স্মৃতির সেই কবিয়াল হাসেম আলী—হারিয়ে যাওয়া লোক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক
- আপডেট: ০৯:৩৪:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
- / ৫৯

লক্ষণ কুমার মন্ডল, শালিখা (মাগুরা) প্রতিনিধিঃ
কোথায় আছেন, কেমন আছেন—এ প্রশ্নের উত্তর আজ অনেকেরই জানা নেই। কিন্তু শৈশবের স্মৃতির পাতায় এখনো অমলিন হয়ে আছেন মাগুরার শালিখা অঞ্চলের কিংবদন্তি কবিয়াল হাসেম আলী। একসময় হাটের মজমায় হাতে দুটি চাড়া বা প্রেমজুড়ি বাজিয়ে ছন্দের পর ছন্দে তিনি গেয়ে শোনাতেন মানুষের জীবন, গ্রামীণ সমাজ, ইতিহাস আর ভালোবাসার গল্প। আজও সেই কণ্ঠস্বর যেন ভেসে আসে মাটির গন্ধমাখা পুরোনো হাটের কোলাহল থেকে।
স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণে জানা যায়, শৈশবে হাটে গিয়ে এক টাকা কিংবা দুই টাকা দিয়ে মাটকা কিনে বহু মানুষ বসে শুনতেন হাসেম আলীর কবিগান। তাঁর পরিবেশনায় ছিল না কৃত্রিমতার ছাপ; ছিল সহজ ভাষা, হৃদয়ছোঁয়া উপস্থাপনা এবং গ্রামবাংলার জীবন্ত ইতিহাস। নিরক্ষর হয়েও মুখে মুখেই গান রচনা করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মানুষের প্রিয় লোককবি।
একাধিক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কবিয়াল হাসেম আলী প্রায় চার শতাধিক গান রচনা করেছিলেন এবং যশোর, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলার হাটবাজারে মজমা করে গান পরিবেশন করে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর গানে প্রেম, সমাজ, ইতিহাস ও মানুষের সংগ্রামের নানা উপাখ্যান স্থান পেয়েছিল।
লোক ঐতিহ্যের এই শিল্পীর জন্মতারিখ হিসেবে ১৭ মার্চ ১৯২৭ উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর পিতার নাম জিনাতুল্লা মোল্যা। বিভিন্ন সূত্রে জন্মস্থান নিয়ে কিছু ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও শালিখার কাতলী গ্রামই তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচিত নিবাস হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলা ১৩৫৮ সনে তাঁর পরিবার শালিখার কাতলী গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে এবং সেখানেই তাঁর লোককবির পরিচয় বিকশিত হয়।
হাসেম আলীর বিশেষত্ব ছিল তাঁর তাৎক্ষণিক সৃষ্টিশীলতা। তিনি লিখিত পাণ্ডুলিপির ওপর নির্ভর না করে মুখে মুখেই গান সৃষ্টি করতেন এবং সুরে-ছন্দে তা পরিবেশন করতেন। এভাবেই গ্রামীণ জনপদের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, সামাজিক বৈষম্য এবং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা তাঁর গানের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। তাঁর রচিত কয়েকটি কাহিনিভিত্তিক সায়ের বা কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল বলেও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর গানের ভূমিকার কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্যে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেছিলেন, যা মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের অনুপ্রাণিত করেছিল। এ তথ্য তাঁর লোকশিল্পী পরিচয়ের সঙ্গে ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত করে।
আজকের প্রজন্মের কাছে কবিয়াল হাসেম আলীর নাম হয়তো খুব বেশি উচ্চারিত হয় না। অথচ তাঁর মতো লোকশিল্পীরাই একসময় গ্রামবাংলার মানুষের বিনোদন, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতার অন্যতম মাধ্যম ছিলেন। হাটের মজমা ছিল তখন শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; ছিল সংস্কৃতি, গল্প, গান ও মানুষের মিলনের প্রাণকেন্দ্র।
শালিখা-মাগুরার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে কবিয়াল হাসেম আলীর অবদান নতুন করে সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি। তাঁর গান, জীবন ও সৃষ্টিকর্ম সংগ্রহ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা গেলে বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় কবিগানের ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হবে।
শৈশবের সেই হাট, মানুষের ভিড়, মাটকার শব্দ আর হাতে চাড়া বাজিয়ে গেয়ে চলা এক নিরক্ষর অথচ অসাধারণ প্রতিভাবান লোককবির স্মৃতি আজও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। তিনি কোথায় আছেন—তার উত্তর অনিশ্চিত; কিন্তু বাংলার লোকঐতিহ্যের ইতিহাসে কবিয়াল হাসেম আলীর নাম স্মৃতির মতোই অমলিন হয়ে থাকবে।



























