শত বছর ধরে রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হচ্ছে বাঁশ!

ডা: মো: ওবায়দুল কাদির : সবচেয়ে লম্বা ঘাস, দ্রুত বর্ধনশীল চিরহরিৎ উদ্ভিদ হলো বাঁশ। বাঁশ মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কাজে লাগে । গ্রামীণ গৃহের একটি প্রয়োজনীয় উপাদান বাঁশ। বাঁশের শতাধিক প্রজাতি রয়েছে এবং পূর্ব, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অংশে বড় বড় আকারে এরা বেড়ে ওঠে। বাঁশ গাছ সাধারণত একত্রে গুচ্ছ হিসেবে জন্মায়। এশিয়াতে ঐতিহাসিক কাল থেকে সহস্রাব্দ জুড়ে বাঁশের ব্যবহার শিকড় সংস্কৃতি ও সভ্যতায় বিস্তৃত রয়েছে।
সারা বিশ্বে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ বাঁশের তৈরি বাড়িতে বাস করেন। ৭০ হেক্টর জমিতে যে পরিমাণে বাঁশ জন্মায়, তা থেকে ১,০০০ বাড়ি তৈরি করা যায়। বাড়ি তৈরির কাজে বাঁশ ব্যবহার করা হলে অনেক গাছ বাঁচানো সম্ভব।
জীবনধারণের নানা কাজে প্রয়োজনীয় উদ্ভিদ বাঁশের প্রজাতি-বৈচিত্র্যের দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীতে অষ্টম। বাংলাদেশে ৩৩ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে। ৫০০ প্রজাতির বাঁশ নিয়ে বিশ্বে প্রথম অবস্থানে রয়েছে চীন। ২৩২ প্রজাতি নিয়ে ব্রাজিল রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে। ১৩৯ প্রজাতি নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে জাপান।
বাঁশ প্রথম দিকের মানুষদের দ্বারা তৈরি প্রথম উপকরণগুলোর মধ্যে একটি। সভ্যতার বিকাশ ঘনিষ্ঠভাবে বাঁশের উপকরণগুলোতে দক্ষতার বৃহত্তর মাত্রা বিকাশের সাথে জড়িত ছিল। কাঠের কাজ করার মতোই বাঁশ মূলত বাঁশের নির্মাণ, বাঁশের টেক্সটাইল, বাঁশ এবং কাঠের স্লিপ, বাঁশের বাদ্যযন্ত্র, বাঁশের বুনন এবং অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নানা কাজে ব্যবহার করা হয় বাঁশ। এমনকী, বাঁশ থেকে আচারসহ নানা ধরনের খাবারও তৈরি হয়।
রাস্তা তৈরিতেও ব্যবহার করা হয় বাঁশ। বাঁশের তৈরি সেতুও রয়েছে। সেই সেতু ১৬ টন পর্যন্ত ভার নিতে সক্ষম।
বিভিন্ন রোগ সারাতেও ব্যবহার করা হয় বাঁশ। চীনে কিডনির রোগে আক্রান্তদের সুস্থ করে তুলতে ব্যবহার করা হয় বাঁশ। এমনকী, ক্যানসার আক্রান্তদের দেওয়া হয় বাঁশের পাতা ও শিকড় থেকে তৈরি ওষুধ। ইন্দোনেশিয়ায় হাড়ের রোগ সারাতে পানি করতে দেওয়া হয় বাঁশের ভিতরে জমে থাকা পানি।
সদ্য অঙ্কুরিত বাঁশের চারাকে কোড়ল বলা হয়। হালকা হলুদ এবং সবুজের মিশ্রণে এটি দেখতেও বেশ। কোড়ল খুব নরম ও আর্দ্র। বাংলাদেশে সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি আদিবাসীরা এটি বেশি খেয়ে থাকেন। তবে ভারতের মেঘালয়, আসাম ও হিমাচল প্রদেশ, নেপাল, ভুটান, চীন, কোরিয়া ও জাপানে বাঁশের কোড়ল খুব জনপ্রিয়।
তাজা বাঁশের কোড়লে যা যা রয়েছে- পানি- ৮৮ থেকে ৯৩ শতাংশ, প্রোটিন- ১ দশমিক ৫ থেকে ৪ শতাংশ, চর্বি- শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ, চিনি- শূন্য দশমিক ৭৮ থেকে ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ, সেলুলোজ- শূন্য দশমিক ৬০ থেকে ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ, খনিজ পদার্থ- ১ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়াও রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিনও।
বাঁশের কোড়লে রয়েছে উপকারী সব উপাদান যা দেহের কোলেস্টরেলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। এটি হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। রক্তচাপ রাখে নিয়ন্ত্রণে। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। হাঁপানি, ডায়াবেটিস, তীব্র জ্বর, মূর্ছা যাওয়া, মৃগী রোগ ইত্যাদি নিরাময়ে যথেষ্ট উপকার করে বাঁশ।
বাঁশ থেকে জামাকাপড়ও তৈরি করা যায়। বাঁশ থেকে তৈরি টি-শার্ট, মোজা, অন্তর্বাস বেশ জনপ্রিয়ও হয়ে উঠছে।
শুধু পোশাকই না, বাঁশের গয়নাও বেশ জনপ্রিয়। বাঁশ থেকে তৈরি হয় কানের দুল, হার, বালার মতো গয়না।
বাঁশ ব্যবহার করে তৈরি নানা খাবারও বেশ জনপ্রিয়। শুধু চীন, জাপানের মতো দেশগুলোতেই নয়, ভারতেও বাঁশের তৈরি খাবার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় আসবাবপত্রও। বাঁশের তৈরি খাট, চেয়ার, টেবল বেশ টেকসই।
বাঁশ দিয়ে এখন ডায়াপারও তৈরি করা হচ্ছে। জাপানের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ৫০ বার ধোয়ার পরেও ভাল থাকে বাঁশ দিয়ে তৈরি ডায়াপার।
বাঁশ দিয়ে বাচ্চাদের নানা খেলনাও তৈরি হয়। অনেকেই প্লাস্টিকের খেলনার বদলে বাচ্চাদের বাঁশ দিয়ে তৈরি খেলনা উপহার দেন।
বাঁশ শিল্পের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। অবহেলায় বেড়ে ওঠা বাঁশের প্রতি একটু নজর দিলে এ থেকে বছরে কোটি কোটি ডলার আয় হতে পারে।
এছাড়া চীনও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঁশ ও বাঁশজাত পণ্য রফতানি করে বিপুল অর্থ আয় করছে। বাঁশের ফার্নিচার ও আসবাবপত্র পরিবেশবান্ধব।
জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ মোকাবিলা ও ভূমিক্ষয় রোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বাঁশঝাড়। এটি দ্রুত বর্ধনশীল একটি উদ্ভিদ। কম বিনিয়োগে বাঁশ চাষে বেশি লাভ হয়। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে এই গাছ। জলবায়ুসহিষ্ণু ও দেশের আবহাওয়া উপযোগী এসব বাঁশ পাহাড়ধস, ভূমিক্ষয় ও নদীভাঙন রোধে কাজ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *