মহামারী করোনা ভাইরাস বৃদ্ধির কারণে কিস্তি আদায় বন্ধ করার কথা বললেও এনজিওর কর্মীরা কিস্তি আদায়ে মরিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর জেলা প্রশাসনের করোনা মহামারির সময় এনজিও-র ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি আদায় কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে কাজে আসছে না।

যশোরের সীমান্তবর্তী শার্শা উপজেলা করোনা সংক্রমণ বেড়ে গেছে। ফলে সেখানে দু’সপ্তাহ লকডাউন (বিধিনিষেধ) ঘোষণা করেছে সরকার। এ অবস্থায় উপজেলার শার্শা, বেনাপোল, নাভারন ও বাগআচড়ায় যান চলাচল, অফিস-আদালত,ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। কিন্তু থেমে নেই এনজিওদের কিস্তি আদায়।

রোববার কিস্তির টাকা আদায় করতে আসা এনজিও ‘আশা’র উলাশী শাখার কর্মকর্তা শওকত আলিকে ঘিরে প্রতিবাদ করেন উপজেলার বাগআচড়া ইউনিয়নের সামটা গ্রামের গৃহবধু হাসিনা বেগম (২২), আতর আলি (৩৫), হাসানুজ্জামান (৩৫) ও নাজমুল ইসলাম। তারা করোনা মহামারির কারনে কিস্তির টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

জামতলা বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আতর আলি (৩৫) সমিতির কাছ থেকে ৫০হাজার টাকা ঋন নিয়েছেন আর মিস্টি ব্যবসায়ী হাসানুজ্জামান (৩৫)নিয়েছেন ১লাখ টাকা।

আতর আলি বলেন, লকডাউনে আমার দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। পঞ্চাশ হাজার টাকায় সপ্তায় ১৩’শ টাকা কিস্তি দিতি হয়। এ যাবত কাল দিয়ে আইছি, এখন তো আর দিতি পারছিনে। কিন্তু এনজিও ওয়ালারা তো শুনছে না।

হাসানুজ্জামান বলেন, সরকার লকডাউন দেছে তাই দোকান খুলতি পারছিনে। সপ্তায় কিস্তি দিতি হয় ২৬শ টাকা। এখন বেকার টাকা দেবো কন্তে?

এনজিও থেকে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে তাদের ব্যবসার কার্যক্রম চালান। এছাড়া অনেকে আবার ঋণ নিয়ে ইজিবাইক, থ্রি-হুইলার, ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন কিনে তা চালিয়ে আয় করেন এবং ঋণের কিস্তি দেন। আবার অধিকাংশ এনজিও বিবাহিত নারীদের সমিতির মাধ্যমে ঋণ দিয়ে থাকেন।

কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর লকডাউন দিলে কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। এখন এনজিও কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিস্তির জন্য ধরনা দিচ্ছেন, চাপ সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ঋণগ্রহীতারা।

শার্শা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ঋণগ্রহীতারা অভিযোগ করে বলেন, ‘করোনা মহামারির এই সময় আমরা খাবার যোগাড় করতি হিমসিম খাচ্ছি। তারপর এনজিও কর্মীরা মামলার ভয় দেখিয়ে কিস্তি আদায় করছেন।সরকার শুনছি কিস্তি আদায় বন্ধ করতি বলেছে কিন্তু ওরা তো শুনছে না।’

বেনাপোলের দিঘিরপাড় গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, ‘ ব্র্যাক থেকে লোন নিয়ে একটি ইজিবাইক কিনিছি। এখন রাস্তায় বেরুতি পারছিনে। কিন্তু ওই এনজিও কর্মীরা এসে ঋণের টাকার জন্য চাপ দিচ্ছেন এবং হুমকি দিচ্ছেন টাকা না দিলে ইজিবাইক নিয়ে যাবেন।’

একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায়কারী কর্মকর্তা শওকত আলি বলেন, ‘আমরা চাকরি করি। প্রতিষ্ঠান থেকে আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে টাকা আদায়ে। ঠিকমত কিস্তির টাকা আদায় করে অফিসে জমা দিতে না পারলে বেতন বন্ধ। এমনকি চাকরি হারাতে হবে।’

বেনাপোল পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলার রাশেদ আলী বলেন, গ্রামের মানুষ তার কাছে অভিযোগ করছে। লকডাউনের মধ্যে তারা খেতে পারছে না। তারপর আবার কিস্তির জন্য চাপ।

“ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, আদদ্বীন, আশাসহ কয়েকটি এনজিও কর্মীরা গ্রামে এসে দাপট দেখাচ্ছেন। তারা কিস্তি না দিলে মামলারও হুমকি দিচ্ছেন।”

এদিকে ২৪ জুন যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রফিকুল হাসান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মহামারি করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুহার যশোর জেলায় অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনা প্রতিরোধে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সময় সময় জারিকৃত পরিপত্র এবং এবং জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে শ্রমজীবী, কৃষক, ভ্যান রিকশাচালকের, চায়ের দোকানসহ নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষ ঋণের কিস্তি দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

এ অবস্থায় জেলায় কর্মরত সব এনজিও প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি আদায় কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখার জন্য অনুরোধ করা হল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *