গ্রামের সংবাদ ডেস্ক : হাত-পা নাইলনের রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা, মাথার পেছনের ডানদিকে গুলির স্পষ্ট ক্ষত। অথচ এমন একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডকে ‘আত্মহত্যা’ বলে আদালতে চালিয়ে দিতে চেয়েছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অন্যদিকে, তাকেই ‘জীবিত’ দেখিয়ে হাইকোর্টে ভুয়া আপসনামা দাখিল করে প্রায় ৮৫ কোটি টাকার এলসি ভ্যালুর (প্রকৃত মূল্য আরও বেশি) তিনটি জাহাজ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে।
চট্টগ্রামের শিপিং ব্যবসায়ী রেজাউর রহমান জাকিরকে গুম ও খুনের ২৩ বছর পর মামলার নথিপত্র ঘেঁটে ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এমন অভিযোগের দালিলিক প্রমাণ। প্রকৃত আসামিরা ধরা না পড়ায় এবং দিনের পর দিন বিচার ঝুলে থাকায় চরম হতাশায় দিন পার করছে নিহতের পরিবার। স্বজনদের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে তারা মামলা পুনঃতদন্তের দাবি করে আসছেন। তাদের বিশ্বাস নিরপেক্ষ কোনো সংস্থা দিয়ে তদন্ত করলে এই খুনের সঙ্গে জড়িত প্রকৃত আসামিরা বের হয়ে আসবে।
খুনের পর আত্মহত্যার তথ্য: ২০০৩ সালের ১১ই আগস্ট নগরের খুলশীর বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন পুরনো জাহাজ বেচাকেনার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ওটিবিএল-এর কর্ণধার রেজাউর রহমান। পরদিন ১২ই আগস্ট বোয়ালখালীর শাকপুরা মিলিটারি ব্রিজের পাশে কচুরিপানার ভেতর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। মামলার ডকেট ও তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, লাশ উদ্ধারের সময় রেজাউরের হাত-পা নাইলনের রশি দিয়ে বাঁধা ছিল এবং তার মাথার পেছনে ডানদিকে গুলিবিদ্ধ ছিল।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, এই মামলা ভিন্ন খাতে নিতে শুরু থেকেই তৎপর ছিল একটি প্রভাবশালী মহল। সিআইডি’র তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা এএসপি মো. খালেকুজ্জামানের তদন্ত প্রতিবেদনে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। সিআইডি’র নথির ৫৭ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, ওই কর্মকর্তা মামলাটির তদন্ত সম্পন্ন করে ঘটনাটিকে ‘আত্মহত্যা বলে মতপ্রকাশ করত: চূড়ান্ত রিপোর্ট’ দাখিলের চেষ্টা করেছিলেন। তবে ২০০৫ সালের ২২শে জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত মনিটরিং সেলের সভায় আত্মহত্যার তথ্য বাতিল করে দেয়া হয়। পরে এটা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। হাত-পা বাঁধা ও মাথার পেছনে গুলিবিদ্ধ লাশকে ‘আত্মহত্যা’ বানানোর এই অপচেষ্টা খুনিদের আড়াল করতে ও ঘটনা ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টারও অভিযোগ করেন স্বজনরা।
মৃত ব্যক্তিকে ‘জীবিত’ দেখিয়ে জাহাজ আত্মসাতের অভিযোগ: এই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে রেজাউরের আমদানিকৃত তিনটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতর। রেজাউর নিখোঁজ ও খুন হওয়ার ঠিক পর পরই তার সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো নিয়ে হাইকোর্টে পর পর তিনটি অ্যাডমিরালিটি মামলা (স্যুট নং ১৭, ১৮ ও ১৯/২০০৩) দায়ের হয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, স্যুট নং ১৭/২০০৩-এর বাদী চট্টগ্রামের মাদামবিবিরহাটের মেসার্স ন্যাশনাল স্টিলের স্বত্বাধিকারী আবুল কাশেম, স্যুট নং ১৮/২০০৩-এর বাদী চট্টগ্রামের কোরবানিগঞ্জের মেসার্স শৈবাল শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রির স্বত্বাধিকারী জিয়াউল করিম, এবং স্যুট নং ১৯/২০০৩-এর বাদী আগ্রাবাদের জনতা স্টিল করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী আমান উদ্দিন। ১৩ই আগস্ট হাইকোর্ট জাহাজগুলো জব্দের আদেশ দেন। কিন্তু রেজাউরের লাশ উদ্ধারের মাত্র ১৯ দিনের মাথায় ২০০৩ সালের ৩১শে আগস্ট হাইকোর্টের বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী ও বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদুল হকের বেঞ্চে দেখানো হয় এক ‘আপস-মীমাংসা’।
আদালতের আদেশে উল্লেখ রয়েছে, ওইদিন বাদীর পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর সাদাত আদালতকে জানান, ১ থেকে ৫ নম্বর বিবাদীর সঙ্গে বিষয়টি ‘সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে মীমাংসা’ হয়ে গেছে। এই কথিত মীমাংসার ওপর ভিত্তি করে আদালত জাহাজগুলো অবমুক্ত করার নির্দেশ দেন। প্রকৃতপক্ষে, ১ থেকে ৩ নম্বর বিবাদী হচ্ছেন জাহাজ ও জাহাজটির মাস্টার। যাদের সঙ্গে মীমাংসার সুযোগ নাই এবং ৪ ও ৫ নম্বর বিবাদী হচ্ছেন রেজাউর রহমান জাকির যিনি মামলা দায়েরের আগেই হত্যার শিকার হয়েছেন। স্বজনরা বলেন, রেজাউর ১২ই আগস্ট নির্মমভাবে খুন হয়েছেন। ১৩ই আগস্ট তার তিনটি জাহাজ নিয়ে হাইকোর্টে মামলায় তাকে বিবাদী করা ও জাহাজের উপর আটকাদেশ গ্রহণ এবং ৩১শে আগস্ট তিনি কীভাবে হাইকোর্টে ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ মীমাংসা’ করলেন? স্বজনরা জানান, পর্দার আড়ালে থাকা প্রভাবশালী চক্রটিই নিহত রেজাউরকে দেখিয়ে এই আপসনামা আদালতে দাখিল করে। আর কেবল জাহাজগুলো আত্মসাতের জন্যই তার সঙ্গে এমন নির্মমতা করা হয়। এমনকি আইনজীবী দিয়ে কোর্টে মিথ্যা এফিডেভিট জমা দেয়া হয়।
প্রকৃত আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে, পুনঃতদন্তের দাবি: আত্মহত্যার তথ্য নাকচ হওয়ার পর সিআইডি ২০০৮ সালের ৩১শে ডিসেম্বর একটি অভিযোগপত্র জমা দেয়। বাদীপক্ষের অভিযোগ, এতে জাহাজ আত্মসাতের চক্রান্ত ও মূল পরিকল্পনাকারীদের নাম সম্পূর্ণ আড়াল করে ৯ জন নিরীহ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। এর প্রতিবাদে ২০০৯ সালের ১৫ই জানুয়ারি চট্টগ্রামের আদালতে নারাজি আবেদন করেন নিহতের ভাই ও মামলার বাদী মিজানুর রহমান। বাদীর দাবি ছিল, অভিযোগপত্রে এমন সব ব্যক্তিকে জড়ানো হয়েছে যাদের সঙ্গে খুনের কোনো সম্পৃক্ততা নাই। বরং পর্দার আড়ালে থাকা যে প্রভাবশালীরা হাইকোর্টে জালিয়াতি করে জাহাজ আত্মসাৎ করেছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে ডিবি’র মাধ্যমে পুনঃতদন্ত বা অধিকতর তদন্ত প্রয়োজন। কিন্তু আদালত সেই নারাজি আবেদন নামঞ্জুর করে সিআইডি’র ত্রুটিপূর্ণ অভিযোগপত্রটিই গ্রহণ করেন।
থমকে আছে বিচার, হতাশার অন্ধকারে পরিবার: প্রকৃত খুনিদের আড়াল করে দেয়া এই অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যান বাদী। ২০১২ সালে হাইকোর্টে দায়ের করা ক্রিমিনাল মিস মামলার (নং ৯৩৩২/২০১২) কারণে বিচারিক আদালতের কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ পড়ে। নথি অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই মামলার ওপর ১৪০ বারের বেশি কার্যতালিকায় ওঠা এবং দফায় দফায় স্থগিতাদেশ বর্ধনের ঘটনা ঘটেছে। ফলে ২৩ বছরেও এই হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়নি। পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্রে থাকা আসামিরা বর্তমানে জামিনে। তবে পরিবারের মূল ক্ষোভ প্রকৃত খুনিরা আজও শনাক্তই হয়নি। স্বজনরা মনে করছেন- তিনটি জাহাজ আত্মসাতের উদ্দেশ্য পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। এর পেছনে সংঘবদ্ধ একটি চক্র আছে। এ ছাড়া খুনের পর পরই এর নেপথ্যে যে কয়জন শিপিং ব্যবসায়ীর নাম উঠে এসেছে তাদের মধ্যে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের নামও আছে। তিনিও দীর্ঘদিন ধরে শিপিং ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
এদিকে, বিচারহীনতার এই দীর্ঘ বঞ্চনায় নিহতের পরিবার আজ সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। রেজাউরের ছেলে শেফাউর রহমান এখন বিশ্বখ্যাত ‘রোলস-রয়েস’ কোম্পানিতে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। তিনি বা তার মা নাসিমা রহমান কেউই আর এই বিচার নিয়ে কথা বলতে চান না। নাসিমা রহমানের কথায় ফুটে উঠেছে চরম আক্ষেপ। গণমাধ্যমকে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ২১ বছরেও কিছু হয়নি। আর বিচার চাই না। উপরওয়ালার কাছে বিচার দিয়েছি। তার এখন একটাই চাওয়া সন্তানদের নিয়ে একটু নিরাপদে বাঁচা। হাত-পা বাঁধা লাশ ঘিরে আত্মহত্যা’র চূড়ান্ত রিপোর্টের চেষ্টা আর হাইকোর্টে মৃত ব্যক্তির নামে ‘আপস-মীমাংসা’ সবমিলিয়ে জাকির হত্যার এই দালিলিক প্রমাণগুলো নতুন করে তদন্ত হলে আজও মূল কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এডভোকেট মো. আশরাফ হোসেন চৌধুরী (রাজ্জাক) মানবজমিনকে বলেন, ন্যায়বিচার চাওয়ার অধিকার সবারই আছে। কেউ যদি মনে করে তিনি ন্যায়বিচার পাননি তবে অবশ্যই তিনি দাবি করতে পারেন। জাকিরের পরিবারের ক্ষেত্রেও তাই।
সুত্র : দৈনিক মানব জমিন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ আব্দুল মুননাফ , ই-মেইল: ই-মেইল নং : gsongbad440@gmail.com , মোবাইল-০১৭১১-৩৫৯৬৩১
Copyright © 2026 gramersongbad.com. All rights reserved.