করোনা ভাইরাস : বেনাপোল স্থলবন্দরের হ্যান্ডেলিং শ্রমিকদের মানবেতর জীবন যাপন

হাবিবুর রহমান রিফাত/দীনবন্ধু মজুমদার : মহামারী করোনার প্রাদুর্ভাবে থমকে আছে বিশ্ব। বাংলাদেশেও একই অবস্থা। চলছে সাধারণ ছুটি। মানুষ গৃহবন্দী। খুব প্রয়োজন ছাড়া বের হতে বারণ। এই অবস্থায় নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কাটছে দেশের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবন।

এই আতঙ্কের মধ্যে বেনাপোল স্থল বন্দরের কাজকর্ম বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে বেনাপোল বন্দরের হ্যান্ডেলিং শ্রমিকরা। ভারতের লকডাউন ঘোষনা হওয়ার পর গত ২৩ মার্চ থেকে নোভেল করোনা ভাইরাস আতঙ্কে ভারতের পেট্টাপোল দিয়ে সকল প্রকার আমদানী রপ্তানী বানিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ২৬ মার্চ থেকে ০৪ এপ্রিল পর্যন্ত এবং আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ সচেতনতায় বৃদ্ধির লক্ষে সরকারী বেসরকারী সকল প্রতিষ্ঠান একটানা ছুটি ঘোষনা করায় বন্দরের সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

কর্মচাঞ্চল্য এই বন্দরে আমদানী রপ্তানি ও পণ্য খালাস বন্ধ থাকায় এখন শুনসান নিরবতা লক্ষনীয়। বেকার হয়ে অসহায় জীবন যাপন করছে নো ওয়ার্ক নো-পে ভিত্তিতে কর্মরত প্রায় এক হাজার দুইশ হ্যান্ডেলিং শ্রমিক ও দুই হাজার পাঁচশ কর্মচারী। বেনাপোল স্থলবন্দরে দুইটি নিবন্ধিত শ্রমিক হ্যান্ডেলিং ইউনিয়ন ও একটি ষ্টাফ এ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। ১ হাজার ২ শত হ্যান্ডেলিং শ্রমিক ও দুই হাজার পাঁচশ কর্মচারী রয়েছে। করোনা ভাইরাস যাতে ছড়াতে না পারে সে জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মতে আমরা বড়িতে অবস্থান করছি। অতি প্রয়োজন ছাড়া আমরা বাড়ির বাহিরে যাচ্ছিনা বলে জানান বেনাপোল হ্যান্ডেলিং শ্রমিক ইউনিয়ন ৯২৫ এর সভাপতি রাজু আহম্মেদ।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় খোজ খবর নিয়ে জানা যায় অনেকেরই নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী শেষ হয়ে গেছে। কিন্ত কাজ না থাকায় তারা এখন অসহায় হয়ে পড়েছে। কোন উপয় খুজে পাচ্ছে না যে তারা কিভাবে সংসার চালাবে। এমনকি সরকারি কোন সহযোগীতা তারা পাইনি এবং খোজ খবর নিতে আসেনি কেউ। বেনাপোল বন্দর হ্যান্ডেলিং শ্রমিক ইউনিয়ন ৮৯১ এর সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম জানে এ প্রতিনিধিকে বলেন অনেকের ঘরে এখন হা-হা কার চলছে। সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে এসব শ্রমিকদের পরিবারে এখনো পর্যন্ত কোন খাদ্য সামগ্রী জোটেনি। সামান্য চাউল, ডাউল, আলু ও তেলের চাহিদা থাকলেও অসহায় এ সব দরিদ্র্য শ্রমিকদের জন্য কাউকে কোন কিছু নিয়ে আসতে দেখা যায়নি। তবে মাস্ক, সাবান ও ব্লিচিং পাউডাড় বিতরণের কর্মসুচি ফটোসেশনের অনেকেরই দেখা যাচ্ছে।

বেনাপোল ষ্ট্যাফ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান গ্রামের সংবাদকে বলেন, বেনাপোল স্থালবন্দরের আমদানী রপ্তানি ও পণ্য খালাসের সাষে নিয়োজিত কর্মচারী সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার। করোনা ভাইরাসের কারণে বন্দরের সকল কর্মকান্ড স্থগিত হওয়ায় একই সাথে সরকারি ছুটি ঘোষনার কারণে ৮৫% কর্মচারী অসহায় হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের পাশে আজও কেউ আসেনি। খোজ খবর নেওয়া তো দুরের কথা। শার্শা লাউতাড়া গ্রামের ইমান আলী, হাসান আলী, নাসির উদ্দিন, মিজানুর রহমান, সাদেক আলী, ওহিদুল, রুহুল আমিন, আব্দুল কুদ্দুস, ইদ্রিস আলী ও ফজর আলীর সাথে কথা বলে জানা যায় তারা প্রত্যেকেই বেনাপোল বন্দরে হ্যান্ডেলিং শ্রমিকের কাজ করেন। তারা বলেন ২৫ মার্চ আমরা শেষ কাজ করেছি। এর পর থেকে আমরা বাড়িতেই অবস্থান করছি। প্রতিদিন যে টাকা মুজুরি হিসেবে পাই তা দিয়েই আমাদের সংসার চলতো। তাছাড়া ছেলে মেয়েদের লেখা পড়ার খচর জোগাতে এনজিওদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ছিলাম। তাদের কিস্তি দেওয়া এবং সংসার চালাতে যেয়ে চোখে অন্ধকার দেখছি। মাঠে তেমন কোন কাজ নেই হাতে কোন টাকাও নেই। ধার দেনা করে কত দিন চলা যায়? সরকারি সহযোগীতা পেলে ছেলে মেয়ে ও পরিবার পরিজন নিয়ে আমরা বাঁচতে পারতাম।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুলক কুমার মন্ডল বলেন, হ্যান্ডেলিং শ্রমিকদের জন্য আলাদা ভাবে সরকারি কোন বরাদ্দ আসেনি। যা আসছে ইউপি চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রের মাধ্যমে তা বিতরণ করা হচ্ছে। উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় দুস্থ পরিবারের জন্য আজ পর্যন্ত ২৪ টন চাউল, আলু, সাবান এবং মাথা পিছু ১ কেজি করে ডাউল দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আবারো চাহিদা পত্র পাঠানো হয়েছে। শ্রমিকদের বিষয়টি পৌর মেয়র ও ইউপি চেয়ারম্যানদেরকে বলা হবে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের ভারপ্রাপ্ত বন্দর পরিচালক (ট্রাফিক) আঃ জলিল এক প্রশ্নের জবাবে বলেন শ্রমিকদের জন্য অনুদান বা সাহায্য প্রদানের বিষয়ে কোন নির্দেশনা আসেনি। তবে বেনাপোল কাষ্টমস যখন চাইবে তখনই পণ্য খালাসের বিষয়ে আমরা প্রস্তুত আছি।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর শ্রমিকলীগের কেন্দ্রীয় শ্রমিক নেতা মিজানুর রহমান বলেন, বন্দর শ্রমিকরা হ্যান্ডেলিং এর কাজ করে প্রতি মাসে ঠিকাদারের মাধ্যমে ২ হাজার ৫ শত টাকা থেকে ৩ হাজার ৫ শত টাকা মুজুরি পেয়ে থাকেন। বন্দর থেকে পণ্য লোডিং আনলোডিং এর সময় আমদানী রপ্তানী কারক প্রতিনিধির মাধ্যমে সামান্য বকসিস প্রদান করে থাকেন। এভাবে দিন শেষে হিসাব করে প্রতেকে আয় করে দুইশ পঞ্চাশ টাকা থেকে তিনশ পঞ্চাশ টাকা। একটানা বন্দরের সকল কাজকর্ম বন্ধ হওয়ায় অসহায় হয়ে শ্রমিকরা মানবেতর জীবন যাপন করছে।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর শ্রমিকলীগের কেন্দ্রী কমিটির সভাপতি জসিম উদ্দিন এ প্রতিনিধিকে জানান, করোনা ভাইরাসের কারণে বেনাপোল স্থলবন্দরসহ দেশের ১১টি বন্দরের সকল কর্মকান্ড একটানা ভাবে বন্ধ থাকায় ৫০ হাজার হ্যান্ডেলিং শ্রমিক অসহায় হয়ে পড়েছে। পরিবার পরিজন নিয়ে দুঃখ্যকষ্টের মধ্যে জীবন যাপন করছেন। দেশের এই সংকটময় মুহুর্তে অসহায় শ্রমিকদের পাশে দাড়ানোর জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *