গ্রামাঞ্চলে লকডাউন নেই : দোকানদারা খেলছে চোর পুলিশ খেলা

বিশেষ প্রতিনিধি : যশোরের সীমান্তবর্তী শার্শা উপজেলার গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা। সংক্রমন ঠেকাতে প্রশাসনের কঠোর বিধিনিষেধ শহরে দেখা গেলেও গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষের ভয়ডর চোখে পড়ছে না; করোনা উপসর্গে প্রতিদিন মানুষের মৃত্যু হলেও জনমনে তার কোন প্রভাব নেই।

মহাসড়কের মোড়ে মোড়ে সতর্ক অবস্থানে পুলিশ, বিজিবি, আনছার ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা।চলছে ভ্রাম্যমান আদালতের কার্যক্রম। এরপরেও অনেকে বাজারে এসে এসব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাহারা দিয়ে খেলছে চোর পুলিশ খেলা।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনম সেন্টারের আরটিপিসিআর পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যাদের শরীরে এই সময়ে সংক্রমণ ধরা পড়েছে, তাদের মধ্যে শার্শার প্রায় প্রতিটি গ্রামের বাসিন্দারা রয়েছেন।

সোমবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার জাহিদুল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত উপজেলায় কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা ১০২১জন। এর মধ্যে সুস্থ্য হয়েছেন ৮০৭জন।বর্তমানে আক্রান্ত আছেন ২০০জন।মারা গেছেন ৯ জন।

সরকারি হিসেবে মৃত্যুর সংখ্যা কম থাকলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গ্রাম ডাক্তাররা বলছেন করোনা উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধশতাধিক ছাড়িয়ে যাবে।

উপজেলার প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি ঘরেই এখন করোনা উপসর্গের রুগি তারপরও গ্রামের মানুষ একেবারেই বিধিনিষেধ মানছেন না। উপজেলার বেনাপোল, নাভারন, বাগআচড়া ও শার্শা সদরে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকলেও অলিগলি ও গ্রামের হাটবাজার রয়েছে অরক্ষিত। বসতপুর, জামতলা, সামটা, গোগা, বালুন্ডা, বারোপোতা, ডিহি, নিজামপুর, শাড়াতলা,কাশিপুর, লক্ষণপুর, উলাশি, বাহাদুরপুর,শাখারিপোতা বাজারে প্রশাসন কিম্বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি দেখলেই দোকান বন্ধ হয়ে যায় আবার তারা চলে যাওয়ার সাথে সাথেই বাজার জমজমাট। রাত ১০টা অবধি চায়ের দোকানের আড্ডা চলছে। এই অবস্থা চলমান থাকলে করোনা সংক্রমনের হার হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করছেন স্বাস্থ্য বিভাগ।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইউসুফ আলী বলেন, ‘কোভিড পজেটিভ হলে বাড়ি লকডাউন হবে’ এই ভয়ে গ্রামের মানুষের পর্যাপ্ত কোভিড টেস্ট হচ্ছে না। তারপরও শনিবার ৩৫জনের কোভিড টেস্টে ১০জন পজেটিভ। পরীক্ষা বিবেচনায় সনাক্তের হার ২৮শতাংশ। শুক্রবার ৩৫জনের কোভিড টেস্টে ১৩জন পজেটিভ। পরীক্ষা বিবেচনায় সনাক্তের হার ৩৭শতাংশ। বুধবার ৫৭জনের কোভিড টেস্টে ১৮জন পজেটিভ। পরীক্ষা বিবেচনায় সনাক্তের হার ৩২শতাংশ। মঙ্গলবার ৪১জনে ১৮জন সনাক্ত, সনাক্তের হার ৪৪শতাংশ। সোমবার ৬৪জনে ২৯জন পজেটিভ, সনাক্তের হার ৪৫শতাংশ।রোববার ১৫জনে ৫জন পজেটিভ, সনাক্তের হার ৩৩শতাংশ। শুক্রবার ৫৭জনে ২০জন পজেটিভ, সনাক্তের হার ৩৫শতাংশ।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে,উপজেলার বড় মার্কেট, শপিংমল বন্ধ রয়েছে। অলিগলির মার্কেটগুলোর অর্ধেক সাঁটার খোলা রেখে বেচাকেনা চলছে। বাধাহীন ভাবে তিনচাকা, প্রাইভেটকার, ভ্যান, ইজিবাইক ,সিএনজিচালিত অটোরিক্সা ও মোটরসাইকেল চলছে। কাজ থাকুক আর না থাকুক লোকজন অবাধে চলাফেরা করছে। লকডাউন দেখার জন্য পথেঘাটে উৎসুক জনতার জটলা দেখা গেছে।চায়ের দোকান খোলা ‘বারন’ তারপরও গ্রামের পাড়া মহল্লায় দোকানের সামনে পিছনে বেঞ্চ পেতে বসে জম্পেশ আড্ডা চলছে। গ্রামের বাজারে দোকানগুলো অর্ধেক দুয়ার খোলা রেখেছে। প্রধান সড়কের ধারে ফুটপাথে কলা আম তরমুজ আনারস ফলমূলের দোকানে বেচাকেনা হচ্ছে।
কাঁচাবাজার সকাল থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত খোলা। এরপর বাজারে, পথের ধারে বসে। হোটেল রেস্তোরাঁ খোলা।সাধারণ মানুষের ভয়ডর চোখে পড়ছে না। সচেতনতাও নেই। প্রতিটি বাড়িতে ঋতু পরিবর্তনের পালায় জ্বর জারি সর্দি কাশি দেখা দিচ্ছে। কোভিড উপসর্গের রুগি তারপরও তথ্য গোপন করে বাজারে ঘুরাঘুরি করছে। আর এতেই ছড়িয়ে পড়ছে কোভিড। গ্রাম ডাক্তারদের কাছে গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছে। প্রতিদিন অসংখ্য লোকের মৃত্যুও ঘটছে। চিকিৎসকগণ কোভিড পরীক্ষা করতে বলছেন কিন্তু ফলাফল শুন্য। শ্বাসকষ্ট ও অক্সিজেনের প্রয়োজন ছাড়া করোনা উপসর্গের কোন রুগিই হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে না।

বসতপুর গ্রামের মেম্বর আলি আহম্মদ বলেন, “বসতপুর, ছোট কলোনী, বড় কলোনী গ্রামের ৭০ভাগ মানুষ করোনা উপসর্গের জ্বর সর্দি কাশি গলাব্যাথা শ্বাস কষ্টে ভোগছে। এই এলাকায় করোনা উপসর্গে ১৩জন মোরে গেছে। এর মধ্যি আপন দুই ভাইও রয়েছে। তারপরও মানুষ কচ্ছে ‘কুথায় করোনা’। কারনে অকারনে বাজারে এসে বসে থাকছে।”

উপজেলার মহিশাকুড়া ও বাগাডাঙা গ্রামের মেম্বার নাসির উদ্দিন বলেন, এই দুই গ্রামের ৫০ভাগ বাড়িতে কোভিড উপসর্গের জ্বর সর্দি কাশি গলাব্যাথা শ্বাস কষ্টের রুগি রয়েছে। অনেকে দিনের পর দিন ভোগছে, অনেকে সেরেও উঠেছে।করোনা উপসর্গে এখানে ৪জন মারা গেছে।

টেংরা গ্রামের মেম্বর মোজাম গাজি বলেন, আর পারছি নে।প্রথম প্রথম কোলি মানুষ কথা শুনতো। এখন পুলিশ বিজিবি আসে তারা কিছু কচ্ছে না, আমরা তো পাবলিক আমরা কোলি শুনবে কেন? “প্রশাসনের লোকজন আসলি সবাই দুকান বন্ধ রাখে। তারা চলে গেলি আবার সবাই খুলে বেচাকিনা করে।”

উত্তর শার্শার লক্ষনপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা বলেন, সপ্তাহ খানেক আগে এই এলাকার প্রতিটি ঘরে ঘরে করোনা উপসর্গের রোগি ছিল। সেই তুলনায় এখন কিছুটা কম তবুও ৩০ভাগ বাড়িতে রোগি আছে। উপসর্গে অন্তত ২৫জন মারা গেছে। সাধারন মানুষ অবাধে হাটে বাজারে ঘোরাঘুরি করছে।

বাগআচড়া ইউপি চেয়ারম্যান ইলিয়াছ কবির বকুল বলেন, বাগআচড়া এলাকায় করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ। পশুহাটের কারনে প্রতিদিন বাইরের ব্যাপরিরা আসায় তাদের মাধ্যমে করোনা ছড়াচ্ছে। ইউনিয়নের ৫০ভাগ মানুষ করোনা উপসর্গে ভুগছেন। করোনা উপসর্গে এই ইউনিয়নে অন্তত ৩৬জন মারা গেছে। তারপরও মানুষ সচেতন না।তাদের আটকানো যাচ্ছে না। “প্রশাসনের নজরদারি না বাড়ানো হলে এখানে করোনা মহামারি আকার ধারন করবে।”

করোনাজয়ী একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, গ্রামাঞ্চলের মানুষ করোনা উপসর্গকে সাধারণ জ্বর হিসেবে দেখছে। যখন শ্বাসকষ্ট শুরু হচ্ছে তখনই দৌড়াদৌড়ি শুরু করছে। এর মধ্যে অনেকেরই ফুসফুস আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে।আক্রান্তের প্রথমেই কোয়াক ডাক্তারের কাছে না যেয়ে হাসপাতালে আসলেই মৃত্যুর ঝুঁকি কম থাকে। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই তথ্য গোপন করে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

যশোর সদর হাসপাতালের ডা. আক্তারুজ্জামান বলেন, গ্রামের মানুষ একেবারেই শেষ মুহুর্তে হাসপাতালে আসছে। করোনার উপসর্গ নিয়ে আসা এইসব মানুষের অন্য রোগ থাকায় এই মৃত্যু হচ্ছে।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনোম সেন্টারের সহকারী পরিচালক অধ্যাপক ড. ইকবাল কবীর জাহিদ জানান, যশোরে করোনার ভারতীয় ডেল্টা ধরণ ৪২ শতাংশ ও আফ্রিকার গামা ধরণ ৩০ শতাংশ ছড়িয়ে পড়েছে। যা এখন গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে। ভারতীয় ধরণে আক্রান্ত একজন রোগী ৬ জনকে আক্রান্ত করছে। তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হবার আশংকা ৮৩ শতাংশ, আর আফ্রিকার ধরণে হৃদরোগে আক্রান্ত হবার আশংকা ৬০ শতাংশ। এটাকে আটকাতে হলে দ্রুত টিকাদান অথবা মানুষের শরীরে ইমিউনিটি বাড়াতে হবে। না পারলে সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি আসতে পারে।

শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মীর আলিফ রেজা বলেন, বিজিবি, পুলিশ, আর্মি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর যৌথ মহড়া চলছে। আমরা সার্বক্ষনিক বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে কাজ করে যাচ্ছি।তবে মানুষ সচেতন না। “আমরা যতক্ষন থাকছি ততক্ষন সবাই আইন মানছে। চলে আসলেই যা তাই। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *