দেশে প্রভাবশালী গ্রুপের ঘোষণায় : করোনা লড়াইয়ে অসমযোদ্ধা কারখানা শ্রমিকরা

টি হোসেন পাটোয়ারী, ঢাকা অফিস : এক অসমযুদ্ধে দেশের প্রায় কোটি খানেক কারখানা শ্রমিক। দেশে যখন করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু সংখ্যা ১০০ ছুই ছুই করছে আর আক্রান্ত সাত হাজার অতিক্রম করছে ঠিক তখন গার্মেন্টস শ্রমিকরা কার্যত কোন রকম স্বাস্থ্য বিধি মানা ছাড়াই কারখানায় যাতায়াত করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, যে কোন সময় তৈরি পোশাক কারখানা থেকে বড় ধরণের মানবিক বিপর্যয়ের খবর আসা শুরু হবে। আর শিল্প উদ্যোক্তারা আছেন ‘শ্রমিকদের শরীরে করোনা প্রতিরোধী শক্তি আছে’এর আত্মতৃপ্তি নিয়ে।

দেশে করোনা আক্রান্তের দ্বিতীয় ঢেউ যখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন যখন ৭০ এর উপর মৃত্যু খবর আসছিল, আক্রান্ত যখন সাত হাজার ছাড়িয়ে যায় তখন সরকার ১৪ এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা করে। কল-কারখানা, ব্যাংক বীমা, সরকারী অফিস, গণপরিবহন সব কিছু বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু দেশে প্রভাবশালী গ্রুপ তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যেক্তরা সোনাগাঁওয়ে হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে দাবি জানায় কারখানা খোলা রাখার। এরপর পরই মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ থেকে শিল্প কারখানা খোলা রাখার ব্যাপারে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়। একদিন পর প্রজ্ঞাপন জারি হয় কল-কারখানা খোলা রেখে লকডাউন করতে হবে।

প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয় প্রতিটি কালখানা নিজ ব্যবস্থাপনায় পরিবহন ও স্বাস্থ্য বিধির ক্ষেত্রে যে সব নির্দেশনা আছে সেগুলো মানতে হবে।

করোনা মহামারীর মধ্যে কারখানা মালিকরা কি সরকারের দেওয়া সেই শর্ত মানছে? এ পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখার জন্য এই প্রতিবেদক মিরপুরের বিভিন্ন কারখানা ঘুরে দেখে এবং আশুলিয়া, নারায়নগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানার খোঁজ-খবর নেয়। জানতে পারে, করোনা মহামারী থেকে শ্রমিকদের রক্ষার জন্য কারখানা সমূহ ‘নামকা ওয়াস্তে’ স্বাস্থ্য বিধি মানছে।

মিরপুরের রিসল গার্মেন্ট কারখানায় দেখা যায়, গায়ে গায়ে হেলান দিয়ে নারী শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশ করছে। হাত ধোয়ার বা কেমিকেল ফোয়ারার ব্যবস্থা নেই। জ্বর মাপার ব্যবস্থা থাকলেও তা কার্যকর নয়। শ্রমিকরা দ্রুত গতিতে কারখানার মধ্যে প্রবেশ করছেন কিন্তু সেই গতিতে শ্রমিকদের জ্বর মাপার রিডিং ওঠছে না। ফলে দুয়েকজন শ্রমিকেরই জ্বর মাপা হচ্ছে না।

কারখানাটিতে যে সব শ্রমিকরা চাকরি করেন তাদের সকলেই এক থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস। তারা হেটেই অফিসে আসেন। পরিবহন লাগে না। পাশে অপর কারখানা এমবিএম-এ দেখা যায় বাইরে হাত দোয়ার ব্যবস্থা আছে। জ্বর মাপন ব্যবস্থা নামে মাত্র। শ্রমিকরা গায়ে গা ঘেষে কারখানায় প্রবেশ করছেন। সিকিউরটি লাইন ঠিক করার কাজে ব্যস্ত থাকলেও শ্রমিকদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোনই ভ্রুক্ষেপ নেই।

এ বিষয়ে কারখানার শ্রমিক আমির আলী বলেন, ‘আমগোরে করোনা হয় না। কিশের করোনা? হাজিরা না দিতে পারলে চাকরি থাকবে না। বেতন দেবো কে ?’
কিন্তু জীবনে না বাঁচলে মজুরি কি করবেন, দেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু দিনে ৯০ ছাড়িয়ে গেছে। আপনিও নিরাপদ নয়। এমন প্রশ্নের কোন জবাব নেই আমির আলীর।

আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়নগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অধিকাংশ শ্রমিক কারখানার ধারে কাছে থাকার কারণে হেটেই কালখানায় আসছে। যারা দূর থেকে বাসে অফিসে আসে তাদের অধিকাংশ নিজ উদ্যোগে কারখানা রিকসা-ভ্যান অটো রিকসাতে আসছেন। হাতে দুয়েকটি কারখানা শ্রমিকদের বাসে করে আনার ব্যবস্থা করেছে।

আশুলিয়ার শ্রমিক নেতা সাইফুল ইসলাম ভাষায় এ হার শতকরা ৫ ভাগ। যারা নিজ উদ্যোগে রিকসা, ভ্যান, অটো রিকসা যোগে কারখানায় আসছে তাদের স্বাস্থবিধি মানার কোন ব্যবস্থা নেই। গণপরিবহন না থাকার কারণে আগের একই পথ যাওয়ার জন্য ভাড়া গুনতে হচ্ছে দ্বিগুন থেকে ১০ গুন পর্যন্ত। এ জন্য খরচ বাঁচাতে শ্রমিকরা একই রিকসা-ভ্যান বা অটো রিকসাতে ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুন যাত্রী যাচ্ছে। এর ফলে শ্রকিকরা ন্যুনতম স্বাস্থ্য বিধি মানছে না।

এ বিষয়ে ইপিজেড মুখি একটি কারখানর শ্রমিক আঙ্গুরি খাতুন বলেন, ‘গা ঘেষাঘেষি করেই অফিসে যাইবার পারছি না। আবার কয় দূরত্ব! সময় মত কারখানায় না যাইবার পারলে চাকরি থাকবে না, বুজছেন?’ আসলে বুঝলাম! গার্মেন্টস শ্রমিকদের এটাই বাস্তবতা। একই খবর জানা গেছে গাজীপুর ও নারায়নগঞ্জ শিল্প এলাকা থেকে।

এ বিষয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র সাভার আশুলিয়া আঞ্চলিক সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কঠোর লকডাউন হলেও শিল্প কারখানা খোলা আছে। এতে করে শ্রমিকরা জীবনের ঝুকি নিয়ে কাজ করতে যাচ্ছেন, মৃত্যুকে পরওয়া না করে কারখানায় যাচ্ছেন। তারপরও শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ও নিপীড়িত। শ্রমিকদের বেতন বোনাস নিয়ে নানা তালবাহনা করে; গত ঈদে তাই করা হয়েছিল। এবারও তাই করার জন্য মালিক পক্ষ নানা রকম অজুহাতের খোঁজ করছে। কিন্তু যে শর্ত মানার শর্তে কারখানা খুলেছে সেই শর্ত তারা মানছে না।’

চলমান কঠোর লকডাউনের মধ্যে কারখানা খোলা রাখা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে কারখানাসমূহ নিজ পরিবহনে শ্রমিকদের বহনের ব্যবস্থা করবে। শ্রমিকরা জানিয়েছেন, দুয়েকটা কারখানা ভাড়ার মাধ্যমে গাড়ীর ব্যবস্থা পরিবহনের ব্যবস্থা করলেও ৯৫ ভাগ কারখানার শ্রমিকের পবিহনের ব্যবস্থা করেনি। এ সব শ্রমিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি নিয়ে পকেটের টাকা খরচ করে কারখানায় যাতায়াত করছে। আগে যেখানে ৫ টাকা ভাড়া ছিল এখন সেই গন্তব্যে যেতে ৫০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। লকডাউনের কারণে বাস না চলায় রিকসা, ভ্যানে অটো রিকসা বা অন্য কোন অযান্ত্রিক যানবাহনের মাধ্যমে যেতে হচ্ছে। সে জন্য খরচ বেড়েছে আকাশ ছোয়া।

সত্যি কি শ্রমিকরা আক্রান্ত হচ্ছেন? বিজিএমইএ একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সম্প্রতি গবেষনা করিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে শ্রমিকের আক্রান্ত সংখ্যা এক শতাংশেরও কম। আর মৃত্যুর কোন তথ্য নেই বিজিএমইএ-এর হাতে। ১১ এপ্রিল সোনারগাঁও হোটেলে কারখানা খোলা রাখার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করে এমন কথাই বলেন তৈরি পোশাক প্রস্তত ও রপ্তানিকারক সমিতি-বিজিএমইএ এবং দেশের ব্যবসায়ী শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এমপি।

আসলে অবস্থা তাই? গতবারের তথ্য কিন্তু তা বলে না। করোনার প্রথম ঢেউয়ে নারায়নগঞ্জ ও সাভার থেকে যখন শ্রমিকদের আক্রান্তের খবর আসতে থাকলো তার পর পরই শ্রমিকদের আক্রান্তের সংখ্যা ঘোষণা বন্ধ করে দেওয়া হলো। গাজীপুরেও আক্রান্ত হওয়া শুরু করলে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক আক্রান্তের কারণ হিসাবে কারখানা মালিকদের অবহেলাকে দায়ি করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। আর শ্রমিকদের অভিযোগ ছিল তাদের শরীর গরম হলেই আর তা কারখানা কর্তৃপক্ষ জানতে পারলেই ওই শ্রমিককে কারখানা থেকে বের করে দেওয়া হতো। বলা হতো করোনা নেই-তার সনদ আনতে। কোনভাবে শ্রমিক বাইরে গেলে ওই শ্রমিককে কারখানায় ফেরানো হতো না। চাকরিচ্যুত করা হতো।

কারখানা খোলা রাখা হয়েছে। শ্রমিকরাও চান, কারখানা খোলা থাক। তাদের বক্তব্য ‘একদিন কাজ না করলে বেতন কাটা পড়বে। মাস শেষে বেতন কম পাবো। এমনিতেই নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে, সংসার চলে না। ধার দেনা করে চলতে হয়। বেতন কাটা গেলে প্রাপ্ত বেতন দিয়ে চলা আরও কঠিন হবে। তাই বেঁচে থাকার জন্য করোনার মধ্যেই কারখানাতে কাজ করতে চাই। কারখানায় উৎপাদন হোক আমরাই চাই।’

কিন্তু তাদের দাবি হলো, ঘন ঘন হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা হোক, সঠিকভাবে শরীরের তাপমাত্রা মাপা হোক, কারখানায় প্রবেশের সময় কেমিকেল কুয়াশা তৈরি করা হোক এবং কারখানার ভেতরে মাঝে মাঝে মাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানা ঘোষণা করা হোক। যে সব কারখানার শ্রমিকরা দূর থেকে আসেন তাদের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করো হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *