০৪:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও একজন পথ প্রদর্শক (শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রবন্ধ)

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০২:৩২:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ অগাস্ট ২০২৫
  • / ২৮৬

. স্বপন বিশ্বাস
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—একটি নাম, একটি ইতিহাস, একটি প্রাণভোমরা, যিনি বাঙালির হৃদয়ে চিরন্তন। তাঁর প্রয়াণ দিবসে আমরা কেবল একজন কবিকেই স্মরণ করি না, স্মরণ করি এক মহান মানবতাবাদী, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, সংগীতস্রষ্টা ও আত্মদর্শীকে, যাঁর প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে আছে বাংলার মাটি ও মানুষের গন্ধ। বিশেষ করে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ এক অনিবার্য আলোকবর্তিকা।

বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র সাহিত্যিক নন, তিনি এক সমাজমনস্ক পথপ্রদর্শক। তাঁর লেখা ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ আজ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। এই একটি গানেই বোঝা যায়, তিনি কেমন গভীর ভালোবাসায় ভালোবেসেছিলেন এই ভূখণ্ডকে। তিনি যে বাংলাকে চেনাতেন, তা কেবল বৃক্ষ, নদী, মাটি নয়; বরং ছিল এক আবেগ, এক ঐতিহ্য, এক আত্মিক বন্ধন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পূর্ববাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, পাবনার সাজাদপুর ও রাজশাহীর পটিসর—এই তিনটি জমিদার এলাকা তাঁর জীবনের গভীর অংশ হয়ে উঠেছিল। জমিদারি সূত্রে এলেও তিনি এই ভূমির কৃষক, সাধারণ মানুষ, প্রকৃতি ও নদীকে নিজের কবিতার ভাষায় তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বহু বিখ্যাত কবিতা, গল্প ও গান রচিত হয়েছে এই জনপদকে ঘিরে। বিশেষ করে ‘গল্পগুচ্ছ’-এর অনেক গল্পের পটভূমি গ্রামীণ পূর্ববঙ্গ।

শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে বসেই তিনি লিখেছেন ‘গীতাঞ্জলি’, যা তাঁকে এনে দেয় নোবেল পুরস্কার। গঙ্গার উপনদী পদ্মার তীরে বসে তিনি যেভাবে প্রকৃতি, মানুষ আর ঈশ্বরকে অনুভব করেছিলেন, তা শুধু সাহিত্যের দৃষ্টিতে নয়, আধ্যাত্মিক ভাবনাতেও এক চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রকাশ।
বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে উৎসব, চর্চা ও গবেষণার এক বিশাল ধারা রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রমাণ করে যে রবীন্দ্রনাথ এখনও আমাদের চিন্তার প্রেরণা হয়ে আছেন। তাঁর গান, কবিতা, নাটক ও প্রবন্ধ—সবই আমাদের বাঙালিত্বের পরিচয় বহন করে।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক আপসহীন কণ্ঠ। আজকের বাংলাদেশেও, যখন মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলা হয়, তখন রবীন্দ্রনাথই আমাদের ভরসা। তিনি লিখেছিলেন—
“সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।”
এই একটি চরণ আজও আমাদের অন্তরকে নাড়া দেয়।
তাঁর প্রয়াণ দিবসে আমাদের শপথ হোক—রবীন্দ্রনাথের উদারতা, মানবতা ও চেতনার আলোকে একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও সংস্কৃতিমনস্ক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। কবির মতোই বলি—
“যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়…”

Please Share This Post in Your Social Media

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও একজন পথ প্রদর্শক (শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রবন্ধ)

আপডেট: ০২:৩২:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ অগাস্ট ২০২৫

. স্বপন বিশ্বাস
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—একটি নাম, একটি ইতিহাস, একটি প্রাণভোমরা, যিনি বাঙালির হৃদয়ে চিরন্তন। তাঁর প্রয়াণ দিবসে আমরা কেবল একজন কবিকেই স্মরণ করি না, স্মরণ করি এক মহান মানবতাবাদী, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, সংগীতস্রষ্টা ও আত্মদর্শীকে, যাঁর প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে আছে বাংলার মাটি ও মানুষের গন্ধ। বিশেষ করে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ এক অনিবার্য আলোকবর্তিকা।

বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র সাহিত্যিক নন, তিনি এক সমাজমনস্ক পথপ্রদর্শক। তাঁর লেখা ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ আজ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। এই একটি গানেই বোঝা যায়, তিনি কেমন গভীর ভালোবাসায় ভালোবেসেছিলেন এই ভূখণ্ডকে। তিনি যে বাংলাকে চেনাতেন, তা কেবল বৃক্ষ, নদী, মাটি নয়; বরং ছিল এক আবেগ, এক ঐতিহ্য, এক আত্মিক বন্ধন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পূর্ববাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, পাবনার সাজাদপুর ও রাজশাহীর পটিসর—এই তিনটি জমিদার এলাকা তাঁর জীবনের গভীর অংশ হয়ে উঠেছিল। জমিদারি সূত্রে এলেও তিনি এই ভূমির কৃষক, সাধারণ মানুষ, প্রকৃতি ও নদীকে নিজের কবিতার ভাষায় তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বহু বিখ্যাত কবিতা, গল্প ও গান রচিত হয়েছে এই জনপদকে ঘিরে। বিশেষ করে ‘গল্পগুচ্ছ’-এর অনেক গল্পের পটভূমি গ্রামীণ পূর্ববঙ্গ।

শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে বসেই তিনি লিখেছেন ‘গীতাঞ্জলি’, যা তাঁকে এনে দেয় নোবেল পুরস্কার। গঙ্গার উপনদী পদ্মার তীরে বসে তিনি যেভাবে প্রকৃতি, মানুষ আর ঈশ্বরকে অনুভব করেছিলেন, তা শুধু সাহিত্যের দৃষ্টিতে নয়, আধ্যাত্মিক ভাবনাতেও এক চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রকাশ।
বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে উৎসব, চর্চা ও গবেষণার এক বিশাল ধারা রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রমাণ করে যে রবীন্দ্রনাথ এখনও আমাদের চিন্তার প্রেরণা হয়ে আছেন। তাঁর গান, কবিতা, নাটক ও প্রবন্ধ—সবই আমাদের বাঙালিত্বের পরিচয় বহন করে।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক আপসহীন কণ্ঠ। আজকের বাংলাদেশেও, যখন মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলা হয়, তখন রবীন্দ্রনাথই আমাদের ভরসা। তিনি লিখেছিলেন—
“সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।”
এই একটি চরণ আজও আমাদের অন্তরকে নাড়া দেয়।
তাঁর প্রয়াণ দিবসে আমাদের শপথ হোক—রবীন্দ্রনাথের উদারতা, মানবতা ও চেতনার আলোকে একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও সংস্কৃতিমনস্ক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। কবির মতোই বলি—
“যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়…”