যশোর শিক্ষা বোর্ডের আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা তদন্তে দুদক

যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাঠে নেমেছে। রোববার ১০ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে দুদকের উপ পরিচালক নাজমুস ছায়াদাতের নেতৃত্বে একটি টিম শিক্ষা বোর্ডে আসে।

তারা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মোল্লা আমির হোসেনের সাথে সাক্ষাত করেন। এরপর পর্যায় ক্রমে ঘটনা উঘাটনে তদন্ত শুরু করেন। এর আগে রোববার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় দুদকের যশোর কার্যালয়ে আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ দাখিল করেন বোর্ডের সচিব এ এম এইচ আলী আর রেজা।

টাকা আত্মসাতের বিষয়টি নজরে আসার পর আত্মগোপনে যাওয়া বোর্ডের হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম ১৫ লাখ ৪২ টাকা ফেরত দিয়ে অঙ্গীকার নামায় অপরাধের দায় স্বীকার করেছে বলে জানান, বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোল্লা আমীর হোসেনের।

দুদকের উপ পরিচালক নাজমুস ছায়াদাত জানান, আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় রোববার সকালে শিক্ষা বোর্ডের সচিব এ এম এইচ আলী আর রেজা দুদকে অভিযোগ জমা দেন। এরপর নাজমুস ছায়াদাতের নেতৃত্বে একটি টিম ঘটনা তদন্তে শিক্ষা বোর্ডে যান।

দুদকের তদন্ত টিম প্রথমে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাত করেন। পরে পর্যায় ক্রমে শিক্ষা বোর্ডের সচিব এ এম এইচ আলী আর রেজা, হিসাব শাখার হিসাব ও নিরীক্ষা (হিওনি) উপ পরিচালক ইমদাদুল হক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভেনাস প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিংয়ের মালিক শরিফুল ইসলাম বাবু ও শাহী লাল স্টোরের মালিক আশরাফুল ইসলামসহ ৭/৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ ও এ সংক্রান্ত কাগজপত্র সংগ্রহ করেন।

দীর্ঘ প্রায় ৪ ঘন্টা দুদকের তদন্ত টিম বোর্ডে অবস্থান করে। শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মোল্লা আমির হোসেন জানান, দুপুরে বোর্ডের গেটে দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের কাছে পলাতক আব্দুস সালামের পরিবারের পক্ষ থেকে ১৫ লাখ ৪২ হাজার টাকার একটি পেঅর্ডার ও একটি অঙ্গীকার নামা দিয়ে যায়।

চেয়ারম্যানকে লেখা অঙ্গীকার নামায় আব্দুস সালাম বলেছেন, আমি আব্দুস সালাম হিসাব সহকারি মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড যশোর। অতি সম্প্রতি শিক্ষা বোর্ডের চেক জালিয়াতি করে টাকা গ্রহন ঘটনার জন্য আমি ব্যক্তিগত ভাবে দায়ি।

শিক্ষা বোর্ডে কর্মরত অন্য কেউ বা ভেনাস প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং এবং শাহী লাল স্টোরের কেউ চেক জালিয়াতি কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। পূর্ব পরিচিতির সূত্রে বর্নিত দুটি প্রতিষ্ঠানের একাউন্ট ব্যবহার করে আমি উক্ত টাকা গ্রহন করেছি এবং আমার নিজ প্রয়োজনে খরচ করে ফেলেছি।

জালিয়াতকৃত টাকা আমি ফেরত দিতে ইচ্ছুক। আজ ১৫,৪২০০০ (পনেরো লাখ বিয়াল্লিশ হাজার) টাকা সচিব, যশোর শিক্ষা বোর্ডের একাউন্টে ফেরত দিলাম (জমা রশিদ অত্রসাত সংযুক্ত)। বাকি টাকাও পর্যায় ক্রমে আমি ফেরত দেয়ার অঙ্গীকার করছি।

অতত্রব আমার অপরপাধের জন্য আপনার কাছে ক্ষমা প্রাথনা এবং টাকা পরিশোধের জন্য সময় প্রাথনা করছি। শেষে লিখেছেন, বিনীত নিবেদক স্বাক্ষর রোববারের তারিখ পুরো নাম মোঃ আব্দুস সালাম। হিসাব সহকারি। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, যশোর।

এদিকে বোর্ডের কতিপয় কর্মকর্তা কর্মচারিরা বলেছেন, আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনার মাষ্টার মাইন্ড চেয়ারম্যান মোল্লা আমির হোসেন বাঁচার জন্য আব্দুস সালামকে দিয়ে এ সব নাটক করাচ্ছেন।

উল্লেখ্য ২০২০-২১ অর্থবছরের বিভিন্ন মালামাল ক্রয় বাবদ সরকারের ভ্যাটের ১০ হাজার ৩৬ টাকার ৯টি চেক ইস্যু করা হয়। পরবর্তিতে দেখা যায় যশোরের ভেনাস প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং ৭টি ও শাহীলাল স্টোর নামে দুটি চেকের মাধ্যমে বোর্ডের ২ কোটি ৫০ লাখ ৪৪ হাজার ১০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

বোর্ডের অডিট শাখা ৫ অক্টোবর মঙ্গলবার চেকের মুড়ি বইয়ের সাথে ব্যাংকের স্টেটমেন্ট মেলানোর সময় এই জালিয়াতি ধরা পড়ে। অথচ মুড়ি বাইয়ের চেকের অংকের সাথে ইস্যুকৃত চেকের অংকের মিল নেই।

বোর্ড সংশ্লিষ্টরা জানান, যশোর শিক্ষা বোর্ডের ২০২০-২১ অর্থবছরে কেনাকাটার আয়কর ও ভ্যাট পরিশোধ বাবদ ১০ হাজার ৩৬ টাকার নয়টি চেক ইস্যু করা হয়। বোর্ডের আয়-ব্যয়ের হিসাব ব্যাংক স্টেটমেন্টের সঙ্গে মেলাতে গিয়ে দেখা যায়, ওইসব চেকের বিপরীতে দুই কোটি ৫০ লাখ ৪৪ হাজার ১০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

এরপর দ্রুত হিসাব প্রদান শাখার হিসাব রেজিস্ট্রারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। এতে দেখা যায়, নয়টি চেক জালিয়াতি করে ভেনাস প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের নামে এক কোটি ৮৯ লাখ ১২ হাজার ১০ টাকা এবং শাহীলাল স্টোরের নামে ৬১ লাখ ৩২ হাজার টাকা তোলা হয়েছে।

ঘটনা তদন্তে গত বৃহস্পতিবার কলেজ পরিদর্শন কে এম রব্বানিকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। আজ রবিবার বোর্ডের সচিব আলী আর রেজা দুদক কার্যালয়ে এ ঘটনায় অভিযোগ করেন। এরপর বেলা ১২টার দিকে বোর্ডে এসে তদন্ত শুরু করেন দুদক কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সংগ্রহ করেছেন তারা। গত বৃহস্পতিবার টাকা আত্মসাতের বিষয়টি জানাজানির পর থেকে বোর্ডের হিসাব সহকারী আব্দুস সালামের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। আজও তিনি অফিসে আসেননি। বোর্ডে গিয়ে তার কক্ষটি তালাবদ্ধ দেখা যায়।

যশোর শিক্ষা বোর্ড এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বাবুল বলেন, হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম এর আগেও অনেক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১২ লাখ টাকার একটি দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। সেই সময় তদবির করে রক্ষা পান। এবার আড়াই কোটি টাকা দুর্নীতির সঙ্গেও তিনি জড়িত।

যশোর শিক্ষাবোর্ডের হিসাব সহকারী আব্দুস সালামের কক্ষ তালাবদ্ধ বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, অর্থ আত্ম সাতের ঘটনায় নাম আসা প্রতিষ্ঠান ভেনাস প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের মালিক শরিফুল ইসলাম বাবু ও তার স্বজন শহরের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি টাকা ফেরত দিতে চাচ্ছে। শাহীলাল স্টোরের মালিক আশরাফুল ইসলাম বোর্ড কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তার কাছে থাকা লক্ষাধিক টাকা ফেরত দিতে চান।

বোর্ডের সচিব আলী আর রেজা বলেন, মাঝে দুই দিন সরকারি ছুটি থাকায় আজ আমরা দুদকে একটি অভিযোগ দিয়েছি। দুদক কর্মকর্তারা সেটা গ্রহণ করেছেন।

বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মোল্ল্যা আমীর হোসেন বলেন, টাকা আত্মসাতের বিষয়টি জানাজানির পর থেকেই হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম অফিসে আসছেন না। অভিযুক্তরা টাকা ফেরত দিতে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এটা একটি আইনি প্রক্রিয়া। বিষয়টি আদালতের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *