শার্শায় যারা কোরবানি দেয়নি তাদের মাঝে মাংশ সমবন্টনের মাধ্যমে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি

বিশেষ প্রতিনিধি : কোরবানির দিন দুপুরের পর থেকে গ্রামগঞ্জে একটা সাধারণ দৃশ্য সকলেরই চোখে পড়ে। কোরবানীদাতার বাড়ির দরজায় একদল মানুষের ভিড়। কোরবানীর মাংশ সংগ্রহের জন্য তারা দলে দলে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। তাদের কেউ একা, কেউ পরিবারসহ, কেউ পেশাদার ভিক্ষুক, কেউ গরীব, কর্মজীবি, যাদের নিজের কোরবানী দেওয়ার সামর্থ্য নেই।

এর ব্যতিক্রম যশোরের শার্শা উপজেলার বাগআচড়া ইউনিয়নের সামটা গ্রামে।
এই গ্রামে যারা কোরবানি দিতে পারেন না তাদের প্রতিটি ঘরে ঘরে কোরবানির মাংশ পৌঁছে দিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন গ্রামবাসী।

একইভাবে বেনাপোলের গাজীপুর গ্রামের মধ্যপাড়ায় ১৪৪ টি পরিবারের ৫৫০ জনকে জনপ্রতি ৩৫০ গ্রাম করে কোরবানির মাংশ প্রত্যেকের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়। বেনাপোল বায়তুন নূর জামে মসজিদ (গোলদার বাড়ি)র তত্ত্বাবধানে মোঃ জাকারিয়া, মোঃ রমজান আলী ও মোঃ আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে যারা কোরবানি দেয়নি তাদের প্রত্যেকের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

‘ঈদের এই খুশির দিনে ধনী গরিব সবার ঘরে যাতে মাংস রান্না হয়’ সে কারণে এই ব্যবস্থা। আর এটা তত্বাবধান করেন ওই গ্রামের যারা পশু কোরবানি করেছেন তারাই।

বুধবার পশু কোরবানির পর বিকেল থেকে এ মাংসের ভাগাভাগি শুরু হয়।যশোরের শার্শা উপজেলার সামটা গ্রামে এই সামাজিক কোরবানির মাংস তৈরি ও বিতরণ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। স্থানীয় ধনী-গরিব সবাই এই মাংসের অংশীদার।

সামটা ছিদ্দিকিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মমিনুল ইসলাম বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করা হয়। তাই কোরবানির এই মাংশ যাতে সমাজের সবার ঘরে ঘরে পৌঁছায়, সে জন্য তিন ভাগের এক ভাগ (লিল্লার অংশ) মাংশ মহল্লার নির্দিষ্ট স্থানে জমা দিতে বলা হয়। বাড়িতে বাড়িতে কোরবানির পর গেরস্তের পক্ষ থেকে এই মাংশ সেখানে পৌঁছে দেওয়া হয়।

সামটা এবতেদ্বায়ী মাদ্রাসা মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা ফারুক হাসান জানান, সামটা গ্রামে যারা পশু কোরবানি দেন, তারা প্রতিটি পশুর মাংসের তিন ভাগের এক ভাগ জমা দেন এই সামাজিক ভাগ-বণ্টনে। কেউ এই নিয়মের ব্যতিক্রম করলে তাকে সমাজের কাছে জবাবদিহির ব্যবস্থা রয়েছে। গ্রামে যারা কোরবানি করেননি তাদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়। এই সমাজভুক্ত প্রত্যেকের বাড়ির প্রতিটি সদস্যকে এক একটি ইউনিট ধরে তালিকা তৈরি করা হয়।এবার জমাকৃত মোট মাংশ ওজন দিয়ে তাকে ইউনিট দিয়ে ভাগ করে পরিবার প্রতি মাংস পৌঁছে দেওয়া হয়। আগে স্থানীয় মসজিদ থেকে মাইকিং করে আওতাভুক্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের ডেকে এনে মাংস বিতরণ করা হতো।

বন্টনকারিদের একজন ইয়াকুব আলি সরদার বলেন, ‘কুরবানির গোস্ত আমরা সবার বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেই।তবে গরীব দুঃস্থদের অনেকে এসেও নিয়ে যায়। লোক লজ্জায় অনেকে কুরবানি না দিলিও গোস্ত নিতে আসতি পারে না, গোস্ত যাতে সবাই পায় তাই এই ব্যবস্থা।’

“এবার সামটা পশ্চিম পাড়ায় ৫৮০টি পরিবারের মাঝে মাংশ বিতরন করেছি।জনপ্রতি ৫৮০গ্রাম করে মাংশ দেওয়া হয়েছে। তবে যাদের বাড়ির লোক সংখ্যা ৩জন বা এর কম তাদেরকে মোট দুই কেজি মাংশ দেওয়া হয়েছে।”

গ্রামের সাবেক মেম্বর আকবর আলি বলেন, আমাদের গ্রামটি অনেক বড় পাঁচ হাজার লোকের বাস।তাই মাংস গ্রামের ছয়টি পাড়ায় আলাদা আলাদা ক্যাম্প করে বিলিবন্টন করা হয়। এতে কারো এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে না।

‘কবে থেকে এই প্রথা চালু রয়েছে’ জানতে চাইলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক লিয়াকত আলি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে এই প্রথা গ্রামের মুরুব্বিরা চালু করেন।তাদের অনেকেই গত(মারা) হয়েছেন। কোরবানি দেওয়ার পর লিল্লার মাংস সবাই নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেন। জমা দেওয়া মাংস আশপাশের প্রতিটি পরিবারকে একক ধরে ভাগ করা হয়। ধনী-গরিব সবাই সমান হারে ভাগ পায়। এই নিয়মে কোরবানির মাংস বণ্টনের ফলে কোরবানির দিন কেউ মাংস পাওয়া থেকে বাদ পড়ে না। তবে বর্তমানে একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভাগ হয়ে ছোট পরিবার হয়ে যাওয়ায়, সামাজিক কোরবানির এই মাংস ভাগের প্রথা চালু রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

মেনুকা বেগম বলেন, “গরীর হয়ে জন্মাইছি তাই কুরবানি দিতি পারিনে।আল্লা যাদের হেকমত দেছে তারা কুরবানি দেয়। রোজার ঈদি অল্পআদ্যেগ গোস্ত কিনি। তবে কুরবানির ঈদি আমাগের গোস্ত কিনা লাগে না। ওরা বাড়ি গোস্ত দিয়ে যায়।”

ইস্রাফিল হোসেন বলেন, “আগে মাইকি বলে দিতো তখন লিল্লার গোস্ত নিতি আসতি হতো। এখন প্রেথ্যেক বছর কুরবানির পর বাড়ি গোস্ত দিয়ে যায়। তাই দিয়ে ছেলেপুলেদের খাওয়ায়, নিজেরা খাই।”

সামটা ছিদ্দিকিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মমিনুল ইসলাম বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করা হয়। তাই কোরবানির এই মাংশ যাতে সমাজের সবার ঘরে ঘরে পৌঁছায়,সে জন্যই আমাদের উদ্যোগ।

আগে আমরা দেখেছি, কোরবানীদাতা নিজে বা তার পক্ষ থেকে বাড়িতে দল বেঁধে মাংশ কুড়াতে গেলে তাদের হাতে হাতে এক-দুই টুকরা করে মাংশ তুলে দিত। সেখানে জটলা হলে হাতে মাংশ বিতরণ করতো আর মুখে কাউকে ধমকাতো, কাউকে বকাবকি করতো, কাউকে তাড়া করতো এবং কারও উদ্দেশ্যে বিশেষ কোনও মন্তব্য করতো।এতে কোরবানির আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *