শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বদ্ধ দ্বার খুলছে কাল

নিজস্ব প্রতিবেদক : করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ থাকার পর আগামীকাল রোববার খুলছে দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ সময় পর এদিন সশরীরে শিক্ষার্থীরা সহপাঠীদের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠ কার্যক্রমে অংশ নেবে। আবারও শিক্ষার্থীদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও প্রতিদিন সবাইকে যেতে হবে না ক্লাসে। বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ক্লাস নেওয়া হবে। অন্যদের সপ্তাহে এক দিন করে। আর করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে শুরু করা হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক ক্লাস কার্যক্রম।

এদিকে গত বৃহস্পতিবারের মধ্যে সব স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাকে পাঠদান উপযোগী করার নির্দেশ দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর। নির্দেশনা মেনে প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শেষ করা হয়েছে ধোয়া মোছা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিতে বিশেষভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তবে দেশের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে বন্যার কারণে এবং নদীভাঙনে তিন শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।

অন্যদিকে করোনার সংক্রমণ আবারও বাড়লে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ফের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় বন্ধের সুপারিশ করবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এছাড়া, প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের দেওয়া স্বাস্থ্যবিধির নির্দেশনা পালন নিশ্চিত করতে ও সঠিকভাবে অনুসরণের জন্য মনিটরিং টিম গঠনের জন্য নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। আর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ দিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকার ৪৪৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে ডিএনসিসি।

দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর গত বছরের ১৭ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর দফায় দফায় সেই ছুটি বাড়ানো হয় ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। যদিও এর মধ্যে কয়েকবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রস্তুতির কথা বলা হলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। সবশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বলেছেন, খুব তাড়াতাড়ি স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার জন্য তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। ওই দিন রাতেই বৈঠক করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পক্ষে মত দেয় করোনা সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রী দীপু ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেন। আর গত রোববার সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে শেষে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়।

দীপু মনি বলেন, স্কুল কলেজ মাদ্রাসা খোলার পর প্রথমে চলতি বছরের এবং আগামী বছরের এসএসসি-দাখিল ও এইচএসসি-আলিম পরীক্ষার্থী এবং প্রাথমিকের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ক্লাস হবে। বাকি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে এক দিন করে ক্লাস হবে। আর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক ক্লাস কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আবারও বাড়লে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ফের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় বন্ধের সুপারিশ করবে জানিয়ে গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, সংক্রমণের সঙ্গে সবকিছুই জড়িত। সংক্রমণ কমেছে বলেই স্কুল-কলেজ খুলছে। যদি দেখি আমাদের এখানে সংক্রমণের হার আবার বেড়ে যাচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় তো নেবেই। আমরাও সেভাবেই পরামর্শ দেব। আমরা চাইব না আমাদের ছেলেমেয়েরা সংক্রমিত হয়ে যাক। এছাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের দেওয়া স্বাস্থ্যবিধির নির্দেশনা পালন নিশ্চিত করতে ও সঠিকভাবে অনুসরণের জন্য মনিটরিং টিম গঠনের জন্য নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। সরকারি-বেসরকারি সব স্কুল-কলেজকে মনিটরিং টিম গঠনের নির্দেশ দিয়ে আদেশ জারি করা হয়েছে।

এদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ঘোষণার পর থেকেই ক্লাসরুম পাঠদান উপযোগী করতে কাজ শুরু করেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয় ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে। নির্দেশনা অনুযায়ী বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই সেরেছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ। এ উপলক্ষে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকার ৪৪৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন দিনের বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে ডিএনসিসি। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণায় উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিন পর ক্লাসরুমে ফিরতে উদগ্রীব হয়ে আছে তারা। ইতিমধ্যে জামা-কাপড় তৈরি, বই-খাতাপত্রসহ অন্যান্য উপকরণ কেনাকাটাও শেষ।

দীর্ঘ বিরতির পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসছে শিক্ষার্থীরা, তাই তাদের বরণ করে নিতে বিশেষভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এদিন রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বেইলি রোড, আজিমপুর, ধানমন্ডি ও বসুন্ধরা চারটি শাখার প্রবেশপথের সব ফটক বেলুন ও জরি কাগজ দিয়ে সাজানো হবে। তিন ফুট দূরত্ব রেখে শিক্ষকরা গেটের সামনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবেন। ছাত্রীরা যখন প্রবেশ করবে, শিক্ষকরা করতালি ও ড্রাম বাজিয়ে সংবর্ধনা ও শুভেচ্ছা জানিয়ে তাদের ভেতরে প্রবেশ করানো হবে।

এদিকে সংশয় দেখা দিয়েছে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের ১৩ জেলায় বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত তিন শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে। এছাড়া অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *