দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস পর শুনশান নিরবতা কাটিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরতে শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : শুনশান নিরবতা কাটিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরতে শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা। প্রথম দিনেই যশোরের শার্শার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসেই শিক্ষার্থীরা কিছুক্ষণের জন্য হলেও আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়েন।

করোনা মহামারিতে দীর্ঘ দিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাই একে অন্যের সাথে দেখা সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ না থাকায় প্রতিষ্ঠানে এসেই শিক্ষার্থীরা হৈ-হুল্লোড়ে ও উৎসবে মেতেছে।

শার্শা উপজেলায় কলেজ, কলেজিয়েট স্কুল, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বালিকা বিদ্যালয়, নিম্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ফাজিল আলিম দাখিল মাদ্রাসা, সরকারি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্ডেন স্কুল মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৩শ‘ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

সরেজমিন রোববার সকালে শার্শার ফজিলাতুন নেছা মহিলা কলেজে দেখা যায়,কলেজের দুটি গেইট সকাল সাড়ে ৮টায় খুলে দেওয়া হয়েছে।গেইটে প্রত্যেকের শরীরের তাপমাত্রা মেপে তারপর ঢোকার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।সেখানে মাস্ক রাখা হয়েছে ও সাবান পানি দিয়ে হাত ধোঁয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।খোঁজ নিয়ে জেনেছি উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পর কলেজ জীবনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের জীবনের নতুন পথ চলা। ক্যারিয়ার গঠনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার বড় ক্ষেত্র এই সময়টুকু।

এবার করোনা মহামারি কেড়ে নিয়েছে কলেজ জীবন। টানা ১৭ মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ২০১৯ সালের এসএসসি উত্তীর্ণরা কলেজের স্বাদ কিছুটা পেলেও, এখনো একদিনও কলেজ জীবন আসেনি ২০২০ সালে এসএসসি উত্তীর্ণদের।

মহামারি কলেজ জীবনকে বন্দি করে দিয়েছে অনলাইন ক্লাসের নামে ল্যাপটপ আর মোবাইল ফোনের পর্দায়।এ নিয়ে আক্ষেপের শেষ নেই শিক্ষার্থীদের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঘরে বসেই কলেজে ভর্তি হয়েছেন প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী। বন্ধুদের সঙ্গে বাঁধনহারা আড্ডা তো দূরের কথা, শ্রেণিকক্ষে বসারই সুযোগ পাননি তারা।

২০২০ সালে এসএসসি উত্তীর্ণ নিগার সুলতানা,রুবায়েত হক বিন্দু,সাদিয়া আফরিন, সাবিকুন নাহার,লামিয়া ওসমান,মেহেরুন নেছা তন্বী,মাহফিল আরা ইতি একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছেন শার্শার একমাত্র নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফজিলাতুন নেছা মহিলা কলেজে।কলেজ জীবন বঞ্চিতদের তাই আক্ষেপের শেষ নেই।

শার্শার ফজিলাতুন নেছা মহিলা কলেজে ব্যবসায় শিক্ষায় ভর্তি হয়েছেন শার্শার পূজা দেবনাথ। কলেজে আসতে না পারার আক্ষেপ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাকে। পূজা বলেন, ‘করোনা কলেজ জীবনটাই শেষ করে দিল। মাঝে মাঝে নিজেকে তো স্টুডেন্টই মনে হয় না। যখন স্কুলে পড়তাম, তখন মনে হতো কলেজে উঠলেই একটা অন্য রকম ব্যাপার স্যাপার হবে। কিন্তু তা আর হলো কই?’

রুবায়েত হক বিন্দু বলেন,আজ থেকে কলেজ জীবন শুরু হল।খুব খুব খুবই ভাল লাগছে। ‘দুঃখজনক হলেও সত্যি, এখনো ঠিকমতো কলেজের সহপাঠী, বান্ধবী, শিক্ষকদেরও চিনি না।’ মেহেরুন নেছা তন্বী বলেন, এই যে দিনগুলো হারিয়ে গেল, এই যে কষ্ট, সেটা আজীবন মনে থাকবে।

২০১৯ সালের এসএসসি উত্তীর্ণ ফজিলাতুন নেছা মহিলা কলেজে ভর্তি হওয়া জান্নাতুল ফেরদৌসী রজনীর গল্পটাও ভিন্ন কিছু নয়। রজনী বলেন, ‘আমাদের কলেজ জীবন মানে হলো অনলাইনে বসে থাকা।কিছু দিন কলেজে এসেছি।সবার সাথে পরিচিত হয়ে যখন জমতে শুরু করল তখনই করোনা।ছুটি আর ছুটি। এখন আবার পরীক্ষার প্রস্তুতি।এর চেয়ে বিরক্তিকর আর কিছুই নেই।’

অপর শিক্ষার্থী জামতলার সুরাইয়া আক্তারের অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়াসহ দাপ্তরিক কাজে মাত্র কয়েকদিন কলেজে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু তাতে কি আর মন ভরে? সুরাইয়া আক্তার বলেন, ‘এ সময়ে কোনো নতুন বান্ধবী কিংবা শিক্ষকের সঙ্গে ভালো করে পরিচয়ও হয়নি। এর চেয়ে হতাশার কিছু নেই।’

বুরুজবাগান পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির বিঞ্জানের ছাত্রী অনামিকা আফরিন ছোঁয়া। ছোঁয়া বলেন,স্কুল খুলেছে,আসতে পেরে ভাল লাগছে।আগে মদ্দিমাঝে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে আসতাম।নতুন ক্লাসে উঠে আজ পর্যন্ত ক্লাস করতি পারিনি।এবার অন্তত সপ্তায় একদিন ক্লাস করতি পারবো।

একজন অভিভাবক কামরুজ্জামান মিন্টু বলেন, অনেকদিন পর স্কুল খুলেছে বাচ্চাদেরও স্কুলে পাঠানো দরকার। কিন্তু তাদের নিরাপত্তার বিষয়টা প্রশাসন ও স্কুল কর্তৃপক্ষের ভেবে-চিন্তেই স্কুলে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

নাভারন ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ এসএম ইব্রাহিম খলিল বলেন,সরকারি বিধিবিধান মেনেই ক্লাস শুরু করেছি।ক্লাস নেওয়া হবে এমন কক্ষগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও জীবানুমুক্ত করা হয়েছে।শিক্ষার্থীদের জন্য সেনিটাইজার ও সাবান পানির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

শার্শার ফজিলাতুন নেছা মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ লায়লা আফরোজা বানু মলি বলেন, ‘যারা ২০২১ সালে এইচএসসি আর আগামী বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী,তারা প্রতিদিন ক্লাসে আসবে।মাস্ক পরা বাধ্যতামুলক ও সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে শ্রেণিকক্ষে বসার ব্যবস্থা নজরদারিতে রাখা হয়েছে।হঠাৎ কেউ অসুস্থ্য হলে তার জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা চৌধুরী হাফিজুর রহমান বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় নেওয়া ১২টি সিদ্ধান্ত প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।সেটা কার্যকরী হয়েছে কী না তা সরেজমিন আমরা দেখেছি। করোনার কথা মাথাই রেখেই প্রতিদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মনিটরিং করা হচ্ছে।

শনিবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, “দীর্ঘ ১৭ মাস পর রোববার থেকে খোলা হচ্ছে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্যবিধি মেনে পাঠদান করলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ার সম্ভাবনা কম। তারপরও সংক্রমণ বেড়ে যাবার আশঙ্কা দেখা দিলে প্রয়োজনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফের বন্ধ করে দেওয়া হবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *