নিজস্ব প্রতিবেদকঃ টানা কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টি যেন রাজধানীর ক্ষুদ্র ব্যবসার চাকা থামিয়ে দিয়েছে। পানিতে অনেক সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে অস্থায়ী বাজার ও ভ্রাম্যমাণ বেচাকেনা।
সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন ফুটপাতের ব্যবসায়ী, মৌসুমি ফল বিক্রেতা, ভ্যানে করে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং কাঁচাবাজারের ছোট ব্যবসায়ীরা। দোকান খুলতে না পারা, ক্রেতাশূন্য বাজার এবং পণ্য নষ্ট হওয়ার কারণে প্রতিদিনই বাড়ছে তাদের লোকসান।
সোমবার (১৩ জুলাই) রাজধানীর নিউমার্কেট, পুরান ঢাকা, চকবাজার, লালবাগ, বংশাল, আজিমপুর, লালবাগ, ইসলামবাগ, নবাবগঞ্জ বাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক সড়ক ও ফুটপাত এখনো পানিতে তলিয়ে আছে। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও আবার কোমরসমান জলাবদ্ধতা। ফলে প্রতিদিন সকালে যেসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ফুটপাতে দোকান বসান, তাদের অনেকেই দোকান না খুলেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
বাদামতলী ঘাটের মৌসুমি ফল বিক্রেতা মো. রফিক বলেন, “লিচু, আনারস, মাল্টা, পেয়ারার মতো ফল বেশি সময় রাখা যায় না। বৃষ্টির কারণে মানুষ বের হচ্ছে না, আবার পানি লাগলে ফলও নষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন যে টাকা লাভ হতো, এখন সে পরিমাণ টাকার পণ্য বিক্রিও হচ্ছে না।”
লালবাগে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করেন আবদুল কাদের। তিনি বলেন, “রাস্তায় পানি থাকলে ভ্যান নিয়ে চলাই যায় না। যেসব এলাকায় যাই, সেখানেও মানুষ কম। সারাদিন ঘুরে যা বিক্রি হয়, তা দিয়ে ভ্যান ভাড়াও ওঠে না। গত দুইদিন ভ্যান নিয়ে বের হতেই পারিনি। কারণ একটা রাস্তা স্বাভাবিক থাকলেও, দেখা যায় পাশের রাস্তাটি ডুবে আছে। এভাবে ভ্যান চালিয়ে বিক্রি করা কষ্ট।”
একই চিত্র দেখা গেছে পোশাক, খেলনা, গৃহস্থালির সামগ্রী ও প্লাস্টিক পণ্য বিক্রি করা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। অনেকেই জানান, ভেজা পরিবেশে কাপড় ও কাগজজাত পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার বৃষ্টি শুরু হলেই দ্রুত মালামাল গুটিয়ে নিতে হয়। ফলে পুরো দিনের ব্যবসাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
নবাবগঞ্জ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, অনেক সবজি বিক্রেতা দোকান খুললেও ক্রেতা নেই। ব্যবসায়ী আজাদ হোসেন বলেন, “কাঁচা সবজি একদিন বিক্রি না হলে লোকসান নিশ্চিত। বৃষ্টির কারণে কয়েক হাজার টাকার সবজি ইতোমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে লোকসান দেয়ার ইচ্ছে নেই, এ কারণে আজকে দোকানই খুলিনি। আজকে মূলত বাজারে এসেছি পরিস্থিতি দেখতে।”
জলাবদ্ধতার কারণে নিউমার্কেট ও আশপাশের অনেক বিপণিবিতানেও স্বাভাবিক বেচাকেনা হয়নি। নিচতলার একাধিক দোকানে পানি ঢুকে কাপড়, জুতা ও অন্যান্য পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী জামাল হোসেন বলেন, “ক্রেতা মার্কেটে আসতেই পারছে না। দোকানের সামনে পানি, ভেতরেও পানি। কয়েকদিন এমন চললে ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা কঠিন হবে।”
ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটের উত্তর ডি ব্লকের ব্যবসায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের বলেন, “মূল নিউমার্কেট, নিউ সুপার মার্কেট, বনলতা কাঁচাবাজার, হকার্স মার্কেটসহ আশপাশের অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে। এতে বহু ব্যবসায়ীর মালামাল নষ্ট হয়েছে।”
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে, টানা বৃষ্টিতে সারা দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। স্বাভাবিক সময়ে তিন থেকে চারদিনে যেখানে ১৫ থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রির সম্ভাবনা থাকে, সেখানে এবার বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
সংগঠনটির মতে, বিক্রি কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের সম্ভাব্য মুনাফা থেকে ৭০০ কোটির বেশি টাকা কমে গেছে। এর সঙ্গে দোকানে পানি ঢুকে পণ্য নষ্ট হওয়ায় আরো প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির মহাসচিব জহিরুল হক ভূঁইয়া বলেন, “ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় মার্কেটের দোকানদার, সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ীরা। একদিন ব্যবসা না হলে তাদের সংসার চালানোই কঠিন হয়ে যায়।”
তিনি বলেন, “দেশে প্রায় এক কোটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা স্থানীয় অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি। তাদের সমস্যা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে খুব কম আলোচনা হয়।”
জলাবদ্ধতা নিরসন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়তা এবং ব্যবসাবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ চেয়েছেন দোকান মালিক সমিতির মহাসচিব জহিরুল হক ভূঁইয়া।
রাজধানীতে বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বছরের পর বছর একই সমস্যা থাকলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের। বড় ব্যবসা কিছুদিন ধাক্কা সামলাতে পারলেও ফুটপাত, ভ্যান ও অস্থায়ী দোকানের ব্যবসায়ীদের জন্য এক দিনের লোকসানই অনেক সময় পুরো পরিবারের খাবারের টাকার সমান। তাই জলাবদ্ধতা শুধু নগর ব্যবস্থাপনার সংকট নয়, এটি এখন হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবিকা ও টিকে থাকারও বড় চ্যালেঞ্জ।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ আব্দুল মুননাফ , ই-মেইল: ই-মেইল নং : gsongbad440@gmail.com , মোবাইল-০১৭১১-৩৫৯৬৩১
Copyright © 2026 gramersongbad.com. All rights reserved.