হালখাতা বন্ধ, ব্যবসায় হোঁচট

নিজস্ব প্রতিবেদক : গ্রামীণ ঐতিহ্য ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অনিবার্য অনুষঙ্গ হালখাতাকেও আঘাত করেছে ভয়ঙ্কর করোনাভাইরাস। সারা বছর মহাজন ও গ্রাহকরা হালখাতার দিকে চেয়ে থাকলেও করোনাভাইরাস এর কারণে জনসমাগম নিষিদ্ধ ঘোষণা করার ফলে এবার হালখাতা করতে পারছেন না তারা। ফলে হালখাতাকেন্দ্রিক যে অর্থ সঞ্চালন হয় এবার তা হচ্ছে না।

আবহমান কাল ধরে আশেপাশের সব জনপদ একই আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। এ সব মানুষের জীবনও আবর্তিত হয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়। ব্যবসা-বাণিজ্যও পরিচালিত হয় সৌহার্দ্যরে বন্ধন ধারাতে। তাই লেনদেনে যতটা মুনাফাকেন্দ্রিক হয় তারচেয়ে বেশি হয় জীবন ও সম্পর্কের তাগিদে। এ কারণে বছরব্যাপী বাকীতে লেনদেন হলেও হালখাতায় পুরনো বাকী পরিশোধ হয়। গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করান হাট-বাজার বা গঞ্জের মহাজন বা দোকানদাররা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুটা যান্ত্রিক হয়ে গেলেও বাংলা বছরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য এখনও আছে পুরোপুরিই। পহেলা বৈশাখে বেশিরভাগ হালখাতা হয়ে থাকে।

সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করে। করোনা প্রতিরোধে দেশব্যাপী চলছে সাধারণ ছুটি। জনসমাগম হয় এমন সব ধরণের কার্যক্রম বন্ধ। উৎপাদন, বিপননসহ সব ধরণের কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে এসেছে। মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে, নেই রোজগার। ফলে পুরনো বাকীর পরিশোধের জন্য মহাজনরা হালখাতা করবেন, সেটা আর সম্ভব হয়ে উঠছে না। সব কিছু চলছে জরুরি ভিত্তিতে অস্বাভাবিকভাবে। এ অবস্থায় আবহমান কাল ধরে চলে আসা ব্যবসা-বাণিজ্যের অনিবার্য আনুষ্ঠানিকতা হালখাতা হচ্ছে না। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্রিক পল্লী অঞ্চলের কর্মচঞ্চলতা আরও স্থবির ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল।

হালখাতা না হওয়ার মধ্য দিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির আনন্দ-উৎসব কেন্দ্রিক যে ব্যবস্থা তা হোঁচট খেলো বলে মনে করেন বিআইডিএস এর গবেষণা পরিচালক ও অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদ বখত। তিনি বলেন, আর্থিক ব্যবস্থায় হালখাতা আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে। এখানে টাকা-পয়সার লেনদেনের জটিল বিষয়ও রীতিমত উৎসবে পরিণত হয়। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই হালখাতার দিকে চেয়ে থাকে। এরপর ব্যবসা-বাণিজ্য প্রাণচাঞ্চল্যতা পায়। কিন্তু এবার চিরচেনা সেই আনুষ্ঠানিকতা দেখা যাবে না।

হালখাতার সঙ্গে কৃষকের ফসল কাটার একটি বিষয় জড়িয়ে আছে। এখন চৈতালি ফসল ঘরে তোলার মৌসুম চলছে। এ মৌসুমে কৃষক ফসল কেটে ঘরে তোলে। হাতেও সময় থাকে। চলাচলে বিধিনিষেধ থাকার কারণে মানুষ ঝুঁকি নিয়ে গঞ্জে যেতে চাইবে না। মহাজনরাও তাই এমন উদ্যোগ নিচ্ছেন না। ফলে অর্থ সমাগমও হবে না। তবে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পরে হালখাতা হতে পারে বলে মনে করেন ড. জায়েদ বখত।

দেশে ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়া ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরণ বদলে যাওয়ার কারণে হিসাব যেমন প্রতিদিনই করতে হয়। আবার বাকীর হারও কমে গেছে। কিন্তু হালখাতার ধারাটি এখনো আছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন খোলা কাগজকে বলেন, মাস জুড়ে করোনাভাইরাসের তা-ব চলার কারণে হালখাতা ব্যাহত হয়েছে, তবে তিনি আশাবাদী পরে হলেও হবে ক্রেতা-বিক্রেতার এই মিলন উৎসব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *