ঢলে-বৃষ্টিতে ফুলছে নদী, চোখ রাঙাচ্ছে বন্যা

কৌশিক রায় : উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে ফুলে উঠছে দেশের নদ-নদীগুলো। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে বয়ে যাচ্ছে। নদী তীরবর্তী অনেক জেলা চর ও নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আবহাওয়া অফিস বলছে, ভারী বর্ষণ আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে। ফলে বৃষ্টির পানি আর উজানের ঢল মিলে এই সপ্তাহের শেষের দিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যার আশঙ্কা দেখছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

বাংলাদেশ ও ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের গাণিতিক মডেলের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৭২ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতের হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা প্রদেশের স্থানসমূহে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে।

ফলে এই সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, উত্তর পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকা এবং দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য অববাহিকার প্রধান নদীসমূহের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কিছু কিছু স্থানে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

ইতোমধ্যে ফেনীর মুহুরী নদীর পানি পরশুরাম পয়েন্টে বিপৎসীমার ১১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তীব্র পানির চাপে তিনটি স্থানে বাঁধ ভেঙে অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৬ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ৪১ মিটার নিচ দিয়ে বইলেও ইতিমধ্যে অনেক নিচু এলাকা আংশিক প্লাবিত হয়েছে। খোয়াই নদীর পানি বাল্লা পয়েন্টে ৮০ সেন্টিমিটার এবং কংস নদীর পানি জারিয়াঞ্জাইল পয়েন্টে বিপৎসীমার ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, ভারী বর্ষণের ফলে নদীতে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

‘ফলে দেশের উত্তরাঞ্চল এবং উত্তর মধ্যাঞ্চলের যমুনা নদীর তীরবর্তী যে জেলাগুলো আছে সেগুলো বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি এই সপ্তাহের মধ্যেই এই জেলাগুলো বন্যা কবলিত হতে পারে।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়- বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম জানান, স্লাগ ফর টেস্টিং ওয়ার্নিং সেন্টারের দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস অনুযায়ী শনিবারের পর পানি বিপৎসীমার ওপরে উঠার ওয়ার্নিং দিয়েছিল। এরইমধ্যে কোনো কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে। দেশের কয়েকটা স্থানে নদ-নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে।

অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে হিমালয়ের পাদদেশে প্রায় ১ হাজার মিলিমিটারের ওপরে বৃষ্টিপাত হবে। এই বৃষ্টিপাতের পানিটা ব্রহ্মপুত্র দিয়ে বাংলাদেশে আসবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের উপরেও আগামী দশ দিন ভারী বর্ষণ হবে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে বৃষ্টিপাতের ফলে পানির বর্তমান লেভেলটা দুই একদিনের মধ্যে বিপদসীমা পার হয়ে যাবে।’

‘আর এই কারণে স্বল্প থেকে মাঝারি মানের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে উল্লেখ করে বুয়েটের এই শিক্ষক বলেন, সেই বন্যা কতদিন স্থায়ী হতে পাওে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। কারণ এই বৃষ্টির পরে হয়তো আবার বৃষ্টি হবে।’

অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গতবার আমরা দেখেছি দীর্ঘ বৃষ্টির ফলে বন্যা প্রায় ৪০ দিনের বেশি স্থায়ী ছিল। আমরা মনে করছি দুই-একদিনের মধ্যেই ব্রহ্মপুত্র তিস্তা বা উত্তর-পূর্বদিকে থাকা নদীগুলোর পানি বিপৎসীমা পার হতে পারে।’

এদিকে বৃষ্টিপাতের বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ এটিএম নাজমুল হক বলেন, জুন থেকে সেপ্টেম্বর দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে জুন এবং জুলাই মাসে সব থেকে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। এসময় দেশের কোথাও না কোথাও বৃষ্টিপাত হয়। তবে বৃষ্টিপাতের বর্তমান যে প্রবণতা যেমন শুক্রবার প্রায় সারা দেশেই বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টিপাতের এই ধারাটা কিছুদিন পরে সামান্য হ্রাস পেতে পারে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ সেইসঙ্গে বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়ে এই আবহাওয়াবিদ বলেন, এই অতিভারী বর্ষণের ফলে কোথাও কোথাও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পূর্বাভাসে অস্থায়ীভাবে দমকা ঝড়ো হাওয়াসহ অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে এবং কিছুটা বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়তে পারে।

আবহাওয়া অফিস বলছে, মৌসুমী বায়ুর অক্ষের বর্ধিতাংশ উত্তর প্রদেশ, বিহার, হিমালয়ের পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারী অবস্থায় রয়েছে।

বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস অনুযায়ী রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রংপুর বিভাগের অনেক জায়গায়। অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার আবহাওয়ার অবস্থা (৩ দিন) এ সময়ের শেষের দিকে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা হ্রাস পেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *