স্বপন বিশ্বাস :
একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী—যে একদিন মানুষের জীবন বাঁচানোর স্বপ্ন নিয়ে সাদা অ্যাপ্রোন গায়ে জড়িয়েছিল—শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনটাই বাঁচাতে পারল না।
৩ এপ্রিল কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের ছাত্রী অর্পিতা নওশীনের আত্মহত্যার খবর শুধু একটি পরিবারের বুক ভেঙে দেয়নি, বরং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্গত এক নির্মম অন্ধকারকে আবারও দৃশ্যমান করেছে। একই বিষয়ে পাঁচবার ফেল, শিক্ষকের কঠোরতা, মানসিক চাপ, অপমানবোধ, অভিমান—সব মিলিয়ে একটি তরুণ প্রাণ ঝরে গেল। প্রশ্ন জাগে—এ মৃত্যু কি কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতার ফল, নাকি আমাদের শিক্ষা কাঠামোর দীর্ঘদিনের গলদের নির্মম বহিঃপ্রকাশ?
বাংলাদেশে চিকিৎসাশিক্ষা বরাবরই কঠিন। এখানে মেধা, অধ্যবসায়, মানসিক সহনশীলতা—সবকিছুরই পরীক্ষা হয়। কিন্তু কঠিন শিক্ষা আর নিষ্ঠুর শিক্ষা এক জিনিস নয়। একজন শিক্ষার্থী যদি একই বিষয়ে বারবার ব্যর্থ হয়, তবে তাকে আরও দক্ষভাবে শেখানোর দায়িত্ব শিক্ষকের, তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া নয়। বারবার ফেল করা নিশ্চয়ই উদ্বেগের বিষয়; কিন্তু সেই ব্যর্থতার পেছনে কারণ অনুসন্ধান না করে কেবল নম্বরের কড়াকড়ি দিয়ে শিক্ষার্থীকে চাপে ফেলে দেওয়া শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না। এবং এই শিক্ষক কোন ভাবেই তার দায় এড়াতে পারে না। মেডিকেল কলেজ গুলোতে প্রায়ই শোনা যায়—কোনো কোনো বিভাগে পাসের হার অস্বাভাবিক কম, কোনো কোনো শিক্ষকের অধীনে একই বিষয়ে বহু শিক্ষার্থী বছরের পর বছর আটকে থাকে। পরীক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক কখনও কখনও এমন এক ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে, যেখানে শিক্ষক জ্ঞানদাতা না হয়ে পরিণত হন আতঙ্কের প্রতীকে। একজন শিক্ষার্থী তখন বইয়ের চেয়ে বেশি ভয় পায় পরীক্ষকের মুখ। এই ভীতি শেখার পরিবেশ নষ্ট করে, আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে, এবং শেষ পর্যন্ত মানুষকে একা করে দেয়।
একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর জীবন সাধারণ শিক্ষার্থীর চেয়ে ভিন্ন। দীর্ঘ সময় পড়াশোনা, ক্লাস, ওয়ার্ড, প্র্যাকটিক্যাল, রাতজাগা প্রস্তুতি—সবকিছুর মাঝে পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা তাকে ক্রমাগত তাড়া করে। “ডাক্তার হতেই হবে”—এই একটিমাত্র পরিচয়ের ভার অনেক সময় একজন তরুণ মনকে নিঃশ্বাস নিতে দেয় না। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি, শিক্ষকের রূঢ় আচরণ, সহপাঠীদের এগিয়ে যাওয়া, তবে একজন শিক্ষার্থীর মনে নিজের অস্তিত্বকেই ব্যর্থ মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় অভাব—মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দেওয়া। একজন শিক্ষার্থী পাঁচবার ফেল করেছে—এই তথ্যের ভেতরেই একটি গভীর সংকেত আছে যে সে হয়তো ভয়াবহ মানসিক চাপে ছিল। তাকে কি কাউন্সেলিং দেওয়া হয়েছিল? কেউ কি জিজ্ঞেস করেছিল কেন সে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে? তার শেখার পদ্ধতিতে সমস্যা, নাকি পরীক্ষার মূল্যায়নে কাঠিন্য—এসব কি খতিয়ে দেখা হয়েছিল? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর—না।
বাংলাদেশের অধিকাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনও পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কার্যত অনুপস্থিত। শিক্ষার্থীরা মানসিক সংকটে পড়লে বন্ধুর কাছে যায়, কাঁদে, লুকিয়ে থাকে, অথবা একসময় নীরব হয়ে যায়। অথচ এই নীরবতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ আত্মহত্যা হঠাৎ ঘটে না; তার আগে দীর্ঘ এক নিঃশব্দ অন্ধকার জমে ওঠে। শিক্ষকদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক মানে শুধু পাঠদান নয়; শিক্ষক মানে পথপ্রদর্শক, আশ্রয়, সাহসদাতা। একজন শিক্ষক যদি নিজের ক্ষমতাকে শাসন হিসেবে ব্যবহার করেন, তবে শিক্ষার্থীর মন বিদীর্ণ হয়। অবশ্যই শিক্ষকের মূল্যায়নের স্বাধীনতা থাকতে হবে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা মানবিকতার ঊর্ধ্বে হতে পারে না। একজন শিক্ষার্থী ফেল করলে শিক্ষক তাকে শত্রু নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখবেন—এই সংস্কৃতি তৈরি করা জরুরি। পাঁচবার ফেল—এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও প্রশ্ন—একই শিক্ষার্থী যদি বারবার একই জায়গায় আটকে যায়, তবে পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন কাঠামো, সহায়ক ব্যবস্থা—এসব কি যথাযথ? উন্নত বিশ্বে কোনো শিক্ষার্থী ধারাবাহিক ব্যর্থ হলে তাকে একাডেমিক সহায়তা, বিশেষ ক্লাস, কাউন্সেলিং, মেন্টরিং দেওয়া হয়। আমাদের এখানে অধিকাংশ সময় তাকে ব্যর্থতার দায় একাই বইতে হয়। এই আত্মহত্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নম্বরের চেয়ে মানুষ বড়। একজন শিক্ষার্থী হারিয়ে গেলে শুধু একটি রোল নম্বর কমে না; একটি পরিবার ভেঙে যায়, একটি স্বপ্ন নিভে যায়, সমাজ হারায় সম্ভাব্য একজন চিকিৎসককে। যে মেয়ে হয়তো একদিন অসংখ্য রোগীর পাশে দাঁড়াতে পারত, আজ সে নিজেই জীবনের কাছে পরাজিত। আমরা প্রায়ই বলি—শিক্ষার্থীরা এখন দুর্বল, সামান্য ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ে। কিন্তু আমরা কি কখনও ভাবি—আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কি যথেষ্ট সহনশীল? আমরা কি ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শিখিয়েছি? নাকি ব্যর্থ মানেই অপমান, পিছিয়ে পড়া, সামাজিক লজ্জা—এই বার্তাই বারবার দিয়েছি?
শিক্ষা যদি মানুষকে বাঁচতে না শেখায়, তবে সেই শিক্ষা কেবল তথ্যের বোঝা। বিশেষ করে চিকিৎসাশিক্ষার মতো মানবিক পেশায়, যেখানে ভবিষ্যতের ডাক্তার তৈরি হয়, সেখানে সহমর্মিতা না থাকলে তা ভয়ংকর বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। যে শিক্ষাব্যবস্থা করুণা শেখাবে, সেই ব্যবস্থাই যদি নিজের শিক্ষার্থীর প্রতি নির্মম হয়—তবে সেখানে গভীর সংস্কার প্রয়োজন। এখন জরুরি হলো, এই মৃত্যুকে আরেকটি ক্ষণিক সংবাদে সীমাবদ্ধ না রাখা। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন—শিক্ষার্থী কেন বারবার ফেল করছিল, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো অসঙ্গতি ছিল কি না, শিক্ষকের আচরণে মানসিক নির্যাতনের উপাদান ছিল কি না, কলেজে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা ছিল কি না—সবকিছু দেখা দরকার। কারণ দায় নির্ধারণ না হলে ভবিষ্যতে আরও কেউ একই পথে হাঁটতে পারে।
একটি সভ্য শিক্ষা ব্যবস্থা কখনও এমন হতে পারে না, যেখানে একজন শিক্ষার্থী নিজের ব্যর্থতার ভারে মৃত্যুকেই মুক্তি ভাবে। আমাদের দরকার এমন শিক্ষাঙ্গন, যেখানে শিক্ষক কঠোর হবেন কিন্তু অপমানকারী নন; মূল্যায়ন কঠিন হবে কিন্তু প্রতিশোধপরায়ণ নয়; ব্যর্থতা থাকবে কিন্তু পুনরুদ্ধারের পথও থাকবে। একজন মেডিকেল ছাত্রীর মৃত্যু আমাদের সামনে আয়না ধরে দাঁড়িয়েছে। সেই আয়নায় আমরা শুধু এক তরুণীর শেষ কান্না দেখি না—দেখি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার নীরব অসাড়তা, অব্যবস্থাপনা, আর মানবিক ঘাটতি।
এই মৃত্যু যেন আরেকটি সংখ্যা না হয়—এই হোক আমাদের দায়, আমাদের লজ্জা, আমাদের জাগরণ।
স্বপন বিশ্বাস
কবি ও লেখক
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ আব্দুল মুননাফ , ই-মেইল: ই-মেইল নং : gsongbad440@gmail.com , মোবাইল-০১৭১১-৩৫৯৬৩১
Copyright © 2026 gramersongbad.com. All rights reserved.