লকডাউনে কঠোর প্রশাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোরে লকডাউনের প্রথমদিনে যে যার মত অবাধে রাস্তায় বের হয়েছে। কেউ আবার ব্যস্তসময় পার করছে কেনাকাটায়। প্রশাসন কঠোর অবস্থানে থাকলেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলেছিলো কেউ কেউ। ফলে শহরে ক্রেতা-পথচারীদের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো। এদের মধ্যে কারো মুখে মাস্ক, কারো থুতনির নিচে মাস্ক, আবার কারো মুখে ছিলো না মাস্ক। পথচারীদের দাবি, সরকারি আদেশে অনেক কিছুই খোলা। মেলাতে হচ্ছে জীবন-জীবিকার হিসাবও। তাই ইচ্ছা না করলেও বাধ্য হয়ে বের হতে হচ্ছে। তবে, লকডাউনে বিধিনিষেধ কার্যকরের সাথে নাগরিক কষ্ট কমিয়ে আনার তাগিদ দিয়েছেন তারা। আর প্রশাসন বলছে, প্রথমে সচেতনতা বাড়াতে জনতাকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। পরবর্তীতে না মানলে তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কঠোর পদক্ষেপ।

সরেজমিনে যশোর শহরের বিভিন্ন সড়ক ও মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এক সপ্তাহের লকডাউন শুরু হয়েছে গতকাল সোমবার ভোর ছয়টা থেকে। যশোরে ১ম দিন কাজের প্রয়োজনে সড়কে নেমে শহরবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন ভিন্ন চিত্র। জরুরি কাজের জন্য সীমিত পরিসরে সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত অফিস ও আদালত এবং বেসরকারি অফিস খোলা ছিলো। ফলে মেলাতে হচ্ছে জীবন-জীবিকার হিসাবও। তবে প্রয়োজনীয় যানবাহন না থাকায় দুর্ভোগে পড়ে পথে নামা মানুষেরা। এদিন শহরের বড়বাজারে কাপুড়িয়াপট্টি ও স্বর্ণপট্টি মার্কেটগুলো বন্ধ থাকলেও তাদের সামনে বসেছিলো ভ্রাম্যমাণ দোকানের সারি। এসব দোকানগুলোকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টি হয় মানুষের সমাগম। আবার মোবাইলকোর্ট অভিযানের খবর টের পেলেই মুহূর্তের মধ্যে রাস্তা ও দোকানপাট ফাঁকা হয়ে যায়। এছাড়া ব্যাংকগুলোতে লেনদেন চলছে সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত। শহরের কাঁচাবাজারগুলোতে ক্রেতার সংখ্যাও তেমন নেই। এছাড়া যশোর শহরের বিভিন্ন সড়কে মোড়ে মোড়ে পুলিশ চেকপোস্ট বসায়। সেখানে সব ধরনের গাড়িতে বসা যাত্রীদের বাইরে বের হওয়ার সুর্নিদিষ্ট কারণ বলেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আর যারা অকারণে বাইরে বের হয়েছিলো তাদেরকে বুঝিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। শহরে দশটির মত টিম অভিযানে অংশ নিয়েছে।

শহরের দড়াটানা চেকপোস্টে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট খায়রুল জানান, সকাল থেকেই বিভিন্ন গাড়ি চেকপোস্ট বসিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তারপরেও অনেকেই সরকারি নির্দেশনা মানছে না। বেশির ভাগ লোক অকারণে বাইরে বের হচ্ছে। সকাল থেকে অর্ধশতাধিক গাড়ির কাগজপত্র বা অন্যান্য সেপটি নিশ্চিত না করায় জরিমানা করেছি। এছাড়া পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তারা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে চেকপোস্ট ছাড়াও প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

দড়াটানায় আমিন হোসেন নামে এক রিকশাচালক বলেন, ‘নামে লকডাউন, কামে নাই। খেয়ে যদি বাঁচি তাহলেই না করোনায় মরবো। একদিন রিকশা নিয়া বাইরে না বের হলে আমার পরিবারের পেটে ভাত জুটে না। তাই রিকসা নিয়ে বের হয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, শহরের ঘোপ থেকে দুইজন যাত্রী নিয়ে দড়াটানায় আসতেই পুলিশ যাত্রীদের রিকসা থেকে নামিয়ে রিকসা নিয়ে নেয়। তারপর রিকসার সব চাকার হাওয়া ছেড়ে দিয়ে রিকসা উল্টে ফেলে রাখে। তারপর থানায় নিয়ে যায়। রিকসা না পেলে আমার সংসার চলবে না। ঘোপ এলাকার এনজিও কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান আহম্মেদ বলেন, লকডাউন কেমন হচ্ছে বুঝছি না। আসলে সরকার যে লকডাউন ঘোষণা করেছে সেটা বাস্তবায়ন করা কঠিন মনে হবে। মানুষ অপ্রয়োজনে ঘোরাঘুরি করছে। স্বাস্থ্যবিধি মানার কোন বালাই নেই। ঢিলেঢালা লকডাউন কার্যকর করতে প্রশাসনকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে বলেও জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, সরকার ঘোষিত একসপ্তাহের লকডাউন যশোরে বাস্তবায়ন করার জন্য কঠোর অবস্থায় রয়েছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহরে করা হচ্ছে নিয়মিত মোবাইলকোর্ট অভিযান। মানুষদের সচেতনতার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি না মানা ও মাস্ক না পরায় তাদেরকে জেল-জরিমানা করা অব্যাহত রয়েছে। অভিযানের সময় পথচারীদের যাদের মাস্ক নেই তাদেরকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাস্ক বিতরণ করছেন ম্যাজিস্ট্রেটরা। সোমবার করোনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে সকল ক্ষুদ্র পরিবহন ও ভ্যান- রিকসাও বন্ধ রাখার সিন্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকারি নির্দেশনা মেনে লকডাউন কার্যকর ও স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে প্রশাসনের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও জনসাধারণের আরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *