল সাংবাদিকতা এক চরম বাস্তবতার নাম। একদিকে এই মহান পেশার মর্যাদা রক্ষা, অন্যদিকে নিজের সংসার ও পরিবার-পরিজন সামলানোর কঠিন যুদ্ধ। এই দুইয়ের টানাপোড়েনের মাঝেই গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনপদের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে সংবাদমাধ্যমে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে দেশের সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে এই চিত্র ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সেখানে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নামধারী ‘সাংবাদিকদের’ সংখ্যা, যার নেপথ্যে রয়েছে মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যমের কার্ড বাণিজ্য এবং এক শ্রেণীর অসাধু মানুষের চাঁদাবাজি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের কিছু তথাকথিত জাতীয় পত্রিকা এবং অখ্যাত কিছু স্যাটেলাইট/আইপি টেলিভিশন কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই কেবল টাকার বিনিময়ে মফস্বলে ‘প্রতিনিধি’ নিয়োগ দিচ্ছে এবং আইডি কার্ড ধরিয়ে দিচ্ছে। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এই সুযোগ নিয়ে অনেক অসৎ ও টাউট প্রকৃতির লোক ওইসব টেলিভিশনের লোগো ব্যবহার করে চাঁদাবাজির খেলায় মেতে উঠছে।

পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এই তথাকথিত সাংবাদিকদের অনেকেই নিজের নাম পর্যন্ত সঠিকভাবে লিখতে পারেন না। এমনকি অনেক জাতীয় পত্রিকার মফস্বল প্রতিনিধি আছেন, যারা নিজেদের ইমেইল আইডি পর্যন্ত ওপেন করতে পারেন না; পারেন না খবরের নিচে নিজের নামটুকু টাইপ করতে। এরা মূলত বড় বড় উপহার বা উপঢৌকন দিয়ে পত্রিকার সম্পাদক বা কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে আইডি কার্ড সংগ্রহ করে আনেন।

নিজেদের অপরাধের পরিধি বাড়াতে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এই চক্রটি এখন আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে। এই সমস্ত ধান্দাবাজ, অশিক্ষিত নামধারী সাংবাদিকরা নিজেদের পরিবারের सदस्यों/সদস্যদের নামেও সাংবাদিকের কার্ড সংগ্রহ করে দিচ্ছে। মূল লক্ষ্য একটাই—পারিবারিক সিন্ডিকেট তৈরি করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কার্ডের ভয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণা করা।

মফস্বল সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, সৎ সাংবাদিকদের কোনো নিয়মিত বেতন-ভাতা নেই। দেশের মুষ্টিমেয় কিছু ভালো পত্রিকা ও টেলিভিশন বাদে সিংহভাগ গণমাধ্যমই মফস্বল प्रतिनिधियों কোনো আর্থিক সুবিধা দেয় না। এদের চলতে হয় সম্পূর্ণ নিজেদের ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্য বা বিকল্প আয়ের ওপর ভর করে। বড়জোর পত্রিকাগুলোর জন্য বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতে পারলে সামান্য কিছু commission/কমিশন পাওয়া যায়, যা দিয়ে বর্তমান বাজারে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব।

অথচ, এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় টাউট-বাটপার ঘরানার নামধারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে। সাংবাদিকতাকে ঢাল বানিয়ে চাঁদাবাজি ও দালালি করে এরা রাতারাতি গাড়ি-বাড়ির মালিক বনে যাচ্ছে, যা একজন সৎ সাংবাদিকের বৈধ আয়ে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এই ডামি সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি। এদের মাঠ পর্যায়ে কাজ করার বা তথ্য সংগ্রহের কোনো ন্যূনতম যোগ্যতা নেই। এরা সারাদিন ঘোরাঘুরি শেষে ছুটে যায় ওইসব সৎ ও প্রকৃত সাংবাদিকদের কাছে, যারা দিনভর কষ্ট করে সংবাদ তৈরি করেন। এরপর তাদের কাছ থেকে তথ্য ও খবর ‘হাউলাদ’ বা ধার করে নিয়ে নিজেদের পত্রিকায় বা টেলিভিশনে পাঠিয়ে দেয়।

মফস্বলে এখনো অনেক সৎ, নিষ্ঠাবান এবং সাহসী সাংবাদিক রয়েছেন, যারা শত কষ্টের মাঝেও এই পেশার মর্যাদা ধরে রেখেছেন। কিন্তু ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা নামধারী সাংবাদিক এবং কিছু স্বনামধন্য পত্রিকা ও টেলিভিশনের এই नैतिक স্খলন পুরো সাংবাদিক সমাজকে কলঙ্কিত করছে।

স্থানীয় সচেতন মহল এবং প্রবীণ সাংবাদিকদের মতে, এখনই যদি প্রেস কাউন্সিল, জেলা প্রশাসন এবং মূলধারার গণমাধ্যমের সম্পাদকরা মফস্বল প্রতিনিধি নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সততার মাপকাঠি নির্ধারণ না করেন, তবে প্রান্তিক পর্যায়ে সাংবাদিকতা কেবলই একটি ‘চাঁদাবাজির হাতিয়ারে’ পরিণত হবে।

আবার দেখা যাচ্ছে কিছু অশিক্ষিত মূর্খ লোক বেতন-ভাতা দিয়ে তার নিজের দোকান বা অফিস বানিয়ে একটি কম্পিউটার ক্রয় করে অনলাইন খুলে সাংবাদিকতা করছে। আর গ্রামের সাধারণ লোকদের সামান্য কোনো ত্রুটি দেখিয়ে সংবাদ প্রকাশের হুমকি দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। আমাদের দাবি, এসব রেজিস্ট্রেশনবিহীন অনলাইন পোর্টাল বাতিল করা হোক।

Please Share This Post in Your Social Media

সত্যের অপলাপ : কার্ড বাণিজ্য ও ‘অপসাংবাদিকতা’: মফস্বলে কোণঠাসা সৎ সাংবাদিকরা, সীমান্তে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ‘ডামি’ রিপোর্টার

আপডেট: ০৩:৫১:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

মো: আনিছুর রহমান : মফস্বল সাংবাদিকতা এক চরম বাস্তবতার নাম। একদিকে এই মহান পেশার মর্যাদা রক্ষা, অন্যদিকে নিজের সংসার ও পরিবার-পরিজন সামলানোর কঠিন যুদ্ধ। এই দুইয়ের টানাপোড়েনের মাঝেই গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনপদের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে সংবাদমাধ্যমে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে দেশের সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে এই চিত্র ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সেখানে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নামধারী ‘সাংবাদিকদের’ সংখ্যা, যার নেপথ্যে রয়েছে মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যমের কার্ড বাণিজ্য এবং এক শ্রেণীর অসাধু মানুষের চাঁদাবাজি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের কিছু তথাকথিত জাতীয় পত্রিকা এবং অখ্যাত কিছু স্যাটেলাইট/আইপি টেলিভিশন কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই কেবল টাকার বিনিময়ে মফস্বলে ‘প্রতিনিধি’ নিয়োগ দিচ্ছে এবং আইডি কার্ড ধরিয়ে দিচ্ছে। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এই সুযোগ নিয়ে অনেক অসৎ ও টাউট প্রকৃতির লোক ওইসব টেলিভিশনের লোগো ব্যবহার করে চাঁদাবাজির খেলায় মেতে উঠছে।

পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এই তথাকথিত সাংবাদিকদের অনেকেই নিজের নাম পর্যন্ত সঠিকভাবে লিখতে পারেন না। এমনকি অনেক জাতীয় পত্রিকার মফস্বল প্রতিনিধি আছেন, যারা নিজেদের ইমেইল আইডি পর্যন্ত ওপেন করতে পারেন না; পারেন না খবরের নিচে নিজের নামটুকু টাইপ করতে। এরা মূলত বড় বড় উপহার বা উপঢৌকন দিয়ে পত্রিকার সম্পাদক বা কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে আইডি কার্ড সংগ্রহ করে আনেন।

নিজেদের অপরাধের পরিধি বাড়াতে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এই চক্রটি এখন আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে। এই সমস্ত ধান্দাবাজ, অশিক্ষিত নামধারী সাংবাদিকরা নিজেদের পরিবারের सदस्यों/সদস্যদের নামেও সাংবাদিকের কার্ড সংগ্রহ করে দিচ্ছে। মূল লক্ষ্য একটাই—পারিবারিক সিন্ডিকেট তৈরি করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কার্ডের ভয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণা করা।

মফস্বল সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, সৎ সাংবাদিকদের কোনো নিয়মিত বেতন-ভাতা নেই। দেশের মুষ্টিমেয় কিছু ভালো পত্রিকা ও টেলিভিশন বাদে সিংহভাগ গণমাধ্যমই মফস্বল प्रतिनिधियों কোনো আর্থিক সুবিধা দেয় না। এদের চলতে হয় সম্পূর্ণ নিজেদের ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্য বা বিকল্প আয়ের ওপর ভর করে। বড়জোর পত্রিকাগুলোর জন্য বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতে পারলে সামান্য কিছু commission/কমিশন পাওয়া যায়, যা দিয়ে বর্তমান বাজারে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব।

অথচ, এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় টাউট-বাটপার ঘরানার নামধারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে। সাংবাদিকতাকে ঢাল বানিয়ে চাঁদাবাজি ও দালালি করে এরা রাতারাতি গাড়ি-বাড়ির মালিক বনে যাচ্ছে, যা একজন সৎ সাংবাদিকের বৈধ আয়ে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এই ডামি সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি। এদের মাঠ পর্যায়ে কাজ করার বা তথ্য সংগ্রহের কোনো ন্যূনতম যোগ্যতা নেই। এরা সারাদিন ঘোরাঘুরি শেষে ছুটে যায় ওইসব সৎ ও প্রকৃত সাংবাদিকদের কাছে, যারা দিনভর কষ্ট করে সংবাদ তৈরি করেন। এরপর তাদের কাছ থেকে তথ্য ও খবর ‘হাউলাদ’ বা ধার করে নিয়ে নিজেদের পত্রিকায় বা টেলিভিশনে পাঠিয়ে দেয়।

মফস্বলে এখনো অনেক সৎ, নিষ্ঠাবান এবং সাহসী সাংবাদিক রয়েছেন, যারা শত কষ্টের মাঝেও এই পেশার মর্যাদা ধরে রেখেছেন। কিন্তু ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা নামধারী সাংবাদিক এবং কিছু স্বনামধন্য পত্রিকা ও টেলিভিশনের এই नैतिक স্খলন পুরো সাংবাদিক সমাজকে কলঙ্কিত করছে।

স্থানীয় সচেতন মহল এবং প্রবীণ সাংবাদিকদের মতে, এখনই যদি প্রেস কাউন্সিল, জেলা প্রশাসন এবং মূলধারার গণমাধ্যমের সম্পাদকরা মফস্বল প্রতিনিধি নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সততার মাপকাঠি নির্ধারণ না করেন, তবে প্রান্তিক পর্যায়ে সাংবাদিকতা কেবলই একটি ‘চাঁদাবাজির হাতিয়ারে’ পরিণত হবে।

আবার দেখা যাচ্ছে কিছু অশিক্ষিত মূর্খ লোক বেতন-ভাতা দিয়ে তার নিজের দোকান বা অফিস বানিয়ে একটি কম্পিউটার ক্রয় করে অনলাইন খুলে সাংবাদিকতা করছে। আর গ্রামের সাধারণ লোকদের সামান্য কোনো ত্রুটি দেখিয়ে সংবাদ প্রকাশের হুমকি দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। আমাদের দাবি, এসব রেজিস্ট্রেশনবিহীন অনলাইন পোর্টাল বাতিল করা হোক।