দাবি আদায়ে চূড়ান্ত ‘রোডম্যাপে’ বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারসহ একগুচ্ছ দাবি আদায়ে এবার ভিন্ন ‘কৌশল’ অবলম্বন করছে বিএনপির হাইকমান্ড। ইতোমধ্যে দলের দায়িত্বশীল নেতারা একটি ‘রোডম্যাপ’ চূড়ান্ত করেছেন।

সরকারের কোনো পাতানো ফাঁদে সহসাই পা ফেলতে চায় না দলটি। বিশেষ করে আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সতর্ক অবস্থানে থাকবে বিএনপি। দলটির অধিকাংশ কেন্দ্রীয় এবং তৃণমূল নেতার মতে, আওয়ামী লীগ সরকারকে মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত আন্দোলনের বিকল্প নেই। এজন্য বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোকে পুনর্গঠন করা জরুরি।

সম্প্রতি দলের কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতাদের সিরিজ বৈঠকে এ ধরনের প্রস্তাবনা এসেছে। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের এই অভিন্ন মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে আন্দোলনের পরিকল্পনা প্রণয়নে দফায় দফায় বৈঠক করছেন নীতিনির্ধারকরা। সেই সঙ্গে সমমনা অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্ট নাগরিকদের একই প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।

গত ১৪, ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর এবং ২১, ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর দুই দফায় বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা, যুগ্ম মহাসচিব, সম্পাদক ও সহ-সম্পাদকম-লী, নির্বাহী কমিটির সদস্য, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং জেলা সভাপতিদের সঙ্গে পৃথকভাবে ধারাবাহিক মতবিনিময় করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত শনিবার দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আবারো মতবিনিময়ের সিদ্ধান্ত হয়। সিরিজ বৈঠকের ধারাবাহিকতায় এবার বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া হবে।

আজ শুক্রবার এবং আগামীকাল শনিবার বিকালে গুলশানে পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক হবে। এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতেও পেশাজীবী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তারেক রহমান। তারও আগে ২৭ ও ২৮ আগস্ট ঢাকা বারের আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। সব বৈঠকেই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা জানান, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন ছাড়া বিএনপি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে না। এক্ষেত্রে অন্য দলকেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে নিবৃত্ত রাখার চেষ্টা করবে দলটি। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আমরা ঘোষণা দিয়েছি যে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ছাড়া বিএনপি কোনো নির্বাচনে যাবে না। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হলে কোনো নির্বাচন হবে না। কোনো দলকে অংশও নিতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, এবার ভিন্ন বিএনপি আপনারা দেখতে পাবেন। বিএনপি আর ঘরকুণো হয়ে থাকবে না। তরুণ যুবকদের পদভারে প্রকম্পিত হবে দেশের রাজপথ। সামনে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। অতীতে কোনো স্বৈরাচার থাকতে পারেনি। আজ গোটা দেশ বৃহত্তর কারাগারে পরিণত হয়েছে। শুধু বেগম খালেদা জিয়া নন, দেশের সবাইকে মুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, পেশাজীবীদের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হবে। আমরা এক দফার আন্দোলনে যাব। অন্য কোনো দফা আর যুক্ত করব না।

বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, আজ শুক্রবার এবং আগামীকাল শনিবার ৩২টি পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় হবে। আজ প্রথম দিনে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিকাল সাড়ে ৩টায় মতবিনিময় সভা শুরু হবে। মতবিনিময় সভায় স্কাইপের মাধ্যমে যুক্ত থাকবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এছাড়া দলের মহাসচিবসহ জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন।

পেশাজীবী ৩২টি সংগঠনের উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে- এফবিসিসিআই, সম্মিলিত পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন-জেডআরএফ, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব), জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম, ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব), ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় সাদা দল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম, জিয়া পরিষদ, জাতীয় প্রেস ক্লাব, শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোট, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, ঢাকা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম, ঢাকা আইনজীবী সমিতি, সুপ্রিম কোর্ট জাতীয়তাবাদী ফোরাম, ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এ্যাব, এগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এ্যাব, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোট, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিএ্যাব), ডিপ্লোমা এগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন-ডিএ্যাব, নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, জি-নাইন, জাতীয়তাবাদী কর আইনজীবী ফোরাম, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজে, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- এম-ট্যাব, ডিপ্লোমা এগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন-ডিএ্যাব।

জানা গেছে, এর আগের সভায় পেশাজীবী নেতারা মূলত পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে কীভাবে ঐক্যবদ্ধ এবং আরও সক্রিয় ও গতিশীল রাখা যায় সে বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। আজ এবং আগামীকালের সভায় মূলত আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে করণীয় বিষয়ে মতামত দিবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পেশাজীবী নেতা দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, তারা বিশেষ ব্যক্তির বলয় থেকে বেরিয়ে পেশাজীবী সংগঠনকে মজবুত করার বিষয়ে মতামত দেবেন। কেননা অতীতে অনেকেই সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বড় নেতা হয়েছেন। কিন্তু উক্ত প্ল্যাটফর্মকে গড়ে তোলার ব্যাপারে কা-জ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। তাদের আর সুযোগ দেওয়া সমীচীন হবে না।

আওয়ামী লীগের বাইরে মধ্যপন্থি ডান-বাম সবাইকে বিএনপির পতাকাতলে আনা এবং ২০১৩ সালের মতো দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়েও মতামত দেবেন পেশাজীবী নেতারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *