সাব্বির হোসেন: যশোর জেলায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অনলাইন জুয়ার বিস্তার। এক সময় শিক্ষার্থী ও বেকার যুবকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এই আসক্তি।
ইজিবাইক চালক, বাস ও ট্রাক চালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, প্রবাসী পরিবারের সদস্য এমনকি হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যেও অনলাইন জুয়ার প্রবণতা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেলার যশোর সদর, ঝিকরগাছা, শার্শা, চৌগাছা, মনিরামপুর, কেশবপুর, বাঘারপাড়া ও অভয়নগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্মার্টফোন, সহজলভ্য ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সুযোগ নিয়ে অনলাইন জুয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে বেটিং, অনলাইন ক্যাসিনো এবং ভার্চুয়াল গেমের নামে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, ইজিবাইক স্ট্যান্ড, বাজার, চায়ের দোকান ও জন সমাগমস্থলে অবসর সময়ে অনেকেই মোবাইল ফোনে অনলাইন জুয়ার বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করছেন। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু ইজিবাইক চালককে যাত্রী বহনের সময় কিংবা যানবাহন চালানোর ফাঁকেও মোবাইল ফোনে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার অ্যাপ পরিচালনা করতে দেখা গেছে। এতে একদিকে যেমন সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে যাত্রীদের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে।
ঝিকরগাছার এক ইজিবাইক চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “শুরুতে কয়েকবার লাভ হয়েছিল। পরে বেশি লাভের আশায় নিয়মিত খেলতে শুরু করি। এখন কয়েক হাজার টাকা ঋণ হয়ে গেছে। সংসার চালাতেই কষ্ট হচ্ছে।”
শার্শার এক পরিবহন শ্রমিক বলেন, “অনেক চালক যাত্রী না থাকলে মোবাইলে জুয়া খেলেন। কেউ কেউ আবার গাড়ি চালানোর সময়ও বেটিংয়ের ফলাফল দেখেন। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।”
এদিকে যশোরের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যেও অনলাইন জুয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসার ফাঁকে কিংবা দীর্ঘ সময় হাসপাতালে অবস্থানকালে অনেকেই মোবাইল ফোনে জুয়ার অ্যাপে যুক্ত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চিকিৎসার জন্য সংরক্ষিত অর্থ হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, অনলাইন জুয়ার অধিকাংশ অর্থ লেনদেন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। জুয়ার সঙ্গে জড়িত একশ্রেণির এজেন্ট বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সদস্য সংগ্রহের পাশাপাশি অর্থ জমা ও উত্তোলনের ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নতুন খেলোয়াড় আকৃষ্ট করার অভিযোগও রয়েছে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, দ্রুত ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণদের টার্গেট করছে এসব চক্র। অনেক পরিবারে অনলাইন জুয়াকে কেন্দ্র করে দাম্পত্য কলহ, ঋণগ্রস্ততা, পারিবারিক অশান্তি এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। কেউ কেউ সর্বস্ব হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন।
সমাজ সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতা এখন মাদকের মতোই একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এর কারণে যুবসমাজ কর্মবিমুখ হয়ে পড়ছে, নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পারিবারিক অর্থনীতি। তারা অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত চক্র, এজেন্ট ও অর্থ লেনদেনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির দাবি জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, পরিবারে সচেতনতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা না গেলে অনলাইন জুয়ার এই নীরব বিস্তার ভবিষ্যতে যশোরের সমাজ ও অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ আব্দুল মুননাফ , ই-মেইল: ই-মেইল নং : gsongbad440@gmail.com , মোবাইল-০১৭১১-৩৫৯৬৩১
Copyright © 2026 gramersongbad.com. All rights reserved.