শূন্য পদের ভারে মাধ্যমিক শিক্ষা
- আপডেট: ০৮:৩৪:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
- / ৭

. স্বপন বিশ্বাস :
একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার শক্তি কেবল পাঠ্যক্রম, ভবন কিংবা প্রযুক্তিতে নয়; তার প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে দক্ষ শিক্ষক, যোগ্য শিক্ষা প্রশাসক এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থার ওপর। এই তিনটি স্তম্ভের যেকোনো একটি দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই টালমাটাল হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা আজ এমনই এক বাস্তবতার মুখোমুখি। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিদ্যালয় পরিদর্শন শাখার জনবল চিত্র উদ্বেগজনক। প্রধান শিক্ষকের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি পদ শূন্য, সহকারী প্রধান শিক্ষকের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পদ শূন্য। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিদ্যালয় পরিদর্শক ও সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শকের শতভাগ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বিপুলসংখ্যক পদও খালি। অন্যদিকে সিনিয়র শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদও পূরণ হয়নি।
যদি এই পরিসংখ্যান বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন হয়, তবে এটি কেবল জনবল সংকট নয়; এটি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। একটি বিদ্যালয়ের প্রাণ তার প্রধান শিক্ষক। তিনি শুধু অফিস পরিচালনা করেন না; শিক্ষকদের অনুপ্রাণিত করেন, শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করেন এবং বিদ্যালয়ের একাডেমিক নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক বা সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলে সেই প্রতিষ্ঠান কেবল দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে নিতে পারে, কিন্তু এগিয়ে যেতে পারে না। ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব কখনোই স্থায়ী নেতৃত্বের বিকল্প হতে পারে না।
আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হয় তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে। বিদ্যালয় পরিদর্শক এবং সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শকের পদ শতভাগ শূন্য থাকার অর্থ, বিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক পরিবেশ, পাঠদানের মান, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন কিংবা শিক্ষার গুণগত অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য কার্যকর কোনো কাঠামো নেই।
শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিদর্শনের বিকল্প নেই। তদারকি দুর্বল হলে ভালো ও খারাপ—উভয় ধরনের চর্চাই অদৃশ্য হয়ে যায়। মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের অবস্থাও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জনবল সংকটের কারণে একজন কর্মকর্তাকে একাধিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে বিদ্যালয়ের সমস্যার দ্রুত সমাধান, শিক্ষকদের পেশাগত সহায়তা, সরকারি নীতিমালার বাস্তবায়ন কিংবা নতুন উদ্যোগের কার্যকারিতা—সবকিছুই ধীর হয়ে পড়ে।
শিক্ষা প্রশাসনের এই স্থবিরতা শেষ পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষেই প্রতিফলিত হয়। শিক্ষকসংকটের প্রভাব আরও সরাসরি। একজন শিক্ষককে যখন অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হয় অথবা নিজের বিষয়ের বাইরে অন্য বিষয় পড়াতে হয়, তখন শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া স্বাভাবিক। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়নে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তার পেছনে শিক্ষক ও প্রশাসনিক সংকটও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। এখানে একটি অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে। সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার এসব শূন্যপদ পূরণ করা গেলে একদিকে যেমন প্রশাসনিক গতি ফিরে আসবে, অন্যদিকে বিশ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য এটি হবে একটি ইতিবাচক বার্তা।
রাষ্ট্র যখন দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের কথা বলে, তখন অনুমোদিত পদ বছরের পর বছর শূন্য রাখা সেই লক্ষ্যকেই দুর্বল করে। প্রশ্ন হলো, কেন এই পরিস্থিতি? নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা, পদোন্নতির জটিলতা, প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনার অভাব—এসব কারণ নতুন নয়। কিন্তু সমস্যার দীর্ঘস্থায়িত্ব প্রমাণ করে, এটি আর বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি নীতিগত মনোযোগের অভাবেরও প্রতিফলন।
শিক্ষা সংস্কার নিয়ে দেশে নানা আলোচনা হয়। পাঠ্যক্রম বদলায়, পরীক্ষা পদ্ধতি বদলায়, মূল্যায়নের ধরন বদলায়। কিন্তু শিক্ষা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল যদি না থাকে, তাহলে সেই সংস্কারের সুফল প্রত্যাশিতভাবে পাওয়া কঠিন। শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি হলো মানুষ। শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসনের দক্ষ কর্মকর্তাদের বিকল্প কোনো প্রযুক্তি এখনো তৈরি হয়নি।
বাংলাদেশ উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন দেখছে, তার ভিত্তি তৈরি হবে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। সেই শ্রেণিকক্ষ যদি নেতৃত্ব, তদারকি ও পর্যাপ্ত শিক্ষক থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতের মানবসম্পদও দুর্বল হবে। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের অর্থ কেবল নতুন ভবন নির্মাণ নয়; অনুমোদিত পদে সময়মতো যোগ্য জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার শূন্যপদগুলো তাই কেবল প্রশাসনিক সংখ্যা নয়; এগুলো জাতীয় উন্নয়নের সূচক। এই শূন্যতা যত দীর্ঘ হবে, তার প্রভাব তত গভীরভাবে পড়বে শিক্ষার মান, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর।
এখন প্রয়োজন দ্রুত, স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ, নিয়মিত পদোন্নতি এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ পরিকল্পনা। শিক্ষাকে যদি সত্যিই জাতীয় অগ্রাধিকারের খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে এই শূন্যপদ পূরণ আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। কারণ, একটি বিদ্যালয়ে খালি থাকা একটি পদ কেবল একটি চাকরির শূন্যতা নয়; সেটি অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত।



























