নিজস্ব প্রতিবেদকঃ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রেখে হত্যাকাণ্ডের চিত্র আড়াল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে সজীব ওয়াজেদ জয় ও জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে বেঞ্চে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, অভিযোগপত্র ও উপস্থাপিত প্রমাণের মাধ্যমে তারা দেখাবেন, আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, সরাসরি গুলি, ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশনা এবং ইন্টারনেট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ছিল পূর্বপরিকল্পিত ও সমন্বিত।
প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম আদালতে বলেন, “এই হত্যাযজ্ঞ ছিল পূর্বপরিকল্পিত, পদ্ধতিগত, লক্ষ্যভিত্তিক এবং ব্যাপক মাত্রায় সংঘটিত।” তার ভাষায়, এটি ছিল “রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনৈতিক দলীয় ক্যাডার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামোর সমন্বয়ে পরিচালিত একটি অপরাধী নেটওয়ার্কের ফল।”
তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলন শুরুর পর সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে দমন পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেখানে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, হেলিকপ্টার থেকে গুলি বর্ষণ, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ইন্টারনেট বন্ধ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনাও ছিল।
তাজুল ইসলাম আদালতে বলেন, “ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত আসত আসামি সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছ থেকে। তিনি তার মা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন এবং তা জুনাইদ আহমেদ পলক বাস্তবায়ন করেন।”
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে পরে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হয়। এরপর ব্রডব্যান্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অ্যাপ বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে দেশের ভেতরে ও বাইরে সংঘটিত সহিংসতার চিত্র আড়াল থাকে।
২৩ জুলাই ২০২৪ তারিখে সালমান এফ রহমানের সঙ্গে জুনাইদ আহমেদ পলকের কথোপকথনের একটি অংশও আদালতে উদ্ধৃত করেন প্রধান কৌঁসুলি। সেখানে বিভিন্ন অ্যাপ ব্লক রাখা ও অনুমোদন সংক্রান্ত আলোচনা উঠে আসে বলে তিনি জানান।
চিফ প্রসিকিউটর পরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে ব্রিফিংয়ে বলেন, “জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ওপর যে ব্যাপক গণহত্যা চালানো হয়, এর মাস্টারমাইন্ডদের মধ্যে অন্যতম হলেন সজীব ওয়াজেদ জয় ও জুনাইদ আহমেদ পলক। আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে তারা গণহত্যা সংঘটনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন।”
এই মামলায় তদন্ত শুরু হয় ২০২৪ সালের ১৪ অগাস্ট। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। এ বছরের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে।
রাষ্ট্রপক্ষ ৩২ জন সাক্ষীর তালিকা জমা দিয়েছে। তাদের মধ্যে আহত ব্যক্তি, নিহতদের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শী, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, বিটিআরসি ও টেলিযোগাযোগ কর্মকর্তা এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। দালিলিক ও প্রযুক্তিগত প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেছেন। অন্যদিকে আরেক আদেশে ২৮ ফেব্রুয়ারিও পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
আসামিদের মধ্যে সজীব ওয়াজেদ জয় পলাতক। জুনাইদ আহমেদ পলক গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ আব্দুল মুননাফ , ই-মেইল: ই-মেইল নং : gsongbad440@gmail.com , মোবাইল-০১৭১১-৩৫৯৬৩১
Copyright © 2026 gramersongbad.com. All rights reserved.