কঠোর লকডাউনে এনজিও’র কঠিন চাপ : ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি আদায়ে জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধর্ণা

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোরে ‘কঠোর লকডাউন’র মধ্যেও চলছে এনজিও ঋণের কিস্তি আদায়। টাকা আদায়ের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধর্ণা দিচ্ছেন এনজিও কর্মীরা। এমনকি ঋণ আদায়ের জন্য গ্রাহকদের উপর জোরজবরদস্তিও করছেন। অথচ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকলেও বন্ধ হয়নি তাদের এই ঋণ আদায় কার্যক্রম। ফলে ঋণ পরিশোধের এমন চাপের মুখে পড়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে থাকা পরিবারগুলো পড়েছে চরম বিপাকে।

চাপাচাপি করে এনজিও’র ঋণ আদায়ের বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, লকডাউনের এই দিনগুলোয় জোরাজুরি করে ঋণ আদায় কোনোভাবেই ঠিক হচ্ছে না। কিস্তির জন্য গ্রাহকদের উপর চাপ মোটেও মানবিক আচরণের পর্যায়ে পড়ে না। জোর করে কোনোভাবেই ঋণের কিস্তি আদায় করা যাবে না।

জানা গেছে, যশোরে লকডাউনের ভেতরও জাগরণী চক্র, ওয়াইডব্লিওসিএ, উদ্দীপন, আদদ্বীন, আশা ও জয়তীসহ বেশ কয়েকটি এনজিও ঋণের কিস্তি তুলছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, এসব এনজিও’র কর্মীরা বাড়ির উপর এসে কিস্তির জন্য ধর্ণা দিচ্ছে। চাপাচাপি ও জোরাজুরিও পর্যন্ত করছেন। কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে অপমানসূচক কথাবার্তা বলছেন। খবর মিলেছে শহর, গ্রাম ও শহরতলীতেও ঋণের কিস্তি আদায় করতে এনজিও কর্মীরা দাপিয়ে ফিরছে।

শহরের রায়পাড়ার বাসিন্দা হেলেনা পারভীন ও সুফিয়া খাতুন জানান, ওয়াইডব্লিওসিএ এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন তারা। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে সবধরণের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন। ফলে এখন তারা আর ঋণের কিস্তি দিতে পারছেন না। তারা দাবি করেন, সবকিছু যখন সচল ছিল ঋণের কিস্তি তারা কখনও বকেয়া রাখেননি। কিন্তু কঠোর লকডাউনের কারণে তাদের ব্যবসা বর্তমানে মন্দা যাচ্ছে। তাই বিনিয়োগ থেকে অর্থের আনাগোনা বন্ধ হয়ে গেছে। যার কারণে কিস্তি দিতে সমস্যা হচ্ছে। তারা বলেছেন, লকডাউন মানছে না এনজিও কর্মীরা। যেকোনোভাবেই হোক কিস্তি দিতে হবে বলে জোর করছেন।

উপশহর এলাকার বাসিন্দা হোসনে আরা বেগম জানান, উদ্দীপন সমাজকল্যাণ সংস্থা নামে একটি এনজিওর ঋণ গ্রাহক তিনি। বরাবরই ঠিকমতন কিস্তি পরিশোধ করে আসছেন। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে তাদের পারিবারিক ব্যবসা বন্ধ থাকায় কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। সৃষ্ট অর্থনৈতিক দূরাবস্থার কথা জেনেও। বাড়ির উপর এসে কিস্তির জন্য চাপাচাপি করছেন এনজিও কর্মীরা।

চাঁচড়ার দারোগার বাড়ি মোড় এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক জানান, জাগরণী চক্র থেকে তার ঋণ নেওয়া আছে। লকডাউনে অন্যদের মতন তারও আর্থিক টানাপোড়েন চলছে। আর যার কারণে কিস্তির টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এনজিওর কর্মীর তার সাথে অপমানজনক আচরণ করেছেন।

কিস্তি আদায়ে জোরাজুরির বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে ওয়াইডব্লিওসিএ’র সাধারণ সম্পাদক শিখা বিশ^াস জানান, কোভিড-১৯ প্যান্ডেমিকের মধ্যে ঋণ আদায় করা যাবে না এই বিষয়টি তারা জানেন। কিন্তু তারপরও এই ব্যাপারে তাদের কিছু করার নেই। তিনি দাবি করেন, যেসব গ্রাহকরা ‘স্পেশাল’ (বিশেষ) ঋণ নিয়েছেন তাদের কিস্তি পরিশোধের জন্য তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও দাবি করেন, এই স্পেশাল ঋণ নেওয়ার সময় গ্রাহকদের বলা হয়েছিল লকডাউন, প্রাকৃতিক বা মানব সৃষ্ট যেকোনো ধরনের দুর্যোগ ঘটুক না কেন ঋণের কিস্তি বকেয়া রাখা যাবে না। আর সেসব ঋণের কিস্তি আদায়ে তাদের কর্মীরা গ্রাহকদের বাড়ি যাচ্ছেন।

মুঠোফোনে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে যশোরের অতিরিক্তি জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রফিকুল হাসান জানান, এনজিওর কিস্তি আদায়ের বিষয়ে এবার কোনো নির্দেশনা পাননি। কিন্তু তারপরও ঋণের কিস্তি দিতে কাউকে বাধ্য করা যাবে না। তিনি আরও জানান, প্রশাসনের সাথে এনজিওগুলোর প্রায়শই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আর সেসমস্ত বৈঠকেও তাদেরকে লকডাউনের মধ্যে ঋণের কিস্তি না আদায়ের জন্য মৌখিকভাবে বলা হয়েছে। কিন্তু তারপরও এটি যখন বন্ধ হয়নি সেজন্য বিষয়টি নিয়ে তিনি এনজিও ফোরামের সাথে আলোচনা করবেন। যাতে লকডাউনের ভেতর কিস্তির জন্য কাউকে চাপ না দেওয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *