খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি।
টানা কয়েকদিনের সহিংসতা, আতঙ্ক ও থমথমে পরিস্থিতি কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে খাগড়াছড়ি। সোমবার সকাল থেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় আবারও প্রাণচাঞ্চল্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে, হাট-বাজারে মানুষের ভিড় বাড়ছে, সড়কে নিয়মিতভাবে ছেড়ে যাচ্ছে যানবাহন। দুপুর গড়াতেই প্রধান সড়কগুলোতে গাড়ির চাপ ও জনসমাগম বেড়ে যায়।
ভয়–উৎকণ্ঠা কাটছে, ফিরছে স্বস্তি
কয়েকদিন ধরে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কে ঘরবন্দি ছিলেন। রাস্তাঘাট ছিল জনশূন্য, দোকানপাট ও বাজারও ছিল কার্যত অচল। তবে সোমবার সকাল থেকে ধীরে ধীরে সেই ভয় ও উৎকণ্ঠা কাটতে শুরু করেছে। যদিও সাধারণ মানুষ পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না।
বর্তমানে এখনো বলবৎ রয়েছে ১৪৪ ধারা— যা কার্যকর আছে জেলা সদর, পৌর এলাকা ও গুইমারা উপজেলায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হলে ধাপে ধাপে এই ধারা প্রত্যাহার করা হবে।
নিরাপত্তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে
সহিংসতার পর থেকে পুরো জেলায় সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের যৌথ টহল অব্যাহত রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বাজার ও প্রবেশপথে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। কড়াকড়ি তল্লাশি চালানো হচ্ছে সন্দেহভাজনদের ওপর। এতে সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও নিরাপত্তা অনুভব করছেন।
পুলিশ ও বিজিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একযোগে কাজ করছে। তাদের ভাষায়—
“যে কোনো মূল্যে দুষ্কৃতিকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে, কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
স্বনির্ভরে ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান
সহিংসতার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খাগড়াছড়ি সদরের স্বনির্ভর বাজার এলাকা। এখানে অন্তত ১৭টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক ব্যবসায়ী রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে প্রশাসন
সোমবার বিকেলে জেলা প্রশাসক এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার স্বনির্ভর বাজার এলাকা পরিদর্শন করেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলেন তিনি। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন—> “যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, প্রশাসন তাদের পাশে আছে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করে ন্যায্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি বিশেষ বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে।”
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের এমন আশ্বাসে কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছেন।
তদন্ত কমিটি গঠন
সহিংসতার ঘটনার তদন্তে ইতোমধ্যে ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এই কমিটি কাজ করবে। তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
পরিস্থিতি নির্ভর ১৪৪ ধারা
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে ধীরে ধীরে তুলে নেওয়া হবে ১৪৪ ধারা। এর আগে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। জনগণের নিরাপত্তাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
কয়েকদিনের অচলাবস্থা শেষে বাজার, দোকানপাট ও যানবাহন সচল হওয়ায় স্থানীয়রা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। তবে তারা মনে করছেন, এখনো ভয় কাটেনি। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও দোষীদের শাস্তি চান।
একজন ব্যবসায়ী মো. আব্দুল মমিন বলেন—“আমাদের জীবনের সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। এখন সরকারের সাহায্য ছাড়া সামনে এগোনো সম্ভব নয়।”
পরিদর্শন
আজ বুধবার (১অক্টোবর) বিকালে স্বনির্ভর এলাকায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে জেলা প্রশাসক এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার, পুলিশ সুপার মো. আরেফিন জুয়েল,উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুজন চন্দ্র রায়সহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা।
প্রশাসনের অঙ্গীকার
প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে— মানুষের নিরাপত্তা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা, ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো এবং দুষ্কৃতিকারীদের বিচারের আওতায় আনা— এই তিনটি কাজই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে, উত্তপ্ত পরিস্থিতি কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে খাগড়াছড়ি। তবে মানুষ পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারবে কেবল তখনই, যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দৃশ্যমানভাবে দাঁড়াবে সরকার ও প্রশাসন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ আব্দুল মুননাফ , ই-মেইল: ই-মেইল নং : gsongbad440@gmail.com , মোবাইল-০১৭১১-৩৫৯৬৩১
Copyright © 2026 gramersongbad.com. All rights reserved.