জামায়াতের ‘মধুর প্রতিশোধ’ নিল বিএনপি!

নিজস্ব প্রতিবেদক : দুই দশকের বেশি সময় ধরে জোটবদ্ধ আন্দোলন করলেও গত কয়েক বছর ধরে বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন চলছে। বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে জামায়াত নিয়ে কথা বলেছেন বিএনপির নীতি-নির্ধারকেরা। জোটগত সম্পর্ক ছিন্ন করার চাপও আছে দলের ভেতরে-বাইরে। অন্যদিকে সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াতও জোটকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের ঘর গোছানোতেই বেশি মনোযোগী।

এরমধ্যে সম্প্রতি জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলসহ কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী সাত নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন। এই ঘটনায় জোটের প্রধান হিসেবে বিএনপির পক্ষ থেকে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে সেখানে জামায়াতের নামটিও উল্লেখ করা হয়নি। এটাকে জামায়াতের বিরুদ্ধে বিএনপির ‘মধুর প্রতিশোধ’ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। কারণ এর আগে জিয়াউর রহমানকে নিয়ে তোলা বিতর্কের ইস্যুতে জামায়াত যে বিবৃতি দিয়েছে সেখানে জিয়াউর রহমানের নাম উল্লেখ করেনি দলটি।

জামায়াত নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ার একদিন পর বিএনপি যে বিবৃতি দেয় তাতে কারও নাম উল্লেখ করেনি দলটি। যদিও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের সরকার অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করছে জানিয়ে তাদের মুক্তি দাবি করা হয়। তবে বিএনপি জোটের আরেক শরিক এলডিপি প্রধান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ জামায়াত নেতাদের গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে মুক্তি চেয়েছেন।

গুঞ্জন আছে, সম্প্রতি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে সরকারের নানা সমালোচনার প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দেয় জামায়াত। সেই বিবৃতিতে জিয়াউর রহমানের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেনি দলটি। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির ভেতরে-বাইরে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাই বিএনপিও তাদের দলের শীর্ষ নেতাদের নামে আলাদা করে বিবৃতি না দিয়ে সারাদেশে নিজ দলসহ বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের মুক্তি চেয়ে দায় সেরেছে।

বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা কেউ কেউ এমন বিবৃতিকে কৌশল হিসেবে বলার চেষ্টা করছেন। তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর কমান্ডার। বঙ্গবন্ধু তাকে বীরউত্তম খেতাব দিয়েছিলেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধে তার সব অবদান অস্বীকার করছে আওয়ামী লীগ। শুধু তাই নয, চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের লাশ আছে কি না- তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা। সেখান থেকে তার কবর সরিয়ে ফেলারও কথা বলা হচ্ছে।

অথচ এ নিয়ে জামায়াতের বিবৃতিতে জিয়াউর রহমানের নামটি উল্লেখ না থাকায় বিএনপি নেতারা হতবাক হয়েছেন। এ নিয়ে দলের তৃণমূল থেকে হাইকমান্ড পর্যন্ত ক্ষুব্ধ। সবশেষ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট ছিন্ন করা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি জামায়াত ইস্যুতে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এমন কিছু হলে তো নিশ্চিয়ই সাংবাদিকরা জানতেন।’

জিয়াউর রহমানের ইস্যু নিয়ে গত সপ্তাহে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরোয়ার স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে দেশের সম্মানিত ও মহান ব্যক্তিদের নিয়ে অহেতুক বিতর্ক না করার আহ্বান জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, বেশ কয়েক দিন ধরে দেশের সম্মানিত ও মহান ব্যক্তিদের নিয়ে অহেতুক বিতর্ক করা হচ্ছে এবং তাদের ব্যাপারে অসম্মানজনক ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। যে বিষয়গুলো নিয়ে অহেতুক বিতর্ক করা হচ্ছে, তা দেশের জনগণকে মর্মাহত করেছে।’

এদিকে গত সোমবার রাতে রাজধানীর বসুন্ধরার একটি বাসা থেকে জামায়াত নেতাদের আটক করে পরে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। বর্তমানে তারা রিমান্ডে আছেন।

বিএনপির পক্ষ থেকে একদিন পর বিবৃতি দিয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সম্প্রতি সরকার বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। সোমবারও বিরোধী দলের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।’

যদিও জোটের সমন্বয়ক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান জামায়াত নেতারা আটক হওয়ার পর দলের অন্য নেতাদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

জামায়াতের সিলেট মহানগরের আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘বিএনপির বিবৃতির বিষয়টি আমরাও দেখেছি। এখন কোন দল বিবৃতি কীভাবে দেবে সেটা একান্তই তাদের বিষয়। তবে আমরা তো এখনো জোটে আছি। সমস্যা দেখছি না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *