খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
পাহাড়ের সবুজ, নীল আকাশ আর মেঘের মিতালি—প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে খাগড়াছড়ি বরাবরই পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য।
তবে শুধু পাহাড়-ঝরনা কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখেই নয়, এবার রোমাঞ্চের স্বাদ নিতেও পর্যটকদের হাতছানি দিচ্ছে খাগড়াছড়ি। জেলা পরিষদের হর্টিকালচার পার্কে যুক্ত হয়েছে জিপলাইন ও জায়ান্ট সুইং। শিশুদের জন্য চালু করা হয়েছে কিডস জোন। ফলে প্রকৃতির পাশাপাশি অ্যাডভেঞ্চার ও বিনোদনের নতুন অভিজ্ঞতা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে পর্যটকদের জন্য।
বৃহস্পতিবার দুপুরে পার্বত্য জেলা পরিষদের হর্টিকালচার পার্কে নতুন এসব বিনোদন সুবিধার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন খাগড়াছড়ি আসনের সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া।
নতুন জিপলাইনে পাহাড়ের ওপর দিয়ে ছুটে চলার সময় নিচে দেখা যায় সবুজে ঘেরা পার্ক ও প্রাকৃতিক দৃশ্য। প্রথমবার জিপলাইনে ওঠা অনেকের চোখেমুখে ছিল ভয় ও উত্তেজনার মিশ্র অনুভূতি। তবে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেই ভয় বদলে যায় আনন্দে। পর্যটকদের এমন উচ্ছ্বাসই জানান দিচ্ছে, খাগড়াছড়ির পর্যটনে অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক বিনোদনের নতুন সম্ভাবনার।
জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, জিপলাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮১০ মিটার। এর টিকিট মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ টাকা। অন্যদিকে জায়ান্ট সুইংয়ে চড়তে লাগবে ৭০ টাকা। জেলা পরিষদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে দুটি অ্যাক্টিভিটি পরিচালিত হচ্ছে।
হর্টিকালচার পার্কের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা কান্তি বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, “জিপলাইন ও জায়ান্ট সুইং চালুর ফলে খাগড়াছড়িতে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আগমন আরও বাড়বে বলে আমরা আশা করছি। পর্যটকদের বিনোদনের পাশাপাশি পার্কটির আকর্ষণও বহুগুণ বাড়বে।”
‘ভয় লাগলেও পরে দারুণ উপভোগ করেছি’
নতুন এই বিনোদন সুবিধা উদ্বোধনের দিন জিপলাইনে চড়তে দেখা যায় স্থানীয় ও বাইরে থেকে আসা পর্যটকদের। তাদের অনেকের কাছেই এটি ছিল প্রথম জিপলাইন অভিজ্ঞতা।
এক পর্যটক বলেন, “আমি এই প্রথম জিপলাইনে চড়েছি। পাহাড়ের ওপর দিয়ে চলার সময় নিচের লেক ও প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে খুব ভালো লেগেছে। শুরুতে কিছুটা ভয় লাগলেও পরে বেশ আনন্দ পেয়েছি। খাগড়াছড়িতে জিপলাইন চালু হওয়ায় পর্যটন আরও আকর্ষণীয় হবে।”
স্থানীয় পর্যটক খোরশিদা আক্তার বলেন, “আগে কখনো জিপলাইনে চড়িনি। খাগড়াছড়িতে এসে এবারই প্রথম সুযোগ হয়েছে। নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে খুব ভালো লেগেছে। শুরুতে ভয় লাগলেও পরে বেশ উপভোগ করেছি।”
পর্যটনকে আরও বৈচিত্র্যময় করার উদ্যোগ
খাগড়াছড়িতে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ সাজেক। জেলার বিভিন্ন প্রান্তের পাহাড়, ঝরনা, নদী-ছড়া ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও পর্যটকদের টানে। তবে প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের পাশাপাশি অ্যাডভেঞ্চার ও বিনোদনকেন্দ্রিক পর্যটনের সুযোগ তুলনামূলক কম। সেই ঘাটতি পূরণে জেলা পরিষদ পার্কে নতুন এসব কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, “সাজেকে যাওয়া কিংবা সাজেক থেকে ফেরার পথে পর্যটকদের জন্য খাগড়াছড়িতে আরও বৈচিত্র্যময় বিনোদনের সুযোগ প্রয়োজন। জিপলাইন ও জায়ান্ট সুইং চালুর ফলে পর্যটকেরা নতুন ধরনের আনন্দ পাবেন। একই সঙ্গে শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্যও বিনোদনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।”
তিনি বলেন, এসব কার্যক্রম থেকে জেলা পরিষদের নিজস্ব আয়ও বাড়বে। সেই আয় ভবিষ্যতে পর্যটন খাতের উন্নয়ন ও নতুন স্থাপনা তৈরিতে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
নিরাপত্তায় গুরুত্ব, বিদেশি উপকরণে নির্মাণ
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, সংসদ সদস্যের নির্দেশনা ও পরামর্শ অনুযায়ী জেলা পরিষদ পার্ককে আরও পর্যটকবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অ্যাক্টিভিটি ট্যুরিজমের অংশ হিসেবে জিপলাইন ও জায়ান্ট সুইং স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ও সেফটি মেজারমেন্ট অনুসরণ করে স্থাপনাগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা জিপলাইনগুলোর মধ্যে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ পার্কের জিপলাইনটি অন্যতম বৃহৎ। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৮১০ মিটার।”
জেলা পরিষদের এই কর্মকর্তা জানান, তুলনামূলক কম খরচে মানসম্মতভাবে স্থাপনাগুলো নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। এতে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ থাইল্যান্ড ও নেপাল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে পর্যটকদের জন্য আরও নতুন অ্যাক্টিভিটি যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার বার্তা
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা ও স্বাস্থ্যকর বিনোদনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। জিপলাইন, জায়ান্ট সুইংয়ের মতো শারীরিক কর্মকাণ্ড তরুণদের ইতিবাচক বিনোদনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
তিনি বলেন, “তরুণ সমাজকে মাদক থেকে দূরে রেখে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে খেলাধুলার পাশাপাশি এ ধরনের শারীরিক ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। নিয়মিত হাঁটাচলা ও শরীরকে সক্রিয় রাখার অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে।”
ওয়াদুদ ভূঁইয়া আরও বলেন, তরুণদের মাঠ, পার্ক ও সুস্থ বিনোদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহিত করা সম্ভব, অন্যদিকে মাদক ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকেও তাদের দূরে রাখা যাবে। একই সঙ্গে নতুন অ্যাক্টিভিটিগুলো খাগড়াছড়ির পর্যটন বিকাশে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সম্ভাবনার নতুন দুয়ার
খাগড়াছড়ির পর্যটনের প্রধান শক্তি প্রকৃতি। পাহাড়ের ঢেউ, সবুজ বন, ঝরনা, মেঘ আর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সঙ্গে এবার যুক্ত হলো অ্যাডভেঞ্চারের নতুন অভিজ্ঞতা। এতে পর্যটকের অবস্থানের সময় যেমন বাড়তে পারে, তেমনি জেলার পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে তরুণ পর্যটকদের কাছে অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক বিনোদনের চাহিদা বাড়ছে। সেই চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে নতুন নতুন অ্যাক্টিভিটি যুক্ত করা গেলে খাগড়াছড়ি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের গন্তব্য নয়, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমেরও অন্যতম আকর্ষণীয় কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
তবে পর্যটকদের নিরাপত্তা, স্থাপনাগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষিত জনবল ও সেবার মান নিশ্চিত করাই হবে এ উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। এসব বিষয় ঠিকভাবে নিশ্চিত করা গেলে জেলা পরিষদ পার্কের জিপলাইন ও জায়ান্ট সুইং খাগড়াছড়ির পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের আরও বড় অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক পর্যটন উদ্যোগের পথও খুলে দিতে পারে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরার সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ইলিয়াস মেহেদী, জেলা পরিষদের সদস্যসহ বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ আব্দুল মুননাফ , ই-মেইল: ই-মেইল নং : gsongbad440@gmail.com , মোবাইল-০১৭১১-৩৫৯৬৩১
Copyright © 2026 gramersongbad.com. All rights reserved.